গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ফ্ল্যাট, বাড়ি ক্রয় নির্মাণ ও সম্প্রসারণে ঋণ দিচ্ছে ইউসিবি

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি) গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ফ্ল্যাট, বাড়ি ক্রয়, নির্মাণ, সম্প্রসারণ এবং সংস্কার এর জন্য হোম লোন প্রদান করে থাকে।

হোম লোন দেয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের প্রডাক্টগুলো কী? কত শতাংশ সুদে গ্রাহকরা ঋণ পাচ্ছেন?

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি) গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী ফ্ল্যাট, বাড়ি ক্রয়, নির্মাণ, সম্প্রসারণ এবং সংস্কার এর জন্য হোম লোন প্রদান করে থাকে। বর্তমানে ইউসিবিতে নতুন গ্রাহকদের জন্য সুদের হার ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান হোম লোন স্থানান্তরের (টেকওভার) ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ সুদহার প্রযোজ্য।

ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণের আবেদন করলে গ্রাহক সেটি কত দিনের মধ্যে পান?

ফ্ল্যাট বা বাড়ি ক্রয়, নির্মাণের জন্য ঋণ আবেদনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আয়-সংক্রান্ত প্রমাণ এবং সম্পত্তির মালিকানা-সংক্রান্ত দলিল যথাযথভাবে প্রদান সাপেক্ষে ইউসিবিতে গ্রাহকরা পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদন পেয়ে থাকেন।

এ ঋণের মেয়াদ কত দিনের হয়। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহার নির্ধারিত না ভাসমান?

ইউসিবিতে গ্রাহকের পেশা, বয়স, ঋণের উদ্দেশ্য, আয়ভিত্তিক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং আর্থিক পরিকল্পনা অনুযায়ী হোম লোন সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত প্রদান করা হয়। বর্তমানে ঋণের সুদহার ভাসমান, যা বাজার পরিস্থিতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়।

সুদের হার বাজার দরের সঙ্গে ওঠানামা করায় গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। এক্ষেত্রে আপনার মতামত কী?

বর্তমানে সুদের হার সম্পূর্ণভাবে বাজারনির্ভর এবং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি, নীতিগত সুদের হার এবং ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। হোম লোন সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হলেও এর অর্থায়ন মূলত স্বল্পমেয়াদি আমানত থেকে আসে। বাজারে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের ব্যয়ও বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংককে সুদের হার সমন্বয় করতে হয়, যা রি-প্রাইসিং নামে পরিচিত। দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের পর্যাপ্ত উৎস এবং বিকল্প ফান্ডিং ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে এ অসামঞ্জস্যতা হয়তো সামনেও বহাল থাকবে। তবে ইউসিবি এসব ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আগাম অবহিত করে এবং প্রয়োজনে কিস্তি বা ঋণের মেয়াদ সমন্বয়ের সুযোগ দেয় যাতে চাপটা সহনীয় পর্যায়ে থাকে।

ফ্ল্যাট কেনায় আপনারা কত টাকা পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছেন। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহককে অগ্রাধিকার দেন?

গ্রাহকের আর্থিক যোগ্যতা, আয়ভিত্তিক পরিশোধ সক্ষমতা, বর্তমান পেশা এবং আর্থিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে নির্বাচিত সম্পত্তির মূল্যের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ (প্রবাসীদের জন্য ৭৫ শতাংশ) পর্যন্ত ঋণ প্রদান করা হয়, যা বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়ের উৎস থাকা চাকরিজীবী, ডাক্তার, পেশাজীবী, দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং সম্পর্কযুক্ত ব্যবসায়ী এবং প্রবাসীদের আমরা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।

পর্যাপ্ত জামানত থাকায় হোম লোন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে স্বীকৃত। তার পরও দেশের ব্যাংকগুলো এ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ বোধ করছে না কেন?

