বিশ্বব্যাপী দ্রুত ও গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ব্যাংক খাত। টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাংক খাতেও এখন ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণের চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত নবায়ন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক ন্যায্যতা ও পরিবেশগত দায়িত্ববোধ। বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে এ রূপান্তরের বড় দাবিদার এখন প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। প্রাইম ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ সিদ্ধান্ত ব্যবস্থা, সবুজ অর্থায়নে সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ, টেকসই অর্থায়ন ও দায়িত্বশীল করপোরেট আচরণের মধ্য দিয়ে রূপান্তর বাস্তবায়ন করছে ব্যাংকটি।
তাদের ভাষ্যমতে, প্রাইম ব্যাংক কেবল লাভজনক ঋণ প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল উদ্যোগকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দ্বিতীয় প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকটি।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। একই সময়ে ৩৫ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে ব্যাংকটি। গত বছরে প্রাইম ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৭৪৪ কোটি টাকা। শেয়ারধারীদের মালিকানার বিপরীতে আয় (আরওই) ছিল ২০ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) ছিল ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকায়।
প্রাইম ব্যাংক দায়িত্বশীল ব্যাংক হিসেবে ২০৫০ সালের মধ্যে শূন্য কার্বন নিঃসরণ নিশ্চিত করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সঙ্গে একাত্ম। এর আওতায় ঋণ পোর্টফোলিও, বিনিয়োগ কার্যক্রম ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাসহ প্রতিটি স্তরে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। এটি শুধু প্রাইম ব্যাংকের নয়, বরং দেশের সামগ্রিক টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, প্রাইম ব্যাংক আর্থিক সেবা প্রদানের পাশাপাশি সমাজ ও পরিবেশের উন্নয়নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অর্থায়ন, জ্বালানিসাশ্রয়ী অফিস ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং গ্রিন ফাইন্যান্স পণ্যের সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের ভিত্তিতে একটি সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশ নির্মাণে ভূমিকা রাখছে ব্যাংকটি।
প্রাইম ব্যাংক পিএলসি প্রকাশিত ‘রেজিলিয়েন্স: আ ব্লুপ্রিন্ট ফর দ্য ফিউচার: সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্ট ২০২৪’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেমে সক্রিয়তা বাড়াতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকটি। ‘মাইপ্রাইম’ অ্যাপের মাধ্যমে যেকোনো সময়ে যেকোনো স্থান থেকে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারছেন গ্রাহকরা। ‘প্রাইমপ্লাস’ অ্যাপের মাধ্যমে শাখায় না গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং (এমএল) ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং-নির্ভর (এনএলপি) স্মার্ট চ্যাটবটের মাধ্যমে গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন, গ্রাহক অনবোর্ডিং, বিক্রয়, প্রচারণাসহ আরো নানা সেবা দেয়া হচ্ছে। নারীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘নীরা’ প্লাটফর্ম। নিরাপদ ও সহজ ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিতে ব্যবহার হচ্ছে এটিএম, কার্ড ও বায়োমেট্রিক সেবা। এর পাশাপাশি দেশব্যাপী ১৫০টি শাখা, ১০টি উপশাখা, ২৩১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ১৬৬টি এটিএম ও সিআরএমের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকটির গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন প্রাইম ব্যাংকের প্রায় তিন হাজার কর্মী।
প্রাইম ব্যাংক জানায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন খাতে প্রাইম ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রম সমাজে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে। আর্থিক ও সামাজিক খাতে এসব অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এক ডজনেরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে ব্যাংকটি। এর মধ্যে রয়েছে পরপর তিনবার বাংলাদেশ ব্যাংকের টপ সাসটেইনেবল ব্যাংক স্বীকৃতি (২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪), গ্লোবাল বিজনেস স্বীকৃত বেস্ট এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবল ব্যাংক (২০২৪), ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ডস বেস্ট এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবল ব্যাংক (২০২৪), গ্লোবাল বিজনেস ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ডস স্বীকৃত বেস্ট সিএসআর ব্যাংক (২০২৪), গ্লোবাল ব্র্যান্ডস ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ডস স্বীকৃত বেস্ট ব্যাংক ফর সিএসআর ইনিশিয়েটিভ (২০২৩), এডিবি ট্রেড অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স প্রোগ্রাম (এডিবি টিএসসিএফপি) অ্যাওয়ার্ডস বেস্ট গ্রিন ডিল (ইস্যুয়িং ব্যাংক) (২০২৩), দ্য অ্যাসেট ট্রিপল এ অ্যাওয়ার্ডসের বেস্ট সিন্ডিকেটেড লোন, এনার্জি এফিসিয়েন্সি (২০২৪), গ্লোবাল ট্রানজেকশন ব্যাংকিং ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডসের আউটস্ট্যান্ডিং সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স সলিউশন (২০২৩), এশিয়ামানি, ইউরোমানি অ্যান্ড গ্লোবাল বিজনেস অ্যান্ড ফাইন্যান্স ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ডসের বেস্ট ব্যাংক ফর ইএসজি (২০২৩, ২০২৫) ইত্যাদি।
টেকসই ভবিষ্যতের পথে চ্যালেঞ্জ অনেক হলেও এ বিষয়ে প্রাইম ব্যাংকের অঙ্গীকার আরো দৃঢ় বলে দাবি করছেন প্রাইম ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্যমতে, নীতিমালা, প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীল আর্থিক চর্চার সমন্বয়ে ব্যাংকটি দেশের ব্যাংক খাতে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে। এ যাত্রা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি একটি জাতির টেকসই উন্নয়নের অভিযাত্রা। প্রাইম ব্যাংক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, এসব উদ্যোগ আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, সমতাভিত্তিক ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। এ বিষয়ে প্রাইম ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরীর বক্তব্য হলো ‘বহু চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সততার সঙ্গে সেবা প্রদান, দূরদর্শিতার সঙ্গে উদ্ভাবন এবং দায়িত্বশীল প্রবৃদ্ধির পথে প্রাইম ব্যাংক অবিচল রয়েছে। আমাদের রূপান্তর যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্থিতিস্থাপকতা, যা ডিজিটাল আধুনিকায়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবা এবং টেকসই অর্থায়নে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমরা ১৫টি মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড বা স্বীকৃতি পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, প্রাইম ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি কেবল আর্থিক পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন (ইএসজি) নীতিমালাকে করপোরেট কৌশলের কেন্দ্রে স্থাপন করাই আমাদের দায়িত্বশীল ব্যাংকিং দর্শনের মূল ভিত্তি।’
তানজিল চৌধুরী বলেন, ‘সবুজ অর্থায়ন সম্প্রসারণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা একটি ন্যায্য ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করছি। স্থিতিস্থাপকতা মানে কেবল প্রতিকূলতা মোকাবেলা নয়; বরং দূরদর্শী প্রস্তুতি, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং সততার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা।’