দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে কতটুকু সফল হয়েছে? নাকি শুধু গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য অর্জন করেছে, বিশেষত সাম্প্রতিক বছরগুলোয়। তবে স্বীকার করতে হবে যে গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। গবেষণা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এর জন্য অর্থায়ন, নীতি সহায়তা এবং সরকার ও শিল্প খাতের সঙ্গে সহযোগিতা অপরিহার্য। বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট তৈরির দিকে বেশি মনোযোগী। কারণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা হলো ডিগ্রি অর্জন ও কর্মসংস্থান। কিন্তু ধীরে ধীরে গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে উঠছে এবং আমরা আশাবাদী যে আগামী দিনে এটি আরো শক্তিশালী হবে। তবে আশার খবর হলো অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের উদ্যোগে গবেষণা তহবিল গড়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করছে এবং বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করছে। ইউজিসির ২০২২ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালেই শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় ২৮৮ কোটি টাকা গবেষণায় ব্যয় করেছে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক বেশি। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, ড্যাফোডিল, ইস্ট ওয়েস্ট, ইউআইইউসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামে যুক্ত হয়েছে।
বেকারত্ব বাড়ছে। কিন্তু দেশে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ তেমন একটা দেখা যায় না। এ বিষয়ে কী করণীয় বলে মনে করেন?
এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঘাটতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডভাইজার বা অ্যাডভাইজরি বোর্ড থাকা উচিত, যাতে নিয়োগকর্তাদের চাহিদা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগগুলো পাঠ্যক্রমে প্রতিফলিত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। কর্মসংস্থান কেবল চাকরিতে সীমাবদ্ধ না রেখে উদ্যোক্তা সৃষ্টির দিকেও গুরুত্ব দেয়া উচিত। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার ও স্টার্টআপ প্লাটফর্ম চালু হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চাকরিদাতা হওয়ার সুযোগও পাচ্ছে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ বা সংকট কী?
প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নীতি বৈষম্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে সুযোগ-সুবিধা ও অর্থায়ন থাকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা থেকে বঞ্চিত। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশে উচ্চশিক্ষায় সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। পাশাপাশি যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি, গবেষণায় অর্থায়নের অভাব এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত ক্যারিয়ার সুযোগ তৈরি না হওয়াও বড় সংকট। এছাড়া উচ্চশিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়াও আমাদের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
উচ্চশিক্ষা খাতের কোন কোন বিষয়ে সংস্কার করা অপরিহার্য বলে মনে করেন?
শিক্ষায় সংস্কার এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, আমাদের একটি সমন্বিত উচ্চশিক্ষা নীতি প্রয়োজন, যা পাবলিক-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে সমান সুযোগ দেবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা জরুরি। তৃতীয়ত, একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি সংযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে; যাতে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের উন্নয়ন নতুন প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি এবং মাননির্ভর মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কারও প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি শিক্ষার উন্নয়নে এখন পর্যন্ত কী কী উদ্যোগ নিয়েছে? সংগঠন হিসেবে আপনারা কী নিয়ে কাজ করছেন?
এপিইউবি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একমাত্র সংগঠন। আমরা সরকারের সঙ্গে নিয়মিত নীতিগত আলোচনায় অংশ নিচ্ছি। বিশেষ করে করোনাকালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন প্লাটফর্মে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখে একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও অনলাইন শিক্ষা শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।
এপিইউবির উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার ফলে অলাভজনক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত আয়কর ৫ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। যদিও আমরা মনে করি অলাভজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা উচিত।
আমরা গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন অংশগ্রহণ, শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ও উদ্যোক্তা সহায়তা কার্যক্রমগুলোকে উৎসাহিত করছি।
গত বছর জুলাই আন্দোলন এবং বিভিন্ন সময় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা ও নির্ধারিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত বৃত্তি প্রদানের ব্যাপারে সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমরা পরামর্শ দিয়েছি, যা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়েছে।
অন্যদিকে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে এপিইউবি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব সহায়তা প্রদান করেছে।
সবশেষে আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি পৃথক উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে সম্ভাবনাময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শিক্ষার্থীদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং সত্যিকার অর্থে বৈষম্যমুক্ত উচ্চ শিক্ষাবান্ধব একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
উচ্চশিক্ষা খাত নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষার্থী। তাদেরকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ দেয়া গেলে তারা শুধু দেশের উন্নয়ন নয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়ও নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মনে করি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার প্রসারে বিরাট অবদান রেখে চলছে। তাই আমরা চাই সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত এবং সমাজ একসঙ্গে কাজ করুক। উচ্চশিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, জ্ঞান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও জাতি গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার হোক। এক্ষেত্রে সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।