হোম লোনে সাধারণত গ্রাহকের নিজস্ব আবাসন প্রয়োজন জড়িত থাকে, ফলে ঋণ পরিশোধে গ্রাহকের অঙ্গীকার ও শৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। দীর্ঘমেয়াদি হলেও এ ঋণের ডিফল্ট প্রবণতা সাধারণত কম, যা ব্যাংকের সামগ্রিক ঋণ পোর্টফোলিওকে স্থিতিশীল করে এবং ঝুঁকি বৈচিত্র্যকরণে সহায়তা করে।

হোম লোন প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংককে সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ ও ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করে সম্পত্তির মালিকানা, দলিলের সত্যতা ও আইনি অবস্থা যাচাই করতে হয়। এ কাজে ব্যাংককে নিবন্ধিত আইনজীবী, ভূমি ও রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল। ফলে এর সম্প্রসারণ এখনো সীমিত। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে অনেক এলাকায় এখনো জমির রেকর্ড, মালিকানা দলিল এবং আইনগত অবকাঠামো পর্যাপ্তভাবে আধুনিকায়ন হয়নি। ফলে প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ব্যাংকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ২-৪ কোটি টাকায় উন্নীত করেছে। এ সিদ্ধান্তে বাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

এ সিদ্ধান্তে সামগ্রিক হোম লোন বাজারে বড় ধরনের সম্প্রসারণ হবে বলে মনে হয় না। কারণ এর আগেই নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৪ কোটি টাকা বা তার বেশি পরিমাণের হোম লোন প্রদান করে আসছিল। ফলে এ নীতিগত পরিবর্তন উচ্চমূল্যের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো সুযোগ সৃষ্টি করছে না। তবে ব্যাংকের তুলনামূলক কম সুদের সুবিধার কারণে কিছু ভালো ক্রেডিট প্রোফাইলের গ্রাহক নন-ব্যাংক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকের দিকে আসতে পারেন। মূলত উচ্চমূল্যের আবাসন ক্রেতারাই এতে বেশি উপকৃত হবেন।

এছাড়া নতুন করে বড় আকারের চাহিদা সৃষ্টির সুযোগও সীমিত। কারণ ৩-৪ কোটি টাকার ঋণের মাধ্যমে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা খুব অল্পসংখ্যক পরিবারেরই রয়েছে। এর সঙ্গে জমির মূল্য, রেজিস্ট্রেশন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বড় অংকের আবাসন বিনিয়োগে মানুষ এখনো সতর্ক অবস্থানে আছে। ফলে সামগ্রিক হোম লোন বাজারে বড় ধরনের সম্প্রসারণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

হোম লোন নিয়ে টাকা ফেরত দিচ্ছেন না এমন গ্রাহকের সংখ্যা কেমন? কোন ধরনের গ্রাহকরা সাধারণত কিস্তি দিতে বেশি গড়িমসি করছেন?

হোম লোনের খেলাপির হার সামগ্রিকভাবে সন্তোষজনক ও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণত অনিয়মিত আয়, দুর্বল আর্থিক পরিকল্পনা এবং পেশাগত অনিশ্চয়তা থাকা গ্রাহকরা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অন্যদিকে নিয়মিত আয়ের চাকরিজীবী, ডাক্তার এবং পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে খেলাপির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।

হোম লোনের সম্প্রসারণে নীতিগত কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কী?

দেশে হোম লোনের সম্প্রসারণে বিভিন্ন কাঠামোগত, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা আছে। জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই, দলিলের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং আইনি জটিলতা নিরসনে দীর্ঘসূত্রতা, রেজিস্ট্রেশন ব্যয় বেশি হওয়া, দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের ঘাটতি হোম লোন সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। জেলা পর্যায়ে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ঋণ ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনে জামানত নগদায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় হোম লোন কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাংকের ঝুঁকি ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা এ খাতের সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে সাম্প্রতিক নীতিগত সংস্কার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের হোম লোন বাজার আরো বিস্তৃত, গতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে আশা করা যায়।

আবাসন কোম্পানিগুলো কী ধরনের প্রদক্ষেপ নিলে হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে?

দেশে হোম লোনের বাজার আরো বাড়ানোর জন্য আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিভাগের পাশাপাশি অন্য জেলা শহরগুলোয়ও যদি পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে, তাহলে সেখানকার গ্রাহকরা ভালো মানের বাড়ি, ফ্ল্যাট ক্রয়ের সুবিধা পাবে এবং হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণ হবে। এছাড়া সরকার ও আবাসন খাতের মধ্যে পাবলিক প্রাইভেট যৌথ উদ্যোগে আবাসন মডেলের মাধ্যমে সরকারি জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে শুধু ফ্ল্যাটের মূল্য ও আর্থিক ঝুঁকিই কমবে না, বরং সরকারি তদারকি ও বেসরকারি খাতের দক্ষতার সমন্বয়ে ফ্ল্যাটের গুণগত মানও আরো উন্নত হবে, রেজিস্ট্রেশন ও বন্ধকি কার্যক্রম আরো সহজ হবে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হোম লোন প্রদানে আরো উৎসাহী হবে।

আরও