দেশের অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল অন্তর্বর্তী সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থনীতিকে কোন অবস্থায় পেয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে বিদ্যমান সংকটগুলো থেকে উত্তরণের জন্য কী ধরনের সংস্কার কার্যক্রম প্রয়োজন বা কী পদেক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তার ইঙ্গিত দেয়া। শ্বেতপত্রে সামষ্টিক অর্থনীতি ও এর কাঠামোগত সমস্যার এক বিস্তারিত চিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আর্থিক খাতের দুর্দশা, প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা, বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির তথ্য শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে। যদিও এগুলো একেবারে অজানা ছিল না। তবে শ্বেতপত্রের অবদান হলো, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের পরিস্থিতি সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা এবং প্রকৃত পরিসংখ্যান জনসম্মুখে আনা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেলের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির হিসাবের গোঁজামিল প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিস্থিতি জানা গেছে। শ্বেতপত্র প্রণয়নের আগে সরকারিভাবে খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গত জুনের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বাজার অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যস্ফীতির জাতীয় পরিসংখ্যান নিয়েও জনমনে সংশয় ছিল। সেই সংশয়ও শ্বেতপত্রে দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে। সরকারি তথ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশের ঘরে থাকলেও বাস্তবে তা ১৪-১৫ শতাংশ ছিল।
মোট কথা, দেশের অর্থনীতি কোন পরিস্থিতিতে রয়েছে সেটি জানা ছিল শ্বেতপত্রের মূল অগ্রাধিকারের বিষয়। এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো বাংলাদেশের অর্থনীতি মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে রয়েছে। প্রবৃদ্ধির সংশোধিত তথ্য, জিডিপি, রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ, রফতানি, ব্যাংক খাতের দুর্দশা, অর্থ পাচার, দুর্নীতি ইত্যাদি সূচকের হিসাবের আলোকে এটি প্রতীয়মান হয়েছে। সাধারণত উদীয়মান অর্থনীতির দেশে মাথাপিছু আয় ৬-৮ ডলার থেকে বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৬০০ ডলার আয়ের স্তরেই এ ফাঁদের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা অস্বাভাবিক। এটিই ছিল শ্বেতপত্রের মূল বক্তব্য।
এসব সংকট মোকাবেলা ও সংস্কারের ক্ষেত্রে শ্বেতপত্রে তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল। সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিল দেশের ব্যাংক খাত এবং এটি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ছিল বড় ঝুঁকি। তাই সর্বাগ্রে এ খাত পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করা জরুরি ছিল। দ্বিতীয়ত জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সংকট মোকাবেলা করা দরকার ছিল। কেননা জ্বালানি ঘাটতি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতায় বড় বাধা। এর পাশাপাশি ব্যবসায় পরিবেশ স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। এজন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও করনীতি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা হয়। এগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার মানে এই নয় যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকেও গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তবে বাস্তবতা হলো এসব খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই জরুরি ভিত্তিতে ওই তিন খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।
ব্যাংক, জ্বালানি ও ব্যবসায় পরিবেশ—এ তিন খাতের কতটা সংস্কার হয়েছে তা পর্যালোচনা করতে হলে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে। কেননা এ সরকার ২০০৭ সালের এক-এগারোর সরকারের মতো নয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছে অনেক বেশি জটিল ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তথা গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল অবস্থায় চলে গিয়েছিল। প্রশাসন, পুলিশ, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা পালিয়েছেন। ফলে প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ ও প্রশাসনকে সক্রিয় করা ছিল সরকারের প্রথম কাজ। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দূর করাও ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অভ্যুত্থানের পর থেকে গত এক বছরে প্রায় ১৭৫টি আন্দোলন হয়েছে, যা জনদুর্ভোগের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করেছে এবং বিনিয়োগ পরিবেশকে অনিশ্চিত করেছে। ফলে সরকারকে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দিতে হয়েছে। কারণ এগুলো ঠিক না হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।
