বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন?
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোগটি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার অভাব এবং দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া। হেপাটাইটিস বি ও সি অনেক সময় বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরে থাকে। ফলে অধিকাংশ মানুষ জানতেই পারে না যে তারা ভাইরাস বহন করছে। যখন লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতা দেখা দেয়, তখন তারা চিকিৎসকের কাছে আসে। এর মধ্যে রোগ অনেক দূর এগিয়ে যায়।
চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে হেপাটাইটিস চিকিৎসার বেশির ভাগ সুবিধা বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। এতে চিকিৎসা করাতে সময়, অর্থ ও শ্রম—সবই ব্যয় হয়। অনেকেই এ কারণে চিকিৎসা শুরুই করেন না।
হেপাটাইটিস নির্মূল করতে হলে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও গণসচেতনতা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি চিকিৎসা শহরের বাইরে বিস্তৃত করা না যায়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো মা থেকে নবজাতকের মধ্যে সংক্রমণ। তাই প্রতিটি গর্ভবতী নারীর অন্তত একবার হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এটি খুবই সাধারণ একটি পরীক্ষা, কিন্তু এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের একটি শিশুকে আজীবনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য শুধু চিকিৎসকদের নয়, গাইনি বিশেষজ্ঞ, ধাত্রী ও অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে এ বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচির অংশ হিসেবেই হেপাটাইটিস স্ক্রিনিংকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। বিশেষ করে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে বার্থ ডোজ দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো শিশু যদি জন্মের সময় বা শৈশবে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, তাহলে তার ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
শুধু নিয়মিত টিকাদান নয়, যেসব শিশু জন্মের সময় বার্থ ডোজ নিতে পারেনি, তাদেরও খুঁজে বের করে ক্যাচআপ ভ্যাকসিনেশন নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে এ বিষয়টির ওপর আরো গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। হেপাটাইটিস বি ও সি চিকিৎসায় রোগীরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন?
হেপাটাইটিস চিকিৎসার সবচেয়ে বড় বাধা হলো খরচ। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন। হেপাটাইটিস বি রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন, কখনো কখনো সারা জীবন ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু অনেক রোগী অর্থনৈতিক কারণে মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে হেপাটাইটিস সি এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ। কিন্তু কার্যকর ওষুধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ফলোআপ মিলিয়ে চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসা শুরু করতে পারে না। তাই সরকারিভাবে ওষুধে ভর্তুকি, দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং সরকারি হাসপাতালে সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কেন জাতীয় হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ কৌশলের আওতায় আনা জরুরি?
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তারা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এবং ভবিষ্যতে কতদিন থাকবেন, সেটিও অনিশ্চিত। তাই এ জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রেখে জাতীয় হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সফল করা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিয়মিত স্ক্রিনিং, চিকিৎসা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। এটি শুধু তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নয়, বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হেপাটাইটিস নির্মূলে সরকারের প্রতি আপনার প্রধান সুপারিশ কী?
আমার মতে, প্রথমেই একটি শক্তিশালী জাতীয় হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে। এর আওতায় দেশব্যাপী স্ক্রিনিং কর্মসূচি, গর্ভবতী নারীদের বাধ্যতামূলক হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা, নবজাতকের জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বার্থ ডোজ নিশ্চিত করা এবং ক্যাচআপ ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সম্প্রসারণ, ওষুধ সহজলভ্য করা এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
এছাড়া গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো জরুরি। সময়মতো সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্যে বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় কী ধরনের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে?
প্রতিষ্ঠানটি জাকাত ফান্ডের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দিচ্ছে। ঢাকার পাশাপাশি সিলেটেও এ সেবা চালু হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় হেপাটাইটিস পরীক্ষা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, টিকাদান এবং সরকারি শিশু পরিবারে থাকা প্রায় চার হাজার এতিম শিশুর বিনামূল্যে স্ক্রিনিং ও টিকাদান সম্পন্ন করেছে।