জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান খুব সামান্য হলেও এর বিরূপ প্রভাবে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। এ পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন, জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় অভিযোজন এবং প্রশমন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আমাদের জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনাগুলোকে সমন্বিত কর্মসূচি, মানসম্পন্ন প্রকল্প, উপযুক্ত অর্থায়ন এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলে রূপান্তর করতে হবে। আজকের উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের জলবায়ু ঝুঁকিকে প্রভাবিত করবে। তাই বড় বিনিয়োগের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট এলাকার জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
বাংলাদেশের অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। এজন্য প্রথমেই আমাদের নিজেদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের কার্যকর সমন্বয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও টেকসই অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সমন্বয়ের মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি সবুজ অর্থনীতি গড়ে তুলতে কার্বন নিঃসরণ কমানো, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, দূষণমুক্ত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
শিল্প-কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইটিপি স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হবে। নদীদূষণ রোধে শিল্প-কারখানার বর্জ্য পরিশোধন এবং পরিবেশগত বিধিবিধান প্রতিপালন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। পরিবেশ দূষণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের সুফল যেন দেশের প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কপ৩১-এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হবে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায্য অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি নিশ্চিত করা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন উন্নয়ন, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, পরিবেশ সুরক্ষা ও মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা পরস্পরের পরিপূরক হবে।