নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ৩২ মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে ওয়ালটন। লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০ মেগাওয়াট। পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি, পানি পুনর্ব্যবহার, প্লাস্টিক ও ধাতব বর্জ্য রিসাইক্লিং, বায়োগ্যাস, পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশের শিল্প খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও শিল্পবর্জ্যের পরিবেশগত প্রভাবও বাড়ছে। এ বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রিসাইক্লিং, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে টেকসই শিল্পায়নের পথে এগোচ্ছে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি।
প্রতিষ্ঠানটির টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে অনেকগুলো ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিনহাউজ গ্যাস বা জিএইচজি নিঃসরণ হ্রাস, পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট, বর্জ্য হ্রাস ও পুনর্ব্যবহার, বায়োগ্যাস ও কম্পোস্ট উৎপাদন, পানি শোধন ও পুনর্ব্যবহার, কার্যকর নিরাপত্তা সংস্কৃতি এবং কর্মীদের কল্যাণ।
সৌরবিদ্যুতে ৫০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য
ওয়ালটনের পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশজুড়ে রয়েছে সৌরবিদ্যুৎ। গাজীপুরের চন্দ্রায় প্রতিষ্ঠানটির হেডকোয়ার্টার্সে ধাপে ধাপে ৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এ সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২ দশমিক ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এটি দেশের সর্ববৃহৎ ফ্লোটিং সোলার পাওয়ার প্লান্ট। পাশাপাশি কারখানার ছাদ ও ফুটপাত এলাকায় স্থাপিত সোলার প্লান্টের মোট সক্ষমতা ২৯ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, জিএইচজি নিঃসরণ হ্রাস, বাংলাদেশের জলবায়ু প্রতিশ্রুতিতে সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ কার্বন বাজারের সুযোগ কাজে লাগানোর দিকে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
পণ্যেও জ্বালানি দক্ষতার ওপর জোর
টেকসই উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকৃত পণ্যের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়ালটন। বিশেষ করে রেফ্রিজারেটরে ইনভার্টার প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব আর৬০০এ রেফ্রিজারেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও হ্রাস পায়।
২০১৫-২২ সাল পর্যন্ত ইনভার্টার কম্প্রেসর ও ডিজাইন উন্নয়নের মাধ্যমে রেফ্রিজারেটরের বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে। এ সময়ে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ হাজার ৫১৫ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়েছে। গড়ে বার্ষিক সাশ্রয় ১৮৯ গিগাওয়াট ঘণ্টা, যা প্রায় ২২ মেগাওয়াট ধারাবাহিক বিদ্যুৎ চাহিদা কমানোর সমতুল্য।
২০২২-২৬ সময়ে প্রতি রেফ্রিজারেটরের বার্ষিক গড় বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪৪৫ কিলোওয়াট ঘণ্টা থেকে ৩০৫ কিলোওয়াট ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়েছে। গবেষণা ও পণ্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে এ সময়ে আরো প্রায় ৩০ শতাংশ দক্ষতা অর্জিত হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার আরো ১০-২০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। ২০ লাখ রেফ্রিজারেটরের ক্ষেত্রে এতে বছরে প্রায় ১০০ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্লাস্টিক, পিইটি ও ধাতব বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার
শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সার্কুলার ইকোনমির ধারণা অনুসরণ করছে ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত প্রায় ৬০ হাজার একবার ব্যবহারযোগ্য পিইটি বোতল বছরে পুনর্ব্যবহার করে প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত পিইটি বেল্ট তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ৫০০ টন ক্রাশড পিইটি ফ্লেক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে পিইটি বেল্টে রূপান্তর করা হয়।
প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ২০০ টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে বিভিন্ন নন-ফাংশনাল যন্ত্রাংশ তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া বছরে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টন ধাতব স্ক্র্যাপ পুনর্ব্যবহার করা হয়।
বছরে ২৫ কোটি লিটার পানি শোধন
পানি ব্যবস্থাপনাও ওয়ালটনের টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠানের ইটিপিতে বছরে প্রায় ২৫ কোটি লিটার পানি শোধন করা হয়। এর প্রায় ৮০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে সহায়তা করছে।
ইটিপিতে পরিশোধিত পানি গাড়ি ধোয়া, টয়লেট ও ইউরিনাল ফ্লাশিং এবং সবুজ এলাকায় সেচকাজে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ঘণ্টায় পাঁচ ঘনমিটার বর্জ্যপানি শোধন সক্ষমতার এসটিপি পরিচালিত হচ্ছে।
জৈব বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও কম্পোস্ট
জৈব বর্জ্যও পুনর্ব্যবহারের আওতায় এনেছে ওয়ালটন। বায়োগ্যাস প্লান্টে জৈব বর্জ্য থেকে তিন হাজার ঘনফুট বায়োগ্যাস উৎপাদন করে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বছরে ১০০ টনের বেশি জৈব বর্জ্য কম্পোস্টে রূপান্তর করা হয়।
কারখানায় জেনারেটরের এক্সহস্ট গ্যাস ব্যবহার করে এক্সহস্ট গ্যাস বয়লারের মাধ্যমে ঘণ্টায় দুই হাজার কেজি বাষ্প উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে। বার্ষিক হিসাবে এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট ও কার্বন হ্রাস
রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে আর৬০০এ রেফ্রিজারেন্টের ব্যবহার পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে ৩ কোটি ৩০ লাখ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ নিঃসরণ হ্রাস হয়েছে। এ প্রযুক্তি মন্ট্রিল প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি ১ হাজার ১০৫ টন সাইক্লোপেন্টেন ব্যবহারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে।
নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত শিল্প ব্যবস্থাপনা
সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সোশ্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এসইএমএস পরিচালনা করছে ওয়ালটন। এর আওতায় সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট, মনিটরিং, রিপোর্টিং এবং কর্মীদের কল্যাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আইএসও ৯০০১, আইএসও ৪৫০০১:২০১৮ ও আইএসও ১৪০০১:২০১৫-এর পাশাপাশি লিড সনদ অর্জন করেছে। পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার ২০১৮, গ্রিন ফ্যাক্টরি অ্যাওয়ার্ড ২০২৩ ও ২০২৫ এবং ইএসজি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬-সহ বিভিন্ন স্বীকৃতি পেয়েছে ওয়ালটন।
টেকসই শিল্পায়নে নীতিসহায়তার প্রয়োজন
শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তির বিস্তার বাড়াতে বাজার তদারকি শক্তিশালী করা, বাধ্যতামূলক স্টার রেটিং কার্যকর করা এবং উচ্চ দক্ষতার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
বেসরকারি খাতে টেকসই বিনিয়োগ বাড়াতে স্পষ্ট কার্বন মার্কেট কাঠামো, গ্রিন ফাইন্যান্সিং সুবিধা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কর-প্রণোদনা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নীতিসহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দেশের শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, প্রতি ইউনিট পণ্য তৈরিতে কতটা জ্বালানি, পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার হচ্ছে এবং কতটা বর্জ্য পুনরায় উৎপাদন চক্রে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে, এসব বিষয়ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে উঠছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, রিসাইক্লিং ও সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারে ওয়ালটনের উদ্যোগ দেশীয় শিল্পের টেকসই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠছে।
ছবি: ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি.