রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসনতন্ত্র এবং রাজনীতি উভয়ই ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ দুই উপাদান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
একটি দেশের শাসনতন্ত্র সে দেশের জনগণের অভিপ্রায়। সে অভিপ্রায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার এবং কর্তব্যের একটা চুক্তিপত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ চুক্তির রূপ, কাঠামো ও চরিত্র কেমন হবে তা নির্ধারণে রাজনীতির ভূমিকা থাকে মুখ্য। প্রশ্ন আসে, রাজনীতি কী?
রাজনীতি হলো শাসনতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার চলমান জনমিথস্ক্রিয়া। মানুষের মধ্য থেকে বিভিন্ন চাহিদার উৎপত্তি হয়। বিভিন্ন ভাবনার উদ্রেক ঘটে। চারপাশ তাকে প্রভাবিত করে এবং তার জীবন-জীবিকার তাগিদ অনুভূত হয়। রাজনীতি এগুলোকে সংগ্রহ ও একত্র করে। এটাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ইন্টারেস্ট আর্টিকুলেশন’ বলে। চাহিদার সমন্বয়ের পর তৈরি হয় নীতি। নীতি প্রণয়নের পর সেটা জনসম্মুখে এলে জনগণ প্রতিক্রিয়া জানায়। পরবর্তী সময়ে জনগণের মতামত আবার নীতিকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইনপুট-আউটপুট দেয়া-নেয়ার একটি প্রক্রিয়া কাজ করে। এখানে ইনপুট আসে জনগণের পক্ষ থেকে। আর আউটপুট রাষ্ট্র ডেলিভারি করে—এ মিথস্ক্রিয়াই রাজনীতি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতগুলো মিথ ও বয়ানের প্রচলন রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’। আমি মনে করি এটা অত্যন্ত ভ্রান্ত ধারণা এবং ধ্বংসাত্মক প্রপঞ্চ। সময়ের বাস্তবতায় ‘শেষ কথা’ থাকতে হয়—অর্থাৎ কোনো বিশেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। ‘শেষ কথা নেই’ বলে অনেক সময় জরুরি রাজনৈতিক বিষয় এড়িয়ে যাওয়া অবশ্যই একটি প্রতারণা। একইভাবে বলা হচ্ছে ‘সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া’। এটিও এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে বৈধতা দেয়ার প্রচেষ্টা। সংস্কার অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। কঠিন কাজটি করার দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে নানা ঝুঁকি নিলে তবেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যেতে পারে। সব সংস্কারে সবসময় সব স্টেকহোল্ডার একমত হবে, এমনটা আশা করা অবাস্তব। বাংলাদেশে যদি ৪১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থাকে সব দল কখনই একমত হবে না। কিন্তু বোদ্ধা ও দেশপ্রেমিক মানুষের সমর্থন থাকলেই সংস্কার এগিয়ে নেয়া সম্ভব। চলমান প্রক্রিয়া বলে সংস্কার এড়িয়ে যাওয়াটাও রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণেরই একটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রকাশ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার তরুণরা রাজনৈতিক আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া নেতারা পরিবর্তিত সমাজের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেননি। ফলে পুনরায় তারা বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে তোলেন।
তবে শুধু তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন বিপথগামীও হতে পারে। কারণ তাদের অভিজ্ঞতা ও গভীর রাজনৈতিক বোধের ঘাটতি থাকতে পারে। তাই অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের সহায়তা ও পরামর্শ থাকলে আন্দোলন সঠিক পথে এগোয়।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে তরুণরা একটি শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে। তবে পরিবর্তনের ধারক-বাহক হিসেবে এখন আর তারা এককভাবে সক্রিয় নেই। তাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ঐক্য ও সুস্পষ্ট ন্যারেটিভের অভাব রয়েছে। নির্বাচনের আগে জরুরি পূর্বশর্ত পূরণ না করেই নির্বাচনমুখী হওয়ার ফলে জনমনে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল সেগুলো পূরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তবে তরুণরা যদি সক্রিয়তা বজায় রাখে তাহলে ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতি বা শাসন ব্যবস্থায় যে সংকটগুলো আছে সেগুলো থেকে আমরা একটা ইতিবাচক রূপান্তরের দিকে যেতে পারব।
আরেকটি জরুরি বিষয় হলো অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে ১১টি কমিশন ও তারও আগে কয়েকটি বিশেষ কমিশন গঠন করে। প্রতিটি কমিশন দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনগুলো জাতির জন্য বড় সম্পদ। ওই প্রতিবেদনগুলোর অন্তত ৫০ শতাংশ সংস্কার নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন করা সম্ভব; বাকি অংশ নির্বাচনের পর নতুন সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে। তবে এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দল ও সরকারের মধ্যে স্পষ্ট চুক্তি প্রয়োজন, যদিও সেটি কীভাবে-কখন হবে, তা স্পষ্ট নয়।
নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটা আছে বলে মনে করছেন?