আবার সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম ম্যান্ডেট ছিল রাজনৈতিক সংস্কার। রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয় ম্যান্ডেট ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও অন্যান্য অপরাধের বিচার করা। তৃতীয় ম্যান্ডেট ছিল সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য কাম্য। বাস্তবতা হলো অন্তর্বর্তী সরকারের মতো সীমিত আকারের সরকারের জন্য এসব কাজ করাটা দুরূহ।
কাজেই এসব দিক বিবেচনা করে অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি বিচার করতে হবে। অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে ব্যাংক খাত নিয়ে। ব্যাংক খাতে যে সংকটগুলো তৈরি হয়েছিল তার অন্যতম কারণ ছিল ব্যাংক খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা—নিয়মনীতির অতিরিক্ত শিথিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়ায় খাতটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংক খাতকেই সবচেয়ে বেশি সংস্কারের আওতায় আনা হয়েছে। শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপির মানদণ্ডকে আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি আনার জন্য নতুন সার্কুলার দেয়। এপ্রিল থেকে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। ব্যাংকের প্রকৃত মালিকানা চিহ্নিত করতে চালু করা হয় আল্টিমেট বেনিফিশিয়ারি ওনার্স রিপোর্টিং। এখন প্রতি তিন মাসে মালিকানা তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যে সীমা ও নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দিয়েছে তা মানা হচ্ছে কিনা এগুলোও রিপোর্ট করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্দশাগ্রস্ত, মূলধনবিহীন ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আইনি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল। সেটিও বাংলাদেশ ব্যাংক করেছে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারির মাধ্যমে। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সেটি মূলত নিশ্চিত করা হয়েছে।
ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য এর বাইরে প্রয়োজন ছিল দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংকগুলো ঠিক কতটা দুর্দশার মধ্যে রয়েছে তা জানা। অর্থাৎ প্রকৃত তথ্য জানা। এরই মধ্যে ছয়টা ইসলামী ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব ব্যাংকের মূলধন, খেলাপি ঋণ, জামানত, সম্পদের বাজারমূল্য ইত্যাদি পরিমাপ করা হয়েছে। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ব্যতীত অন্য পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে একীভূত করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। ব্যাংকে একীভূতকরণের জন্য কোনো উৎস থেকে অর্থায়ন করা হবে, ব্যাংক একীভূত হলে কে কোন পদে থাকবে, গ্রাহক ও আমানতকারীদের কীভাবে সুরক্ষা দেয়া হবে সেগুলোর বিস্তারিত কর্মসূচি এখনো তৈরি হয়নি। যদিও কাজ চলছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক আশ্বস্ত করেছে।
ব্যাংক খাতের পাশাপাশি পুঁজিবাজার সংস্কারের জন্যও বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এর জন্য একটা টাস্কফোর্স করা হয়েছে। পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়া, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) না আসা এবং জটিল আইপিও প্রক্রিয়া। এসব সমস্যা সমাধানে বর্তমানে নতুন আইপিও বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে তা চূড়ান্ত হতে পারে। আশা করা যাচ্ছে যে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হলে পুঁজিবাজারে আইপিও আসার পথ আরো মসৃণ হবে। মোটা দাগে এগুলোই হলো আর্থিক খাত সংস্কারের বর্তমান চিত্র। আর গত এক বছরে মূল্যায়নের আলোকে বলা যায়, সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা এসেছে। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন না হলেও মূল্যস্ফীতির হার একক অংকের ঘরে নেমে এসেছে। ডলার সংকট ও বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে ওঠা গেছে। বিশেষত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেছে। ডলারের দাম কমছে। ডলার মূল্যের পতন ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ছিল বড় সংকটগুলোর একটি। পরিস্থিতির এ পরিবর্তন কেবল নীতি সংস্কারের কারণে হয়েছে এটা বলা অসমীচীন। এটা অভ্যুত্থানেরই একটা সুফল। কারণ অভ্যুত্থানের ফলে অর্থ পাচার করা রাঘববোয়ালরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণে হুন্ডি বাজারে মন্দা তৈরি হয়েছে। হুন্ডি বাজার থেকে ডলার কেনার প্রবণতা কমেছে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।
