দেশের শীর্ষস্থানীয় শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। আবাসন খাতে এ ব্যাংকটির কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (আইবিবিএল) মূলত শরী’আহভিত্তিক ‘হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিল্ক’ (অংশীদারত্বমূলক বিনিয়োগ) পদ্ধতিতে আবাসন বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ও গ্রাহকের যৌথ মালিকানায় সম্পদ ক্রয় বা নির্মাণ করা হয় এবং কিস্তি পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহক ধীরে ধীরে পূর্ণ মালিকানা লাভ করেন। ব্যাংকের হাউজিং ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় গ্রাহকদের জন্য বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে আইবিবিএল। এর মাধ্যমে আবাসিক ভবনের জন্য সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ সুবিধা রয়েছে ব্যাংকটির। শহরাঞ্চলে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংক ও গ্রাহকের বিনিয়োগ অনুপাত সাধারণত ৭০:৩০ ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে পরিশোধের মেয়াদ ধরা হয় সর্বোচ্চ ১৫ বছর। অন্যদিকে, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামর আওতায় স্বনামধন্য ডেভেলপারদের ভবন নির্মাণে ব্যয়ের ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক চলতি মূলধন সরবরাহ করে। এতে মেয়াদ ধরা হয় ৫-৮ বছর পর্যন্ত। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আইবিবিএলের রয়েছে বিশেষ স্কিম। এ স্কিমে মোট বিনিয়োগের ৯০ শতাংশ ব্যাংক এবং ১০ শতাংশ গ্রাহক হিসাব করে যৌথ মালিনার ভিত্তিতে ২০ বছর মেয়াদি বিনিয়োগে প্রদান করা হয়। এছাড়া গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও প্রবাসীদের জন্য আইবিবিএলে ‘পল্লী গৃহ নির্মাণ’ প্রকল্প রয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ রেখেছে আইবিবিএল।
২০২৬ সালের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণ আবাসন বিনিয়োগের মুনাফার হার বার্ষিক ১৪-১৬ শতাংশের মধ্যে নির্ধারিত হচ্ছে। তবে এই হারটি স্থায়ী নয় এবং ব্যাংকের নীতি ও শরী’আহ নীতিমালা অনুযায়ী এটি সময় সময় পরিবর্তিত হয়ে থাকে ।
গ্রাহক আবাসন বিনিয়োগের আবেদন করলে অর্থছাড়ের জন্য কত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় তাকে?
অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াটি মূলত একটি সিস্টেম্যাটিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। ব্যাংকে আবেদন করার পর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিনিয়োগ পাওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা। বিনিয়োগ গ্রহীতার আয়, সম্পদের আইনি বৈধতা যাচাই করার পর ব্যাংকের নিয়োগকৃত আইনজীবী যখন গ্রাহকের জমির বা ফ্ল্যাটের দলিলের ওপর একটি ইতিবাচক ‘লিগ্যাল অপিনিয়ন’ দেন, তখনই কেবল প্রক্রিয়াটি সামনের দিকে অগ্রসর হয়।
বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যাংক সরাসরি গ্রাহকের বিনিয়োগ হিসাবে টাকা প্রদান করে। তবে একবারেই সম্পূর্ণ টাকা বিতরণ করা হয় না। কাজের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে কিস্তিতে কিস্তিতে টাকা ছাড় করা হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ১০-২৫ দিনের মধ্যে গ্রাহক ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণের জন্য অর্থ পেয়ে যাবে। এই বিনিয়োগ ব্যবস্থার মুনাফার হার স্থায়ী বা নির্ধারিত থাকে না। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি এবং ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়ে থাকে ।
বাজারভিত্তিক সুদহারের ওঠানামার প্রভাব থেকে ইসলামী হোম ফাইন্যান্সিং কতটা সুরক্ষিত?
