বাংলাদেশের উপকূল ও দ্বীপগুলো মিলে জমির পরিমাণ ২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন হেক্টর। এর মধ্যে বিশিষ্ট মৃত্তিকাবিজ্ঞানী ড. পানাউল্লাহ্র (১৯৯৩) হিসাবমতে, এক মিলিয়ন হেক্টর বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। দেশের আটটি কৃষি অঞ্চলের ১৩টি উপকূলীয় জেলা এ এলাকার মধ্যে পড়ে। এর মধ্যে দশমিক ৬৫ মিলিয়ন হেক্টর পড়েছে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলায়। বাকি এলাকা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, লাকসাম, ফেনী ও চাঁদপুর জেলায়। আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লবণাক্ত এলাকা বাড়ছে। কিছুকাল আগের এক উপাত্ত অনুসারে জানা গেছে, লবণাক্ত এলাকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লবণাক্ততার পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। আশির পর থেকে দেশের সব এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা গড়ে ১৭২ শতাংশ বেড়ে গেছে। আগে যেসব জায়গায় লবণের তেমন সমস্যা ছিল না, এখন সেসব জায়গায় লবণাক্ততা বাড়তির হার ২০০-৪০০ শতাংশ। এ বাড়তির হার আশঙ্কাজনকই বলা যায়।
সময় ও জায়গাভেদে লবণাক্ততার ট্রেন্ড পরিবর্তন হয়ে থাকে। সাধারণ প্রবণতা হলো নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল অর্থাৎ মৌসুমি বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত লবণাক্ততা বাড়তে থাকে। পানি ও মাটিতে লবণের মাত্রা সবচেয়ে কমে যায় জুলাই-আগস্টে। ওপরের মাটির (০-১৫ সেমি) লবণাক্ততা সবচেয়ে বেশি। এর পর থেকে সরাসরি যত ভেতরে যাওয়া যায়, লবণাক্ততার পরিমাণ তত কমতে থাকে। বেশকিছু এলাকার মাটির বৈশিষ্ট্যায়নও ড. পানাউল্লাহ্র হাতে করা। তার মতে, লবণাক্ত সব মাটিই মিহি দানাসম্পন্ন। তবে অধিস্তরের মাটি ওপরের স্তর থেকে বেশি মিহি। এ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এসব মাটির পানির নিকাশক্ষমতা কম। ফলে বৃষ্টি হলে লবণ পানি ধুয়ে নিচে চলে যেতে পারে না। এসব এলাকার মাটি প্রধানত ক্ষারধর্মী (পিএইচ ৭.৪-৮.০)। তাই মাটিতে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি হতে পারে। খুলনা ও পাইকগাছার কিছু এলাকা ছাড়া অধিকাংশ এলাকার মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কম (১-১.৫%)। তবে খুলনা-বাগেরহাট এলাকার মাটিতে অন্যান্য এলাকার তুলনায় জৈব পদার্থের পরিমাণ কিছুটা বেশি। জৈব পদার্থ কম থাকলে মাটিতে ভৌত ও উর্বরাশক্তি সম্পর্কিত দুই ধরনের সমস্যাই দেখা যায়। অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম বুনট ও বেশি পরিমাণ জৈব পদার্থ থাকায় খুলনা ও বাগেরহাটের মাটির ক্যাটায়ন এক্সচেঞ্জ ক্যাপাসিটি অন্য এলাকার তুলনায় বেশি (২০-৪০ মিলি-ইকুইভ্যালেন্ট/১০০ গ্রাম)। মাটিতে জৈব পদার্থ কম থাকার অর্থ হলো, মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম (০.১%)। তবে এ মাটিতে গ্রহণযোগ্য ফসফরাসের পরিমাণ যথেষ্ট (ওলসেন ফসফরাস: ১৫-২৫ পিপিএম)। তবে জিংকের পরিমাণ সব মাটিতেই বেশ কম। মাত্র দশমিক ১ পিপিএম। নোয়াখালী ও ভোলা থেকে এ সমস্যা খুলনা-বাগেরহাটে বেশি। ম্যাঙ্গানিজের অভাবও কোথাও কোথাও আছে বলে মনে হয়। ক্ষারীয় মাটিতেই এ ধরনের সমস্যা হয়। লোহা ও তামার প্রাপ্যতা ভালো। পাশাপাশি বোরনও বেশি বলে মনে হয়। এ কারণে বোরনের বিষক্রিয়া হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
উপকূলীয় এলাকার বেশির ভাগ জায়গাজুড়ে সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত দীেশ আমন ধান আবাদ হয়ে আসছে। তবে এখানেও বিভিন্ন ধরনের শস্যক্রম দেখা যায়। ড. নূর মোহাম্মদ মিঞা ও তার সহযোগীদের (১৯৯৩) মতে, উপকূলীয় এলাকার অন্যতম শস্যক্রম হলো পতিত (অর্থাৎ কোনো ফসল আবাদ হয় না বা করা যায় না কিংবা উপযোগী ফসলের অভাব)— দেশী রোপা আমন পতিত। রোপা আমনের পর শীতে জমি পতিত থাকে। তারপর পুরো গরমকাল জমিতে কিছু হয় না। একইভাবে আরো কিছু শস্যক্রম হলো পতিত দেশী রোপা আমন-মরিচ/মিষ্টিআলু/মুগ/খেসারি (রিলেক্রপ হিসেবে অর্থাৎ আমনে ফুল বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নরম জমিতে বুনে দেয়া হয়)/ ছোলা, বরবটি/তিল/চীনাবাদাম। সুযোগ ও জায়গা বুঝে এগুলোর যেকোনো একটি আবাদ করা হয়। তারপর আছে দেশী রোপা আউশ-দেশী রোপা আমন-খেসারি (রিলে)/মুগ/সরিষা। আরেকটি হলো বোনা আউশ-বোনা আমন মিশ্র চাষ-খেসারি (রিলে) ও পতিত। তাদের হিসাব অনুযায়ী উপকূলীয় এলাকার বেশির ভাগ জায়গাজুড়ে দেশী রোপা আমন প্রধান ও একমাত্র ফসল হিসেবে আবাদ হয়। আউশ ও রবি ফসল নির্দিষ্ট কিছু উপকূলীয় জেলায় সীমাবদ্ধ। দেশী রোপা আমন পতিত খুলনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী এলাকার অন্যতম শস্যক্রম। নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম এলাকায় দেশী ও আধুনিক আউশ ধান প্রায় ২৫ শতাংশ জায়গাজুড়ে আবাদ হয়।
স্থানীয় রোপা আমন পতিত শস্যক্রম এলাকার সামান্য কিছু জায়গায় রবিশস্যের আবাদ হয়। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী এলাকার উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে খরিফ-২ মৌসুমে ব্যাপকভাবে আধুনিক জাতের ধানের চাষ দেখা যায়।
লবণাক্ততার প্রকৃতিভেদে ফসল ব্যবস্থাপনা
সার্ক কৃষিকেন্দ্র বর্ণিত উপকূলীয় জেলাগুলোর একটি চিত্র এখানে বর্ণনা করা হলো। এখানে লবণাক্ততার প্রকৃতিভেদে মাটিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মিষ্টি থেকে সামান্য লবণাক্ত এলাকা এ প্রথম ক্যাটাগরিতে পড়ে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, যশোর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল (২৭ শতাংশ = ৪ লাখ ২৫ হাজার ৪৯০ হেক্টর) এ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। ক্যাটাগরি-২ বলতে খুবই কম থেকে কিছুটা লবণাক্ত এলাকাকে বোঝানো হয়েছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, যশোর, মাদারীপুর, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ৪ লাখ ২০ হাজার ৪২০ হেক্টর জমি এ ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে। ক্যাটাগরি-১ ও ক্যাটাগরি-২ এলাকায় রবি ফসল হিসেবে মুগ কলাই, মসুর, খেসারি, ছোলা, ফেলন, সরিষা, তিসি, সূর্যমুখী, মরিচ, গম, মিষ্টিআলু, কচু, তরমুজ, শাক-সবজি, স্থানীয় ও কিছু উফশী বোরো ধান আবাদ করা হয়। জায়গাবিশেষে আখ ও কলা আবাদের প্রচলন আছে। ইদানীং লবণক্ততাসহিষ্ণু আখের জাত (আইএসডি-৩৯ ও আইএসডি-৪০) ও পাটের জাত বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। প্রধানত পিটবেসিন এলাকায় ধানের সঙ্গে গলদা চিংড়ি চাষের প্রবণতা আছে। রবি ফসল ছাড়া রোপা আমন, বোনা আমন, বোনা আউশ, জলি আমন, তিল ও পাটের আবাদও দেখা যায়। কিছুটা লবণাক্ততা থেকে মোটামুটি লবণাক্ত জমির পরিমাণ ২ লাখ ৪০ হাজার ২২০ হেক্টর। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ৯৩ শতাংশ জমি ক্যাটাগরি-৩-এর আওতায় পড়ে। এসব অঞ্চলে রবি মৌসুমে মুগ, খেসারি, ফেলন, সরিষা, তিল, তরমুজ, মরিচ, গম, মিষ্টিআলু, সূর্যমুখী, কচু ও রবি মৌসুমের উপযোগী শাক-সবজির আবাদ হয়। মাঝারি থেকে কড়া লবণাক্ত এলাকা ক্যাটাগরি-৪-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী, ফেনী ও কক্সবাজার জেলার কিছু কিছু জায়গা কড়া লবণাক্ত এলাকার মধ্যে পড়ে। এ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত জমির পরিমাণ ১ লাখর ৯৮ হাজার ৮৯০ হেক্টর। রবিশস্যের মধ্যে সরিষা, তরমুজ, ফেলন, মরিচ, মিষ্টি কুমড়া, সূর্যমুখী এবং খুবই সীমিত পরিমাণে উফশী ও স্থানীয় জাতের বোরো ধানের চাষ হয়। কিছু এলাকায় লোনা পানির চিংড়ি চাষের পর উচ্চফলনশীল বা স্থানীয় জাতের আমন ধানের চাষ হয়। এসব এলাকার ক্রপিং ইনটেনসিটি অন্যান্য লবণাক্ত এলাকার চেয়ে কম। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী, ফেনী ও কক্সবাজার জেলার কিছু কিছু জায়গা খুবই লবণাক্ত (চরম লবণাক্ত) এলাকার মধ্যে পড়ে। সুন্দরবন ছাড়া এ এলাকাগুলোয় অন্তর্ভুক্ত জমির পরিমাণ ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮০ হেক্টর। এসব এলাকাকে ক্যাটাগরি-৫-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাটি ও পানির অতিরিক্ত লবণমাত্রার কারণে এসব এলাকায় রবিশস্যের আবাদ একেবারে নেই বললেই চলে। তবে কিছু কিছু এলাকায় সরিষা, তরমুজ, মরিচ, মিষ্টিআলু, সূর্যমুখী ফসলের আবাদ হয়ে থাকে। পাশাপাশি সামান্য কিছু উচ্চফলনশীল ও স্থানীয় জাতের বোরো ফসলের চাষ হয়। লোনা পানির বাগদা চিংড়ির চাষ এলাকার একটি আকর্ষণীয় ফসল। এর পরই উচ্চফলনশীল ও স্থানীয় জাতের রোপা আমন আবাদ হয়ে থাকে বেশকিছু এলাকাব্যাপী।
দক্ষিণাঞ্চল ও লবণাক্ত এলাকার জন্য কিছু অভিযোজন উপযোগী ফসল প্রযুক্তি
আমন মৌসুমে লবণাক্ততা সহনশীল বিআর ২৩ (মাঝারি থেকে মাঝারি নিচু জমির জন্য), ব্রিধান ৪০, ব্রিধান ৪১, ব্রিধান ৫৩, ব্রিধান ৫৪ (উঁচু থেকে মাঝারি উঁচু জমির জন্য) এবং বোরো মৌসুমে ব্রিধান ৪৭, ব্রিধান ৬১ ও ব্রিধান ৬৭ নির্বাচন করা যেতে পারে। বাংলাদেশ আণবিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিনাধান ৮ ও বিনাধান ১০ নামে দুটো লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধানের জাত বোরো মৌসুমে অবমুক্ত করা হয়েছে। জাত দুটো আমনেও ভালো করে বলে বিনার দাবি।
লবণবিহীন জোয়ার-ভাটা এলাকার জন্য ব্রিধান ৭৬ ও ব্রিধান ৭৭ উপযোগী জাত। জাত দুটি সাদামোটা ও দুধকলমের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর চারা স্থানীয় জাতের মতো লম্বা হয় এবং চাল মোটা, যা স্থানীয় মানুষের পছন্দ। ব্রিধান ৭৮ বলে আরেকটি জাত ব্রি থেকে অবমুক্ত করা হয়েছে। জাতটি একই সঙ্গে লবণাক্ততা ও জলমগ্নতাসহিষ্ণু।
