আবাসন খাতে আইএফআইসি ব্যাংক বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান

আবাসন খাতে আইএফআইসি ব্যাংক বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গৃহ ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ খাতে আইএফআইসি ব্যাংক ৩৪ হাজারের বেশি গ্রাহককে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে।

দেশের আবাসন খাতে আইএফআইসি ব্যাংক কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?

আবাসন খাতে আইএফআইসি ব্যাংক বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গৃহ ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ খাতে আইএফআইসি ব্যাংক ৩৪ হাজারের বেশি গ্রাহককে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। মূলত এক দশকের বেশি সময় ধরে শহর-গ্রামে গৃহ ঋণ প্রদান কার্যক্রম, ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, উন্নত গ্রাহকসেবা, প্রতিযোগিতামূলক সুদহার ও দ্রুত ঋণ প্রক্রিয়ার কারণেই আমাদের এ সাফল্য এসেছে। এছাড়া আমরা টেকওভার লোনে কোনো প্রসেসিং ফি রাখি না এবং মর্টগেজ প্রপার্টির জন্য কোনো ইন্স্যুরেন্সেরও প্রয়োজন হয় না। কোনো হিডেন চার্জও নেই আমাদের।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত। স্বল্প আয়ের এ শ্রেণীর মানুষের পক্ষে একসঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট বা সম্পূর্ণ পাকা বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। তুলনামূলকভাবে স্বল্প আয়ের মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে আইএফআইসি ব্যাংক সেখানে সেমিপাকা বাড়ির জন্য ঋণ সুবিধা চালু করেছে। ফলে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণে অর্থায়ন করেছে আইএফআইসি ব্যাংক। আবাসন সুবিধাকে শহরকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে এ উদ্যোগ এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

আবাসন খাতে আপনাদের খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি কেমন?

আমাদের গৃহ ঋণ পোর্টফোলিওতে খেলাপির হার তুলনামূলক কম। তবে বিগত বছরে বৈশ্বিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে গৃহ ঋণে আমাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দুই অংকে পৌঁছেছে। বর্তমানে আমরা কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এটিকে আবারো এক অংকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি এবং আমরা আত্মবিশ্বাসী যে ভবিষ্যতে এটিকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসতে পারব। তবে গৃহ ঋণে খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা সাধারণত কম হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হলো মানুষ সাধারণত নিজের বাড়ির কিস্তি পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। একটি বাড়ির সঙ্গে কেবল বিনিয়োগই নয়, স্মৃতি, আবেগ ও সামাজিক মর্যাদাও জড়িয়ে থাকে। তাই বেশির ভাগ গ্রাহকই যেকোনো পরিস্থিতিতেই সময়মতো ঋণ পরিশোধে গুরুত্ব দেন।

হঠাৎ আয়ের উৎসে সমস্যা দেখা দেয়া, পরিবারের মূল আর্থিক জোগানদাতার আকস্মিক মৃত্যুর মতো ব্যতিক্রমী কোনো পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এসব ক্ষেত্র আমরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখি, যাতে গ্রাহককে সময় ও সহায়তা দিয়ে ঋণটি নিয়মিত রাখা সম্ভব হয়।

আবাসন ঋণে খেলাপির হার তুলনামূলক কম হওয়ার পরও এ খাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কম কেন?

গৃহ ঋণ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় অনেক ব্যাংক এ ঋণ দিতে কিছুটা সংযত থাকে। কারণ এখানে তারল্য, বাজার ঝুঁকি এবং গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা গভীরভাবে বিবেচনা করে মাসিক কিস্তি, সুদহার ওঠানামা এবং অর্থনীতির পরিবর্তন সবকিছুই হিসাবের মধ্যে রাখতে হয়। এছাড়া গৃহ ঋণে নিষ্কণ্টক দলিল ও সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্ট পাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। সঠিক যাচাই-বাছাই ও কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গৃহ ঋণ একটি নিরাপদ ও টেকসই বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে। এটি শুধু গ্রাহকের নিজের বাড়ির স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করে না, ব্যাংকের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। আইএফআইসি ব্যাংক সবসময় চেষ্টা করে সঠিক গ্রাহককে সহায়তা করতে, যাতে গৃহ ঋণ উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক, নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

আইএফআইসি ব্যাংকে গৃহ ঋণের সুদহার কেমন, আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কেমন সময় লাগে?

আইএফআইসি ব্যাংক ঋণ আবেদন প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সহজ ও দ্রুত করেছে। যদিও চূড়ান্ত অনুমোদন ও ঋণ বিতরণ দলিলপত্রের মূল্যায়ন এবং আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে গ্রাহক সর্বোচ্চ তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ সুবিধা পেয়ে যান। সর্বোচ্চ ২৫ বছর মেয়াদি এ ঋণ গ্রাহকের আয়, বয়স ও ঋণের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে গ্রাহকের একটি স্থায়ী আয়ের স্টেটমেন্ট থাকতে হয়। বর্তমান অন্যান্য ঋণ ও দায় হিসাব করে আয়ের সঙ্গে মিলিয়ে তার পরিশোধ সক্ষমতা আছে কিনা তা দেখা হয়। মূলত জমি বা ফ্ল্যাট মর্টগেজের ভিত্তিতে আমরা গৃহ ঋণ প্রদান করে থাকি। এক্ষেত্রে সুদহার সবসময় বাজারভিত্তিক ও পরিবর্তনশীল।

কিন্তু সুদহারের এ ওঠানামা তো অনেক সময় গ্রাহকদের ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এ কথা অনেকাংশে সঠিক। সুদহার পরিবর্তিত হওয়ায় অনেক সময় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অধিকাংশ মানুষ নির্দিষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা করেই ঋণ নেন। হঠাৎ করে সুদহার বেড়ে গেলে তাদের মাসিক কিস্তি বেড়ে যেতে পারে। তবে ভাসমান সুদহারের সুবিধাও আছে। বাজারে সুদহার কমলে গ্রাহকরাও সরাসরি উপকৃত হন। এক্ষেত্রে তাদের কিস্তি কমে যায় এবং ঋণ পরিশোধ সহজ হয়। গ্রাহকদের অতিরিক্ত চাপ থেকে বাঁচাতে আইএফআইসি ব্যাংক সর্বদা বাস্তবসম্মত এবং সহনশীল সুদহার রাখতে চেষ্টা করে।

হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া যায়?

গৃহ ঋণের বাজার সম্প্রসারণে আবাসন কোম্পানিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প ও সম্পত্তির ক্ষেত্রে পরিষ্কার, পরিপূর্ণ এবং যাচাইযোগ্য কাগজপত্র নিশ্চিত করতে হবে; যাতে ক্রেতা ও ব্যাংক উভয়েই কোনো দ্বিধা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। দলিল, অনুমোদন এবং মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা কমলে ঋণ প্রক্রিয়াও স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত ও সহজ হয়। আর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো প্রকল্প হস্তান্তর করাও গুরুত্বপূর্ণ। দেরি হলে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হয় এবং ব্যাংকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। সময়মতো হস্তান্তর হলে ক্রেতার বিশ্বাস বাড়ে, বাজারে ইতিবাচক বার্তা যায় এবং নতুন ক্রেতারাও হোম লোন নিতে উৎসাহিত হন। এছাড়া ব্যাংকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও ধারাবাহিক সমন্বয় রাখা প্রয়োজন। প্রকল্পের শুরু থেকেই যদি ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করা যায়, তাহলে অর্থায়ন কাঠামো, কাগজপত্র যাচাই এবং গ্রাহকের ঋণ প্রক্রিয়া অনেক বেশি স্বচ্ছ ও সহজ হয়। এ বিষয়গুলো ঠিকভাবে অনুসরণ করা হলে গ্রাহকের আস্থা বাড়বে, ঝুঁকি কমবে এবং স্বাভাবিকভাবেই হোম লোনের বাজার আরো বিস্তৃত ও গতিশীল হবে।

আরও