শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতেই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। এ সরকারের কাছে কেমন বাজেট চান?
এ সরকারের উচিত শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও চাহিদাকে প্রতিফলিত করে এমন একটি বাজেট প্রণয়ন করা, যা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও ভবিষ্যৎমুখী। আমরা চাই বাজেটে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সুস্পষ্ট বরাদ্দ থাকুক। বেসরকারি শিক্ষা খাতকে অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কর ছাড়, গবেষণা ভর্তুকি ও প্রযুক্তি ব্যবস্থায় সমান সহায়তা প্রদান করা হোক। একটি আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে এটি হবে একটি বাস্তবিক পদক্ষেপ। সেই সঙ্গে বাজেট প্রণয়নে স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি—যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তবিক উন্নয়নের সুফল পায়।
শিক্ষা খাতের জন্য বাজেটে বিশেষ কী প্রত্যাশা করছেন?
বাজেটে আমরা চাই একটি এডুকেশন ট্রান্সফরমেশন প্যাকেজ, যেখানে থাকবে উন্নত পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো ও গবেষণার জন্য তহবিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি পৃথক বাজেট কোড থাকা উচিত, যাতে তারা সরকারি প্রকল্পের সহায়তা পেতে পারে এবং জাতীয় লক্ষ্য পূরণে বেশি অবদান রাখতে পারে। এছাড়া অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষার জন্য ডিজিটাল অ্যাকসেস ফান্ড তৈরি করা দরকার, যাতে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষা পায়। শিক্ষা খাতে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব মডেলকে উৎসাহিত করলে আরো টেকসই অগ্রগতি সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে বাজেটের অপ্রতুলতার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়নকে বাজেট সংকট কতটা প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন?
বাজেট সংকট শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার সক্ষমতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ বিকাশে একটি বড় অন্তরায়। অনুদার শিক্ষা উদ্যোক্তাবান্ধব নয়। এমন আইনের কারণে বেসরকারি খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা যেমন আছে তেমনি সরকারি ন্যূনতম সহায়তার অভাব রয়েছে। এ ঘাটতি শুধু শিক্ষা খাতকে নয়, সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সার্বিকভাবে বাজেট ঘাটতি আমাদের তরুণদের বৈশ্বিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত হতে বাধা দিচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিগত এক দশকে দেশের শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে কোন পদক্ষেপগুলো জরুরি?
অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা মানের উন্নয়ন হয়েছে, তবে আশানুরূপ হয়নি। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) কার্যকর করা। শুধু অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন শিক্ষকের গুণগত প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পাঠ্যক্রম হালনাগাদকরণ এবং ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়া পার্টনারশিপের বিকাশ। শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়াতে পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা, গবেষণা পদ্ধতি ও কমিউনিটি সার্ভিস অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এছাড়া জাতীয়ভাবে মান নির্ধারণ ও মূল্যায়নের স্বাধীন অথচ স্বচ্ছ একটি মডেল তৈরি করা জরুরি। আমাদের প্রয়োজন শিক্ষাকে পরীক্ষানির্ভরতা থেকে জ্ঞান, দক্ষতা ও বাস্তব জীবনের প্রস্তুতির দিকে সরিয়ে নেয়া, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি সমৃদ্ধ জ্ঞানসমাজ তৈরি করবে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা বরাদ্দ কেমন হওয়া উচিত?
গবেষণার জন্য জাতীয় বাজেটে মোট শিক্ষা বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা বরাদ্দ হতে হবে দ্বৈত স্তরে—প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বরাদ্দ ও প্রতিযোগিতামূলক অনুদান। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে উৎসাহিত করতে বিশেষ ম্যাচিং গ্রান্ট চালু করা যেতে পারে। গবেষণা তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন, যাতে ফলিত গবেষণার মা ধ্যমে আমাদের শিল্প, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতেও প্রভাব ফেলা যায়। এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে কর অবকাশ, স্কলারশিপ ও ফান্ডিং মেকানিজমকে উদার ও যুগোপযোগী করতে হবে।
দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ বেকারত্ব দূর করতে কী করা দরকার?
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এর সমাধানে সর্বাগ্রে প্রয়োজন চাহিদানির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কর্মমুখী কোর্স, ট্রেনিং প্রোগ্রাম ও ইনকিউবেশন সেন্টার চালু করে শিক্ষার্থীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়াবিলিটি ইনডেক্স তৈরি করে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে। তরুণদের জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও স্টার্টআপ তহবিল বাড়ালে তারা আরো উদ্ভাবনী হতে পারবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবে।