প্রফেসর ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, নীতিমান ও দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান একজন ব্যক্তি। তার ছিল বন্ধুসুলভ মনোভাব ও সহজ-সরল প্রকৃতি। সর্বদা সবার মঙ্গল চিন্তা করতেন। আমিরুল ইসলাম সাহেব আমার স্কুলজীবনের বন্ধুর শ্যালক। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে যায়। সেই থেকেই মূলত আমরা একসঙ্গে চলেছি। ’৭০, ’৮০ ও ’৯০-এর দশকে আমাদের এক ধরনের আড্ডা হতো। বিষয়বস্তু ছিল দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজ। দেশে কীভাবে উন্নতি করা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, শিক্ষার মান কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব বিষয়ে আমরা দৃঢ়ভাবে আলোচনা করতাম। আমিরুল ইসলামের সঙ্গে আমার সেই সব বিষয়ে আলাপ হতো।
১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির কারণ উদ্ঘাটন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন আমিরুল ইসলাম সাহেব। তিনি একটি অত্যন্ত সাহসী প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নগর গবেষণা—বিশেষ করে মিউনিসিপ্যাল ফাইন্যান্স—বিষয়ে তার গভীর আগ্রহ ছিল। পিপিআরসির সঙ্গে তিনি জন্মলগ্ন থেকেই জড়িত ছিলেন। আমাদের নানা ধরনের সভা‑সেমিনারে অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি অনেক গবেষণা প্রকল্পেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
২০০৮ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যখন আমি শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন তিনিই প্রথম আমাকে মঙ্গাপীড়িত রংপুর অঞ্চলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রংপুরে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি আমিরুল ইসলামের অবদানের কথা স্মরণ করেছি।
অনেক দিন তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না। সম্প্রতি তিনি আমাকে দেখতে এসেছিলেন। এতদিন পর তার মতো একজন মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে আমি অপার আনন্দ অনুভব করেছিলাম।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—দুই জীবনেই তিনি প্রতিভার ছাপ রেখেছেন। আমার মতে, আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর মতো শিক্ষকদের প্রচেষ্টার ফলে তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগ একটি সম্মানিত ও আকর্ষণীয় বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমিরুল ইসলাম চৌধুরী তার পুরো পরিবার নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেন। এতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি প্রতিদিনের দায়িত্ববোধ পুরো নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। তার এ দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠা আমাদের উদ্দীপনা জুগিয়েছে। তিনি অত্যন্ত সম্মান দিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতেন। আমাকে সর্বদা ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন। অন্যকে সম্মান দেয়া ছিল তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তার এ ব্যক্তিত্ব অনেককে আকৃষ্ট করেছিল।
‘রাশভারি’ বিশেষণটি তার ক্ষেত্রে একদমই খাটে না। জ্ঞানবর্জিত আড্ডায়ও তার সাবলীল উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। শিক্ষকতা ও গবেষণার বাইরেও বন্ধু মহলে তিনি প্রাণবন্ত ও আন্তরিক ছিলেন।
পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সফল অর্থনীতিবিদ। আমি ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলাম তার সম্পর্কে, সেখানে অনেকে মন্তব্য করেছিলেন। তার ছাত্রছাত্রীরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমি দেখেছি, দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই লিখেছেন, আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন তাদের প্রিয় শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তার মনে ছিল এক স্নেহময় স্থান। মিউনিসিপ্যাল ফাইন্যান্স নিয়ে আমার তার সঙ্গে একাডেমিক লেনদেনও হয়েছে। তার গবেষণা প্রবন্ধ এবং গ্রন্থগুলোতে মেধার ছাপ স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
যেকোনো মিউনিসিপ্যাল ফাইন্যান্স‑সংক্রান্ত সমস্যায় আমরা তাকে স্মরণ করতাম। এটি ছিল তার একটি বিশেষ দক্ষতা। নগরায়ণের শুরু থেকেই—বিশেষ করে মিউনিসিপ্যাল ফাইন্যান্স নিয়ে—তিনি জোরালোভাবে কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দিকনির্দেশনামূলক গবেষণা এবং নীতিপরামর্শ তৈরি করেছিলেন। এজন্য তিনি অত্যন্ত ধন্য ও প্রশংসার দাবিদার।
শিক্ষকতার বাইরে তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি তদন্তে গঠিত কমিটিতে কাজের সুযোগ পেয়ে, রাজনৈতিক চাপের তোয়াক্কা না করে তিনি অত্যন্ত সাহসী ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছিলেন। পেশাদারত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরবর্তী সময়ে তার প্রতিবেদন অনুযায়ী নীতিনির্ধারকরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হন। তবু তিনি পেশাদারত্ব, নৈতিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল সহজ। আমরা শুধু একাডেমিক আলোচনা করতাম না। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বিষয়াবলি নিয়েও প্রায়ই তার সঙ্গে কথা হতো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল, উৎসাহী ও সহজ—আড্ডার একজন বন্ধুসুলভ মানুষ।
আমার মনে হয়, আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো নৈতিক উচ্চতা। আমাদের সমাজ, রাজনৈতিক ও পেশাদার ক্ষেত্রে নৈতিক উচ্চতার অভাব রয়েছে। তার জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়—একটি সফল জীবন। নৈতিক উচ্চতার যে বার্তাটি তিনি জাতি ও দেশকে দিয়েছেন তা আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
তিনি বহুমাত্রিকভাবে একজন সফল শিক্ষক, পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক, বন্ধু এবং হাস্যোজ্জ্বল মানুষ। যদি তার সারা জীবনের মর্মার্থ তুলে ধরা যায়, তাহলে স্পষ্ট হবে—তিনি সমাজকে নৈতিক উচ্চতার একটি বার্তা দিয়েছেন।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: নির্বাহী চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা