চার দশকের বেশি সময় আগে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মাত্র ২৫০ নারী কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংওয়ান করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক উৎপাদন ভিত্তির সবচেয়ে বড় অংশই বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত। কোম্পানির ২০২৬ সালের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চট্টগ্রাম ও ঢাকাকেন্দ্রিক উৎপাদন তাদের মোট বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ। ভিয়েতনামে রয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ভারত, ইথিওপিয়া, এল সালভাদর ও উজবেকিস্তান মিলিয়ে বাকি প্রায় ১০ শতাংশ।
বাংলাদেশে ইয়াংওয়ানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। চট্টগ্রামে প্রথম কারখানা স্থাপনের পর ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে নতুন কারখানা গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পর ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রামে কোরিয়ান রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা কেপিইজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। কোম্পানির ইতিহাসে বাংলাদেশকে তাদের আন্তর্জাতিক উৎপাদন সম্প্রসারণের প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সেই উৎপাদন ভিত্তি সময়ের সঙ্গে শুধু পোশাক কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কেপিইজেডে পোশাক ও বস্ত্রের পাশাপাশি জুতা, ব্যাগ এবং অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে উঠেছে। ইয়াংওয়ানের বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামোয় বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ভারত, ইথিওপিয়া, এল সালভাদর ও উজবেকিস্তানে উৎপাদন কার্যক্রম রয়েছে। কোম্পানির মোট বৈশ্বিক কর্মীসংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি এবং উৎপাদনস্থল রয়েছে ১০টির বেশি।
বাংলাদেশে এ উপস্থিতির অর্থনৈতিক ব্যাপ্তিও বড়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াংওয়ান দেশে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ৩০ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে কোরীয় বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইয়াংওয়ানের প্রেসিডেন্ট মিন-সুক লি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির চার দশকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব শিল্প অবকাঠামোয়ও বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ করেছে ইয়াংওয়ান। কোম্পানির ২০২৬ সালের তথ্যে বলা হয়েছে, কেপিইজেডে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন করা হয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় বৈশ্বিক উৎপাদনস্থলগুলোয় সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা আরো বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশে ইয়াংওয়ানের এ বিস্তার দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত। ঢাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের সবচেয়ে সফল ক্ষেত্রগুলোর একটি রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাত। দূতাবাসের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় বাংলাদেশের দক্ষিণ কোরিয়ায় রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি ছিল তৈরি পোশাক। একই সময়ে কোরীয় বিনিয়োগের ৭০ শতাংশের বেশি ছিল পোশাক খাতে।
কোরীয় দূতাবাসের সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও বাংলাদেশে ইয়াংওয়ানের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত ঢাকার রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ইয়াংওয়ান ও ইউপুংয়ের কারখানা পরিদর্শন করেন এবং মজুরি, শ্রম অধিকার, উৎপাদনশীলতা ও মূল্যস্ফীতিসহ ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
তবে ইয়াংওয়ানের বাংলাদেশকেন্দ্রিক উৎপাদন কেবল অতীতের বিনিয়োগের গল্প নয়। ২০২৬ সালে কোম্পানির বাংলাদেশ উৎপাদন কেন্দ্রে স্থানীয় কর্মীদের নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচির চতুর্থ ধাপ শুরু হয়েছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির আগের তিন ধাপে ২৭৭ জন কর্মী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
চার দশক আগে ২৫০ কর্মী নিয়ে শুরু হওয়া সে কারখানা থেকে আজকের বৈশ্বিক উৎপাদন কাঠামোয় ৬০ শতাংশের ভিত্তি হয়ে ওঠা বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু একটি বিদেশী বিনিয়োগের সাফল্য নয়। এটি দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগ, রফতানিমুখী উৎপাদন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ কীভাবে একটি দেশকে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন মানচিত্রের কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করতে পারে।