অনেক সুপারিশ বাস্তবায়নের সময় এখনো আছে। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এ সময়ে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন এক ধারণা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে যে কেবল নির্বাচিত সরকার দেশের শাসনভার নিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা কি কখনো দেখেছি যে নির্বাচিত সরকার এলেই দেশ দুধে-মধুতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে? সব সমস্যা মিটে গেছে? বিনিয়োগে ঢল নেমেছে? সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? এ ধরনের ধারণার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ বাংলাদেশে নেই। কোনো সরকারই শতভাগ নির্বাচিত বা অনির্বাচিত হতে পারে না— প্রত্যেক সরকারের মধ্যে দুই ধরনের উপাদানই থাকে। তাই শুধু নির্বাচন হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এমনটা বিশ্বাস করার কোনো বিশেষ কারণ নেই। তবে তাই নির্বাচন পেছাতে হবে তারও সংগত কারণ নেই। দুটি পাশাপাশি করুন।
কেন বাংলাদেশে বারবার আন্দোলন, অভ্যুত্থান ও রক্ত দিতে হবে? আফগানিস্তানে যুদ্ধকালে যে প্রাণহানি, বাংলাদেশে শান্তিকালেও তার চেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে—কখনো রাজনৈতিক সহিংসতায়, কখনো সড়ক দুর্ঘটনায়, কখনো রোগ-ব্যাধিতে। আফগানিস্তানের যুদ্ধকালীন প্রাণহানির সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশের শান্তিকালীন প্রাণহানির পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
তরুণ সমাজ প্রাণশক্তির মূল আধার। পরিবর্তন, বিপ্লব বা নতুন ধারার রাজনীতি গড়ার সক্ষমতা তাদের মধ্যে আছে। কারণ তারা বিদ্যমান অনেক ব্যবস্থার সঙ্গে একমত হতে চায় না। তবে সমাজে প্রবীণরা প্রায় তরুণদের কথা শোনেন না, যেমন শিক্ষকরা ছাত্রদের কথা শোনেন না, অভিভাবকরা সন্তানদের কথা শোনেন না। জুলাই আন্দোলন প্রমাণ করেছে—রাজনৈতিক দলগুলো যত চেষ্টাই করুক, তারা একা বড় আন্দোলন গড়তে পারেননি। তরুণদের রক্ত ও প্রাণের বদলা নিতে জনগণ রাস্তায় নেমেছে এবং তারা নামাতেই পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে গেছে। সুতরাং তারুণ্যের এ শক্তি অবজ্ঞা করা বা উপেক্ষা করা আত্মঘাতী হতে পারে। বরং তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন। নীতি প্রণয়নে তাদের সম্পৃক্ত করা উচিত। শুধু বয়স ও অভিজ্ঞতা নয়, বিষয়ের প্রতি পূর্ণাঙ্গ প্রতিশ্রুতিই বড় অর্জনের পথ খুলে দেয়। তরুণদের মধ্যে স্বার্থবোধ তুলনামূলক কম থাকে, যা বড় পরিবর্তনের জন্য অনুকূল।
যদিও শোনা যাচ্ছে, অনেক তরুণ এরই মধ্যে টাকা লেনদেনের সে পুরনো রাজনীতির শেখানে পথে হাঁটছে এবং রাজনীতির সে পুরনো জুতোয় পা ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ‘দূরের বাদ্য’ করে তুলেছে।
তবু চলতি আগস্ট থেকে আগামী জানুয়ারি তথা নির্বাচনের আগ পর্যন্ত যে সময় অন্তর্বর্তী সরকার পাবে সেটিরও গুরুত্ব রয়েছে। এ সময়ে চাইলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অনেক পরিবর্তনই নিয়ে আসা সম্ভব। সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কারো এ সময়কে শুধু ‘এক্সিট’ বা বিদায়ের অপেক্ষা হিসেবে দেখা উচিত নয়। শেষ তিনদিনও তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেশ থেকে কিছু পাওয়ার নেই। তিনি দেশকে শুধু দিতে পারেন, কারণ জীবনে তিনি যা চেয়েছেন তারও চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছেন। তবে তার থেকে দেশ তখনই কিছু পাবে যখন প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সংবাদমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের সক্রিয় সমর্থন থাকবে। একজনের একার পক্ষে দেশের সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব নয়, চালানো সম্ভব নয়। কমিশনের প্রতিবেদনগুলো জাতির সম্পদ, কিন্তু অনেকেই সেগুলো পড়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না। কেবল ‘ভালো রিপোর্ট’ শুনে প্রশংসা করা যথেষ্ট নয়—গঠনমূলক সমালোচনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আজকের বাংলাদেশী সমাজ পাঠবিমুখ ও জ্ঞানবিমুখ হয়ে পড়ছে। মিডিয়ায় কথার ফুলঝুরি থাকলেও কাজের কথা বেশি শোনা যায় না। মগজের চেয়ে আমাদের মুখগুলো অনেক সক্রিয়।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হলে, রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে সিভিল সোসাইটিকে পেশা হিসেবে নয়, প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি যেকোনো নীতি প্রণয়নে সমসাময়িক যুবসমাজের চিন্তা ও চাহিদা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় এসেছি এবং কোথায় যেতে চাই—এ গতিপথ নির্ধারণ এখন অত্যন্ত জরুরি।