ইসলামী ব্যাংকের হোম ফাইন্যান্সিং শরী’আহ কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বাজারভিত্তিক এই কাঠামোতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সুদহার যখন বৃদ্ধি পায়, ইসলামী ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগের মুনাফার হার বা ভাড়ার হার সমন্বয় করে থাকে। তবে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা আর্লি অ্যাডজাস্টমেন্ট বা কিস্তির চাইতে বেশি টাকা দিয়ে প্রিন্সিপাল অ্যাডজাস্টমেন্ট করে নিজেদের মালিকানা বাড়িয়ে নিতে পারে। এছাড়া সম্পত্তি বা প্রপার্টির ভ্যালুয়েশন যদি বাজারে বাড়ে, তবে ব্যাংক এবং গ্রাহক উভয়েই সেই আনুপাতিক মালিকানার সুবিধা ভোগ করে; যা অন্যান্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। তবে শরী’আহ নিশ্চিত করে যে, ব্যাংক কোনোভাবেই চক্রবৃদ্ধি হারে মুনাফা বা পেনাল্টি চার্জ করতে পারবে না। এ প্রক্রিয়া গ্রাহককে আর্থিক শোষণের হাত থেকে অনেকটা নিরাপদ রাখে।
ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে আপনারা সর্বোচ্চ কত টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দিচ্ছেন? এক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহককে অগ্রাধিকার দেয়া হয়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন পলিসি অনুযায়ী ইসলামী ব্যাংক ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন বা বিনিয়োগ প্রদান করে থাকে। মোট প্রপার্টি মূল্যের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক বহন করে, অর্থাৎ ফ্ল্যাটের মুল্য ১ কোটি টাকা হলে ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ৭০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ সহায়তা পেতে পারে। ইসলামী ব্যাংক সবার ব্যাংক। হোম ফাইন্যান্সিং যেহেতু সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগ, তাই বিনিয়োগ পাওয়ার যোগ্য সব গ্রাহককেই বিবেচনায় নেয়া হয়। এরমধ্যে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রতিষ্ঠিত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি বা স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পেশাজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রবাসীদের মধ্যে যারা নিয়মিত বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠান এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে যাদের কমপক্ষে দুই বছরের ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, স্বচ্ছ ব্যাংক লেনদেন রয়েছে— তারাও ব্যাংকের কাছে নির্ভরযোগ্য গ্রাহক হিসেবে গণ্য হন।
পর্যাপ্ত জামানত ও সম্পদভিত্তিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর হোম ফাইন্যান্সিং সম্প্রসারণ তুলনামূলকভাবে ধীরগতির। এ পেছনে কারণ কী?
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা বেশ জটিল। জমির দলিল থেকে শুরু করে খতিয়ান, জরিপ, খাজনা-দাখিলাসহ কাগজপত্র অনলাইনভিত্তিক না হওয়ায় সহজে বিনিয়োগ প্রদান প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া প্রচলিত ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংক কেবল টাকা ধার দেয় না, বরং ‘বাই-মুয়াজ্জল’ বা ‘এইচপিএসএম’ পদ্ধতিতে তারা সরাসরি সম্পদের মালিকানায় অংশ নেয়, ফলে যাচাই বাচাই করার জন্য কিছুটা বাড়তি সময় লেগে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের মাঝে সচেতনতার অভাব থাকায় তারা ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী সব নথিপত্র জমা দিতে পারে না, যা যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরো দীর্ঘায়িত করে।
ইসলামী হোম ফাইন্যান্সিংয়ে আপনাদের খেলাপির হার কেমন? কোন শ্রেনি গ্রাহকদের মধ্যে খেলাপির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি?
ইসলামী ব্যাংকের আবাসন খাতে বিনিয়োগে খেলাপির হার সাধারণ বিনিয়োগের তুলনায় বেশ কম থাকে। হোম ফাইন্যান্সিংয়ে বিনিয়োগের বিপরীতে আমাদের রিকোভারির হার ৯৩-১০০ শতাংশ। হোম ফাইন্যান্সিং সম্পদ ভিত্তিক হওয়ায় ব্যাংক ও গ্রাহক সম্পদের মালিকানায় অংশ নেয়। শরী’আহ ভিত্তিক ‘হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিল্ক’ হওয়ার ফলে প্রাপ্ত ভাড়া থেকে গ্রাহক কিস্তির টাকা পরিশোধ করে; যা গ্রাহককে খেলাপি থেকে রক্ষা করে।
ইসলামী হোম ফাইন্যান্সিং সম্প্রসারণে কোনো নীতিগত বা শরিয়াহসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কি?
ইসলামী হোম ফাইন্যান্সিং মূলত ডিমিনিশিং মুশারাকা, বাই-মুয়াজ্জাল ও ইজারার সমন্বয়ে শরী’আহ সম্মত মডেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা গ্রাহককে সুদমুক্ত প্রকৃত সম্পদের মালিকানা নিশ্চিত করে। ইসলামী হোম ফাইন্যান্সিং সম্প্রসারণে শরী’আহ সংক্রান্ত তেমন প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে ডকুমেন্টেশন সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে সে ক্ষেত্রে বিলম্বিত হতে পারে।