তবে এসব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করা সম্ভব হলেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও মজুরির ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। প্রকৃত মজুরি ধারাবাহিকভাবে কমছে। বর্তমানে মজুরি কমার গতি কিছুটা শ্লথ হলেও এর প্রবণতা থেমে যায়নি। বিনিয়োগে ঋণাত্মক প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে। বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতির জন্য যে ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন ছিল সেগুলোও করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া প্রত্যাশা ছিল চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব থাকবে না। এর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদকালে কী ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেবে সেগুলোর উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি আগামী সরকার কোন সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাবে বা নতুন করে শুরু করবে সেই রূপরেখাও দেয়া হবে। কিন্তু বাজেটটি গতানুগতিক ধারায়ই হয়েছে। প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আগামীতে অগ্রাধিকারে থাকতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তাহলে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা সম্ভব হবে। নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছে। এটিও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এটি কতটা টেকসই হবে তা বলা মুশকিল। কারণ যেকোনো সময় আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যা সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যেমনটা উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজ ভবনে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার পরও পরিলক্ষিত হয়েছে। যেকোনো দাবি নিয়ে সচিবালয় ঘেরাও, পথ অবরোধ করা হচ্ছে।
এমন আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবেলার একমাত্র উপায় হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় করা। কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটলেও যেন সেটা ছড়িয়ে না পড়ে, নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেজন্য সর্বদা প্রশাসনকে সক্রিয় থাকবে হবে। নয়তো এগুলোর কারণেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে।
এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি সংকট সমাধান। ধারণা করা হচ্ছিল চলতি বছরের গ্রীষ্মে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। অনেক বেশি লোডশেডিং হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। লোডশেডিং সীমিতই ছিল। কিন্তু গ্যাস সংকট এখনো একই অবস্থায় রয়ে গেছে। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক শিল্পই পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে সক্ষমতার ৬০-৭০ শতাংশ উৎপাদন করছে। অর্থাৎ গ্যাস ঘাটতি পূরণের জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার এ-সংক্রান্ত কিছু কাজ ও চুক্তিও করেছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সংকট থেকেই গেছে। এলএনজি এনে সেটা রিগ্যাসিফিকেশন করতে হয়। এটাও এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। আগামীতে নির্বাচিত সরকার এলে এগুলোর সমাধানে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্তমানে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে সাময়িক কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত পাল্টা শুল্কের কারণে। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ তার প্রতিযোগী দেশ পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। তবে এর বাইরে বড় দুই প্রতিযোগী দেশ রয়েছে—চীন ও ভারত। পাল্টা শুল্কহার বিবেচনায় এ দুই দেশের তুলনায় আমরা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছি। আবার ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ কী দাঁড়াবে সেটা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ অনিশ্চয়তাটাই আমাদের জন্য একটা সুযোগ। কারণ বর্তমানে বৈশ্বিক ক্রেতারা ভারতে ক্রয়াদেশ দিতে ভরসা পাচ্ছেন না। এ সুযোগ যাতে হারিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। সুযোগটা সাময়িক হতে পারে তবে সেটা কাজে লাগানো গেলে কিছু ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া সম্ভব। এজন্য অনতিবিলম্বে কিছু কর্মসূচি সম্পন্ন করতে হবে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কাজগুলো ত্বরান্বিত করতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রক্রিয়াগুলোর সহজীকরণ আবশ্যক। এনবিআরকে পুরোপুরি অটোমেটেড করে যদি নথিপত্র জমাদানের জটিলতা ও সময় কমিয়ে আনা যায়, বন্দর ব্যবস্থাপনা আরো দক্ষ করা সম্ভব হয় তাহলে আমরা বেশি ক্রয়াদেশ পেতে পারি এবং সময়মাফিক রফতানিও করতে পারব। এগুলো যত দ্রুত সম্ভব করা দরকার। বিশ্ব অর্থনীতির দোদুল্যমান পরিস্থিতির সুযোগ যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি তাহলে কর্মসংস্থান এবং প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
ড. জাহিদ হোসেন: অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