দেশের শাসন ব্যবস্থার কোন স্তরগুলোর সংস্কার প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো গণ-আন্দোলনের দিকে আমাদের যেতে না হয়?
আন্দোলন থেমে যেতে হবে, থামাতে হবে—এটি প্রধান বিষয় নয়। সময়ে সময়ে কালে কালে নতুন প্রয়োজনে আন্দোলন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। যেকোনো দেশের শাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি এবং ক্ষমতার বিন্যাস ও ব্যবহার, বিশেষত প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার দেশের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের প্রশাসনে সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা হলো—ক্ষমতা পেয়েও দায়িত্ব পালনে গড়িমসি ও অনীহা। ক্ষমতাকে উপভোগ করার প্রবণতা। একেকটি মন্ত্রণালয় এমন সব ক্ষুদ্র কাজও নিজের হাতে রাখে, যা অধিদপ্তর বা স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান করা যেত। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, খাগড়াছড়ির এক কলেজ অধ্যাপকের অসুস্থ সন্তানকে ভারতের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছুটি নিতে তিনবার ঢাকায় মন্ত্রণালয়ে আসতে হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে অনুমতি স্থানীয় পর্যায়ে দেয়া সম্ভব ছিল। অনেক অধিদপ্তর বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার অনেক ছোট ছোট সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে ধরনা দিতে হয়।
এমন একচেটিয়া ক্ষমতা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ায় না, বরং অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগও তৈরি করে। সামর্থ্য না থাকলেও কোনো কর্মকর্তা কোনো ক্ষমতা শেয়ার করবেন না। কারণ সেখানেই তাদের ‘ব্যবসা’ বা সুবিধা জড়িত। কর্মকর্তাদের অনেকে ব্যক্তিস্বার্থে অনেক কর্মীর সঙ্গে অন্যায় আচরণও করেন। যেমন খাগড়াছড়ি পৌরসভার এক সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে অন্যায়ভাবে সাসপেন্ড করে বান্দরবানে বদলি করা হয়। কিন্তু সেখানে যোগ দিলেও তার বেতন বন্ধ হয়ে যায়। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় অফিস জানায় যে ট্রান্সফার ও সাসপেনশন একসঙ্গে হওয়ায় তারা বেতন দিতে পারছে না। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরও কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। আবার চট্টগ্রামের তিনটি ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক দিঘি এখন ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেছে—যা সম্ভব হয়েছে ভূমি অফিস ও জেলা প্রশাসনের যোগসাজশে। আরএস খতিয়ান, লিজ ও খারিজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এসব দিঘি দখল করা হয়েছে এবং ৫০-৬০ বছর পর এখন তা ‘তামাদি’ হয়ে গেছে। ফলে কোর্টেও কার্যকর সমাধান মিলছে না।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সংস্কার শুরু করতে হবে প্রতিটি স্তর থেকে। প্রতিটি দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের মূল দায়িত্ব সঠিকভাবে বণ্টিত হচ্ছে কিনা, তা মূল্যায়ন করতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ, অবকাঠামো—প্রতিটি খাতে আলাদা বিভাগ আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সব দায়িত্ব আবার ডেপুটি কমিশনারের কাঁধে বা মূল অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে রেখে দেয়া হয়। ফলে তা আর কার্যকর হয় না। এক্ষেত্রে প্রতিটি বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ভালো কাজের পুরস্কার ও খারাপ কাজের জন্য শাস্তি—দুটোই থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমানে না পুরস্কারের প্রচলন আছে, না শাস্তির প্রচলন রয়েছে। দুটোই প্রয়োজন।
সবচেয়ে জরুরি হলো কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা অপরিহার্য নয় সেটি মনে রাখা। শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমানসহ অনেক নেতা প্রয়াত হয়েছেন। তবু দেশ চলছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের তিন প্রধান চরিত্র—শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টা—কারো স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বরং পরিবারের অনেক সদস্যসহ অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। ইতিহাসের এ রক্তাক্ত অধ্যায় এবং সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—আর কত নিরপরাধ প্রাণ হারালে আমরা সচেতন হব?
সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রত্যেককে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ আঁকড়ে না ধরে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে বড় ভূমিকা ও ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। যেকোনো বড় রাজনৈতিক দল যেকোনো মুহূর্তেই ভেঙে যেতে পারে, ছোট হয়ে যেতে পারে। অতীতে তেমনটাই দেখেছি আমরা। অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে বিপুল সম্পদ বিদেশে নিয়েছেন, কিন্তু পরে তা ভোগও করতে পারেননি। এগুলো ইতিহাসের শিক্ষা। এ শিক্ষা আমাদের গ্রহণ করা উচিত।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা ও সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়েও জনপরিসরে বিতর্ক রয়েছে। সংবিধানের পুনর্বিন্যাস কীভাবে হওয়া প্রয়োজন?
বর্তমান আলোচনায় দুটি প্রধান মতপার্থক্য স্পষ্ট—বিদ্যমান সংবিধানে সংশোধন আনা কিংবা সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়ন। তবে নতুন সংবিধানের প্রয়োজন আছে এ বিষয়ে অনেকেরই ঐকমত্য রয়েছে। এজন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে কমিটি গঠন, প্রয়োজনে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নেয়া কিংবা আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করার প্রস্তাব এসেছে। যেহেতু বর্তমান সরকারকে ‘বিপ্লবের সরকার’ বলা হচ্ছে এবং এটি একটি রুটিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, তাই তাদের কাছে জনগণ কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছে।
সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি স্তর বিবেচনায় আনা জরুরি—রাষ্ট্রের মূলনীতি, রাষ্ট্রের চরিত্র, গণতন্ত্রের কাঠামো এবং নাগরিক অধিকার। সংবিধান নিয়ে আলোচনায় বড় একটি সমস্যা হলো রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যেমন কোনো দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেজরিটেরিয়ান পদ্ধতি পছন্দ করছে, কারণ তা তাদের অনুকূলে, আবার কেউ আনুপাতিক পদ্ধতির পক্ষ নিচ্ছে নিজেদের সুবিধার জন্য। অথচ সংবিধান প্রণয়ন বা সংস্কার হওয়া উচিত দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনা করে, ব্যক্তিগত বা দলীয় লাভের জন্য নয়।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে সংঘাত, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি—সবকিছুই সংবিধান ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছিল, কিন্তু নির্বাচিত সরকার সেই সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে কিনা, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কসংক্রান্ত একটি সমঝোতা এরই মধ্যে আমরা করতে পেরেছি। তবে এক বছরের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে এর অতিরিক্ত প্রত্যাশা বাস্তবসম্মতও নয়। নির্বাচনের পথে নিয়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিগত জায়গায় দুর্নীতিমুক্ত থাকা—এটিই বড় সাফল্য হিসেবে দেখা উচিত।
নির্বাচনের সময়ও ঘোষণা করা হয়ে গেছে, তাই তা পেছানোর সুযোগ নেই। তবে নির্বাচনের আগে অন্তত সংবিধানের মৌলিক প্রশ্নগুলোয় ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং পরবর্তী সরকারের জন্য সংস্কারের স্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা অপরিহার্য। নইলে পুরনো ক্ষমতার কাঠামোই থেকে যাবে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।