বরিশালের কৃষি ও বাণিজ্য

প্রাচীন ‘চন্দ্রদ্বীপ’ বর্তমানে বরিশাল নামে পরিচিত। কোনো এলাকার নামের মাঝেই লুকিয়ে থাকে সেখানকার মানুষ, তাদের জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাস। বরিশালের নামকরণ নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে। যেমন কেউ কেউ বলে, এখানে এককালে বড় বড় শাল গাছ ছিল, সেই ‘বড় শাল’ থেকে কালক্রমে বরিশাল। পর্তুগিজ বেরি ও শেলির প্রেম কাহিনী থেকে ‘বরিশাল’ এসেছে— এমনও বলা হয়। তবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মতবাদ হচ্ছে, এখানে বড় বড় লবণের গোলা ছিল। যেহেতু সমুদ্র বেশি দূরে নয়, লবণের গোলা থাকা অসম্ভব নয়। এবং এই লবণের দানা বেশ বড় হতো। বড় বড় লবণচৌকির কারণে ইংরেজ-পর্তুগিজরা এ অঞ্চলকে ‘বরিসল্ট’ বলত এবং কালক্রমে আজ তা বরিশাল হয়েছে।

এখানেই দেখা যাচ্ছে, নামের সঙ্গেই এই ভূমির মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাসের যোগ আছে। বরিশালের মানুষ, সেখানকার কৃষি আর ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে যাওয়ার আগে ভূখণ্ডের অবস্থান এবং প্রকৃতি সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যাক। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে কীর্তনখোলা নদীর তীরে ২১ ডিগ্রি থেকে ২৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯ ডিগ্রি থেকে ৯১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমায় অবস্থিত জেলাটি। এ শহরের আয়তন ৯৩ দশমিক ৬৩ বর্গকিলোমিটার। বরিশাল নিয়ে কথা বলতে হলে কেবল বরিশাল জেলার মধ্যে সে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন। কেননা, প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ, বাকলা আজকের বৃহত্তর বরিশাল। অর্থাৎ বরিশাল বিভাগ। বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর এর অন্তর্গত। বিভাগের আওতায় রয়েছে ছয়টি জেলা, ৩৮টি থানা, ৩২৩টি ইউনিয়ন, ৩ হাজার ২৩৭টি গ্রাম ও ১১টি পৌরসভা।

প্রবাদে আছে, ‘ধান-নদী-খাল, এই তিনে বরিশাল’। বরিশাল বিভাগটির মাঝে শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে আছে অনেক নদ-নদী। এক জেলা থেকে আরেক জেলাকে পৃথক করে রেখেছে এসব নদ-নদী। খোদ বরিশাল জেলাকে দুই ভাগ করেছে কীর্তনখোলা নদী। নদীর এক পাড়ে গড়ে উঠেছে শহর, অন্য পাড়ে গ্রামীণ জীবন দেখা যাবে। নদীবিধৌত এ অঞ্চলের মাটি, পলি জমে উর্বর। যদিও মাটিতে লবণের পরিমাণ কম নয়, তবু এখানে প্রচুর ফসল উত্পন্ন হয়। ফসলের মাঝে প্রথমেই আসে ধানের কথা। এছাড়া এখানে বিভিন্ন ধরনের ডাল, সরিষা, তিল, তিসির চাষ হয়ে আসছে বহুকাল। ইদানীং অনেকেই গম চাষ করছেন। উচ্চফলনশীল জাতের ভুট্টাও চাষ হচ্ছে। এছাড়া আছে পান। বরিশালের বিস্তৃত ধানি জমির মাঝে মাঝে পানের বরজ দেখা যায়। উত্পন্ন হয় বিভিন্ন ধরনের সবজি। শিম, বেগুন, লাউ, কুমড়ার মতো সবজি বাড়ির আঙিনায় মাচায়ই ধরে। তবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেও আজকাল অনেকে এসব চাষ করছেন, বিশেষত টমেটো। ফলের মাঝে বরিশালে মাল্টা চাষে অনেকেই আগ্রহী।

প্রবাদ থেকেই বোঝা যায়, বরিশালের কৃষির মূল চালিকা ধান। শিল্পোন্নয়ন, নগরায়ণের কারণে আগের তুলনায় ধান চাষের পরিমাণ কমে গেলেও এখনো বরিশালের কৃষিজ পণ্যের মধ্যে ধান প্রধান। এখনো কীর্তনখোলা পার হয়ে গ্রামের দিকে গেলে রাস্তার দুই পাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত দেখা যায়। আউশ, আমন, বোরো মৌসুমে কৃষক ব্যস্ত থাকেন ধান চাষে। তবে এখন অবশ্য উচ্চফলনশীল জাতের ধানই উত্পন্ন হয় বেশি। কিন্তু বরিশালের ঐতিহ্য ‘বালাম চাল’ এখন বিলুপ্ত।

মূলত রোপা আমন মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ বালাম ধানের চাষ হতো। প্রাকৃতিক জৈব সারনির্ভর এ ধান চাষে খরচ ছিল কম। সুস্বাদু সরু বালাম চালের কদর দেশ ছাড়িয়ে পৌঁছেছিল বিদেশেও। বালাম চাল নিয়ে রচিত সেই গান এখনো শোনা যায়, ‘বাংলাদেশের অভাব কি ভাই বাংলাদেশের অভাব কি, বরিশালের বালাম চাল আর ঢাকার আছে গাওয়া ঘি।’ তখন বালাম ধানের উৎপাদন ছিল প্রতি হেক্টর জমিতে চার টনের কাছাকাছি। বালাম চাল রান্নার পর দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক থাকার কারণে এর চাহিদাও ছিল বেশি। কথিত আছে, এ অঞ্চলের বালাম চাল দেখে অবাক হয়েছিলেন চীনের পর্যটক হিউয়েন সাং। মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলার এ চালের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। সে সময় এলাকার কৃষকদের ‘বালামি’ উপাধি দিয়েছিলেন খাদ্যরসিকরা।

বালাম চাষে পরিশ্রম কম ছিল, প্রয়োজন হতো কেবল জমির সাধারণ প্রাকৃতিক উর্বরতা আর জৈব সার। কিন্তু ক্রমে জমির উর্বরাশক্তি কমতে থাকে। চাহিদা বাড়তে থাকে খাদ্যের। প্রয়োজন হয় উচ্চফলনশীল জাতের ধান চাষ করার। যেখানে বালামের উৎপাদন হেক্টরপ্রতি চার টন, সেখানে আসে ভারতীয় উচ্চফলনশীল জাত ‘ভোজন’, পরবর্তীতে ব্রি-৪৭, যার উৎপাদন হার হেক্টরপ্রতি সাত টন। কৃষক ধীরে ধীরে হাইব্রিড ধান চাষে মনোযোগ দেন। এরপর ‘বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ তৈরি করে আরো অনেক উচ্চফলনশীল জাত। খাদ্যচাহিদা ও উচ্চফলনের কারণে এসব জাতের কাছে হার মেনে বরিশালের বালাম চাল এখন রূপকথার মতো। প্রয়োজনের কাছে হয়তো ঐতিহ্য হার মানে। তাই বালাম হারিয়ে গেলেও এখন উত্পন্ন হচ্ছে উচ্চফলনশীল জাতের ধান। এবং প্রতি মৌসুমে ফসলে ছেয়ে যায় মাঠ।

বরিশালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফসল পান। বরিশালের বিস্তীর্ণ ধানি জমির মাঝে মাঝে পানের বরজ দেখা যায়। বরিশালের পানের কদর দেখা যায় দেশের বিভিন্ন জায়গায়। বরিশালের পান রসালো, তবে ঝাঁজ কম। ফলে রাজশাহীতে খাসিয়াদের উৎপাদিত পানের চেয়ে তার চাহিদা বেশি। বরিশালে ধানের পর দ্বিতীয় অর্থকরী ফসল হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে পানের আবাদ হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শীত ও ঘন কুয়াশার প্রাদুর্ভাব এবং ভারতীয় পান আমদানির পরও জেলায় পান উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৬ সালে সোয়া ৩০০ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়েছে। বরজ মালিকদের খরচ বাদে আয় হয়েছে আনুমানিক ১৫০ কোটি টাকা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বরিশালের ১০ উপজেলায় কমবেশি পান চাষ হয়। তবে গৌরনদী, উজিরপুর, আগৈলঝাড়া, বাকেরগঞ্জ ও মেহেন্দিগঞ্জে বেশি আবাদ হয়। জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়। অধিদপ্তর সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১৬ সালে জেলায় হেক্টরপ্রতি গড় ২৭ হাজার ৫৩০ পণ বা বিড়া (৮০টিতে এক পণ) পান উত্পন্ন হয়েছে। বছরে বিক্রি হয়েছে ৬ কোটি ৩৩ লাখ ১৯ হাজার বিড়া পান।

বরিশালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল সুপারি। বরিশালের বেশ কাছেই সমুদ্র হওয়ায় নারকেল, সুপারি এখানে প্রচুর উত্পন্ন হয়। সুপারি সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন লোকাল হাটে বিক্রি হয় এবং পরে তা ছড়িয়ে যায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সুপারি কাঁচা ও শুকনা আলাদাভাবে বিক্রি হয়। নারকেলের সঙ্গে এখানে সুপারির মিল আছে। যেমন ডাব ও ঝুনা নারকেল। সুপারি বিক্রির আলাদা হিসাব আছে। ২০১৬ সালের তথ্য অনুসারে কাউখালী বাজারে ২১ ঘার (২১০টি) এক কুড়ির কাঁচা সুপারি শ্রেণীভেদে ২৬০-৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তাছাড়া শুকনো সুপারি ৪০ কেজির এক মণ ৯ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হয়েছে। বরিশালের নারকেলও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল। নারকেলের চাহিদা রয়েছে দেশের সবখানে। নারকেল সাধারণত জোড়া হিসেবে বিক্রি হয়। স্থানীয় হাটে ঝুনা নারকেলের জোড়া ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হয়।

কৃষির সঙ্গেই বাণিজ্য সম্পর্কিত। বরিশালের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। ধান, পান, সুপারি, নারকেল প্রভৃতি নিয়েই বরিশালের মানুষের মূল ব্যবসা-বাণিজ্য। এখানে তাই গড়ে উঠেছে ধানের আড়ত, রয়েছে সুপারির বেপারি। গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গেলে ধানের গোলা এখন আর দেখা যায় না। কেননা ধান মাড়াইয়ের পরই তা আড়তদারের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। সেই ধান সরাসরি চলে যায় আড়তে। আড়তদার সেখান থেকে চালান করেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। দামের ক্ষেত্রে ফারাক দেখা যায় গ্রামে ও শহরে। কীর্তনখোলা পার হয়ে শহরে গেলেই সবজির দাম কেজিপ্রতি ৫-৭ টাকা বেড়ে যায়। কোনো এক মৌসুমে গ্রামের হাটে কেজিপ্রতি ৩ টাকায় বিক্রি হওয়া টমেটো সদর রোডে ১২ টাকায় বিক্রি হয়।

শুধু কৃষিভিত্তিক বাণিজ্য নয়, বরিশালে শিল্পভিত্তিক বাণিজ্যের বাজার রয়েছে। প্রথমেই ‘অপসোনিন’-এর নাম নিতে হয়। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ওষুধ কোম্পানিটির বর্তমান প্রডাক্ট সংখ্যা ৫৬ এবং তাদের প্রায় ১০ হাজার কর্মী রয়েছে। অপসোনিন বর্তমানে পণ্য বিক্রি হিসেবে

দেশের চতুর্থ বৃহত্তম ওষুধ প্রস্তুতকারক। আব্দুল খালেক খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুস সবুর খান। সদর দপ্তর ঢাকায় হলেও প্রতিষ্ঠানটির ফ্যাক্টরির তিনটি ইউনিট বরিশালে অবস্থিত। ‘অপসোনিন’ নামে পরিচিত গ্রুপটির একটি কনসার্ন হলো ‘অপসোনিন ফার্মা’। বাকিগুলো হলো অপসো স্যালাইন, গ্লোবাল ক্যাপসুল, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যাল ও জকি গার্মেন্টস লিমিটেড।

বরিশালের রূপাতলিতে রয়েছে খান সন্স গ্রুপের অলিম্পিক সিমেন্টের কারখানা। ১৯৯৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। খান সন্স গ্রুপের বিভিন্ন ব্যবসার মধ্যে সিমেন্ট উৎপাদন একটি। ২০১৫ সালের অলিম্পিক সিমেন্টের তৃতীয় ইউনিট বরিশালের দপদপিয়ায় উদ্বোধন করা হয়। অলিম্পিক সিমেন্টের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০ কোটি টাকা। খান সন্সের আরেকটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সোনারগাঁও টেক্সটাইলস। বরিশালের রূপাতলি এলাকায় ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ স্পিনিং মিলে প্রায় দুই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার ৭৫ কোটি ২২ লাখ ৭৬ হাজার ৯৬৭ টাকা। একই গ্রুপের আরেকটি প্রতিষ্ঠান খান সন্স টেক্সটাইলস লিমিটেড। বরিশালের কাউনিয়ায় ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা করে। বর্তমানে এখানে দেড় হাজারের মতো কর্মী রয়েছে। মাসিক টার্নওভার ১৫ কোটি ২৮ লাখ ২৪ হাজার ৪৩৯ টাকা। কাউনিয়াতেই খান সন্স জুটেক্স যাত্রা করে ২০০৬ সালে। এখানে উৎপাদিত পণ্য ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান, চীন প্রভৃতি দেশে রফতানি হয়। ২০০৯ সালে টার্নওভার ৮৭ দশমিক ৮৪ কোটি ও ২০১০ সালে ৯২ দশমিক ৫০ কোটি টাকা।

বরিশালের ইলিশের মোকাম, ব্যবসার আরেকটি বড় ক্ষেত্র। এ ব্যবসা শুধু বরিশালের মানুষেরই নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। এবং সেই মানুষের সঙ্গে বরিশালের মানুষকে যুক্ত করে ইলিশ। জেলা মত্স্য অফিসের মতে, বরিশালের প্রায় ৫০ হাজার জেলে ইলিশ মৌসুমে ইলিশ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। নৌকা, ট্রলার নিয়ে তারা ছড়িয়ে পড়েন নদীতে ও সাগরে। ইলিশ বলতে সবাই পদ্মার ইলিশের কথা স্মরণ করলেও বরিশালের কীর্তনখোলার ইলিশের অন্য রকম সুনাম রয়েছে। এখন অবশ্য নদীতে আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ে না। বেশির ভাগ ইলিশ ধরা হয় সমুদ্রের কাছ থেকে।

বরিশালের পোর্ট রোডে অবস্থিত বেসরকারি মত্স্য অবতরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, ইলিশের ভরা মৌসুমে প্রতিদিন হাজার মণের কাছাকাছি ইলিশ আসে মোকামগুলোয়। মোকাম থেকে ছড়িয়ে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এমনকি দেশের বাইরে। ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা। বরিশালের জেলা মত্স্য কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, ২০১৫-১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ইলিশ আহরণ বেশি, এমনকি ২০১৭ সালে রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বরিশালের মোকামে এ বছর আগস্টে প্রতিটি ৪০০-৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের মণ বিক্রি হয়েছে গড়ে ৩৫-৩৬ হাজার টাকায়। বহুকাল আগে থেকেই এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইলিশ ভূমিকা রেখে চলেছে।

এসবের বাইরে বরিশালের অভ্যন্তরে মিষ্টান্নের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। গৌরনদীর রসমালাই, শশী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, নিতাইয়ের মিষ্টি বরিশালের বিখ্যাত। শীতল পাটির জন্য সিলেট বিখ্যাত হলেও বরিশালের শীতল পাটির ঐতিহ্য রয়েছে। ঝালকাঠি, নলছিটি এলাকায় ‘পাইত্রা’ নামের গুল্ম কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে এ পাটি তৈরি হয়। গ্রামের মেয়েরাই প্রধানত পাটি তৈরি করে। বরিশালের বেলতলায় রয়েছে জাহাজ তৈরির ইয়ার্ড। ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো সাধারণত এখানেই তৈরি হয়। লঞ্চ ও বরিশাল নদীবন্দর বরিশালের ব্যবসা-বাণিজ্যের আরেকটি বড় ক্ষেত্র।

এককালে কাঠের কাজ ও নৌকা তৈরিতে বরিশালের কারিগরদের নামডাক ছিল। যদিও বর্তমানে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বরিশালে নদীর অস্তিত্ব বেশি, তবু প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং স্থলপথে যাতায়াতের দ্রুততা হেতু নৌকার কদর কমে গেছে। শিল্পীর হাটে নৌকা তৈরি হয় না বললেই চলে। নৌকায় পাল নেই, যুক্ত হয়েছে শ্যালো ইঞ্জিন। তবু কিছু কিছু নৌকা তৈরি হয়।

বরিশালের ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি চিত্তাকর্ষক বিষয় হচ্ছে ভাসমান হাট। একের পর এক নৌকা পাশাপাশি কিংবা এদিক সেদিক। নৌকায় নৌকায় পণ্যসম্ভার। কোনো নৌকা হয়তো খালি। নৌকা থেকে নৌকাতেই চলছে দরদাম, কোথাও পাইকারি, কোথাও খুচরা। এভাবেই চলে ভাসমান হাট। বরিশালের ভাসমান হাট বলতে মূলত ঝালকাঠি জেলার ভীমরুলিয়ার ভাসমান পেয়ারা বাজারের কথাই অনেকে জানেন। বরিশাল প্রচুর পেয়ারা উৎপাদন হয়। ঝালকাঠির ভীমরুলিয়ায় শুধু পেয়ারা বেচাকেনার জন্যই জমে ওঠে একটি ভাসমান বাজার। তবে শুধু এটি নয়, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, বরিশালের বানরীপাড়ায় এ রকম ভাসমান হাট জমে ওঠে। চাল-ডালের তুলনায় মৌসুমি সবজি ও বিভিন্ন ফল কেনাবেচাই বেশি হয় এসব হাটে।

 

লেখক: নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে তড়িৎ প্রকৌশলে অধ্যয়নরত 

আরও