চারা অবস্থায় দ্রুতবর্ধনশীল উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন না হওয়া পর্যন্ত সাদামোটা, কালোমোটা, পাটনাই, নোনাখচ্চি জাতগুলো আবাদ করা যেতে পারে। মাছের সঙ্গে মিশ্র চাষও সম্ভব। অবশ্য এরই মধ্যে জোয়ার-ভাটা এলাকার জন্য দুটো ধানের জাত (ব্রিধান ৭৬ ও ব্রিধান ৭৭) অবমুক্ত করা হয়েছে।
রোপা আমন-পতিত-পতিত শস্য বিন্যাসে রোপা আমনের সঙ্গে রিলেক্রপ হিসেবে বারি সরিষা-১১ এবং রোপা আমন-বোরো শস্য বিন্যাসে বারি সরিষা-৯ আবাদ করা যায়।
রোপা আমনের পর সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় প্যাসিফিক ১১ ও কুয়াকাটা এলাকায় বারি হাইব্রিড ভুট্টা ভালো করে।
উপকূলীয় এলাকায় জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত মুগডাল বোনা সম্ভব। খুলনার দাকোপে বারি তিল-৪ হয়।
রোপা আমনের পর সাইক্লোনপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় প্যাসিফিক হাইব্রিড ভুট্টা-৬০ ও প্যাসিফিক-১১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫ ভালো করে।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত তিল বোনা যায়।
বিএইচএল জাতের বার্লি উপকূলীয় লবণাক্ত মাটির জন্য উপযোগী।
বারি সোয়াবিন-৫ উপকূলীয় এলাকার জন্য সম্ভাবনাময়।
টমেটো, বাঁধাকপি, মিষ্টি কুমড়া উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জন্য উপযোগী ফসল।
উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা ম্যানেজমেন্ট কৌশল
আমন-পতিত শস্যক্রমে কভার-ক্রপ হিসেবে ধৈঞ্চা চাষ করলে শুকনো মৌসুমে বাষ্পীভবনজনিত লবণের ক্যাপিলারি রাইজ (মাটির সূক্ষ্ম রন্ধ্র দিয়ে পানি উঠে আসা) কমে যায়। ফলে মাটির উপরিভাগের লবণাক্ততা বাড়তে পারে না।
নদী বরাবর উঁচু ও চওড়া করে বাঁধ দিলে নদীতে লবণ পানি ঢুকতে পারে না। পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় ভরা জোয়ারের সময় পানি যে লেভেলে উঠে আসে, তার চেয়ে উঁচু করে বাঁধ দিতে পারলে ভালো।
বাঁধের ওপর নির্দিষ্ট দূরত্বে স্লুইস গেট রাখলে পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি ফাল্গুন-চৈত্রে জমির ওপর যে লবণ জমে, তা বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ধুয়ে ফেলার কাজে ব্যবহার করা যায়।
উঁচু-নিচু জমিতে ক্যাপিলারি রাইজের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় লবণ জমে। ফলে ফসলের ক্ষতি হয়ে থাকে। মই দিয়ে সমতল করে রাখলে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় লবণ জমতে পারে না।
বর্ষাকালে খাল, মরা নদী, পুকুর-ডোবা, প্রাকৃতিক জলাশয়ে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির পানি আটকানোর ব্যবস্থা করে খরাজনিত লবণাক্ততা মোকাবেলা করা যায়।
রবি মৌসুমে যেসব মাটির লবণাক্ততার মাত্রা ২.০-৪.০ ডেসিসিমেন/মিটারের মধ্যে, সেখানে সঠিকভাবে লবণ ও পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লবণসহিষ্ণু ধানের চাষ করা যায়। তবে এখানে জমিতে সবসময় পনি ধরে রাখতে হবে।
গ্রীষ্মকালে পতিত জমিতে চাষ দিয়ে রাখলে বড় বড় ফাটল তৈরি হতে পারে না। ফলে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে মাটির ওপরে লবণের আস্তরণ পড়তে পারবে না। এক্ষেত্রে লবণসহিষ্ণু ধৈঞ্চা, তিল ইত্যাদি কভার-ক্রপ হিসেবে চাষ করা যেতে পারে।
নিচু জমিতে পাগাড়/পগার পদ্ধতি (ইন্দোনেশীয় সরজান পদ্ধতি) অবলম্বন করে বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন ফসলের চাষ করা যায়।
কালচারাল ম্যানেজমেন্ট কৌশল
উপকূল এলাকায় দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় আবহাওয়া কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় বিভিন্ন ফসলের অনুমোদিত বপন/রোপণ সময়ে কিছুটা পরিবর্তন আনা দরকার। এ অঞ্চলে শীতকাল সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এবং শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে। ফলে নভেম্বরের মধ্যে বোরো ধানের চারা তৈরি করে ডিসেম্বরের মধ্যে রোপণ করলে এপ্রিল-মের উচ্চলবণাক্ততাজনিত ফসলহানি এড়ানো যায়।
ধানের নাড়া বা খড়ের মালচিং করে রবি ও খরিফ-১ মৌসুমে টমেটো, আলু, মিষ্টি কুমড়া, তরমুজ, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, মরিচ ইত্যাদি চাষ করা যায়। মালচিংয়ের কারণে বাষ্পীভবন কম হওয়ায় লবণ ওপরে উঠে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
মাটি ধুয়ে দিতে পারলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। ব্রির এক পরীক্ষা (ইসলাম ও সহযোগীরা, ১৯৯৩) মারফত জানা গেছে, চারবার মাটি ধুয়ে দিলে (সয়েল-ফ্লাসিং) লবণের মাত্রা ৪ দশমিক ৬৮ ডেসিসিমেন/মিটার থেকে কমে দশমিক ৪৯-এ গিয়ে দাঁড়ায়। বোরো ধানের বেলায় দু-একবার, বিশেষ করে প্রজনন পর্যায়ে সয়েল-ফ্লাসিং করতে পারলে ফসলহানির আশঙ্কা কমে যায়।
সমন্বিত জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার লবণাক্ত অঞ্চলে যেকোনো ফসল উৎপাদনের জন্য বেশ কার্যকর।
ডিবলিং পদ্ধতিতে আউশ ধানের চাষ করলে লবণাক্ত এলাকায় ফসল প্রতিষ্ঠা ভালো হয়।
রেইজ অ্যান্ড স্লোপিং বেড পদ্ধতিতে সারা বছর এসব এলাকার সুবিধামতো জমিতে সবজি ও মসলা চাষ করা যায়। তবে মালচিং করার দরকার আছে।
মাদা করে তার মধ্যে তরমুজ, মিষ্টি কুমড়া, শসা, করলা ইত্যাদি সবজির চাষ করা যায়। মাদায় যথারীতি জৈব ও অজৈব সার দেয়া ও মালচিংয়ের দরকার আছে।
ধান চাষের সময় এসব জমিতে হেক্টরপ্রতি পাঁচ টন গোবর, ধৈঞ্চা বা ছাই পচা আবর্জনা দেয়া যেতে বারে। মুরগির বিষ্ঠা থাকলে শুকনো বিষ্ঠা হেক্টরপ্রতি দেড় টন হারে প্রয়োগ করা যায়।
সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল তথা উপকূলীয় এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মাছের আবাদসহ সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এ-জাতীয় বিভিন্ন কার্যক্রম চালু আছে। তার পরও এখনো অনেক কিছু করার আছে। এজন্য লবণাক্ততাসহিষ্ণু বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন, নির্বাচন, সম্প্রসারণ, যথাযথ শস্য বিন্যাস প্রবর্তন, প্রায়োগিক ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লবণাক্ত ভূমি চাষের উপযোগীকরণ, এলাকা উপযোগী আবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রচলন, এলাকাভেদে আউশ ধানের প্রচলন, পতিত জমি আবাদের আওতাভুক্ত করা, ভাসমান কৃষিপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন, এলাকাভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা প্রচলন, পানি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরিকল্পনামাফিক ভাবনাচিন্তা করার দরকার আছে।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর