চীন বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে একটি প্রধান আর্থিক অবদানকারী, যার মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে ডিজিটাল সংযোগ। বেইজিং বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধাও প্রদান করে।
বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন অংশীদার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান বিদেশী বিনিয়োগকারী হলো চীন, যা জ্বালানি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশকে তার স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) অবস্থা থেকে মসৃণভাবে উত্তরণে সহায়তা করতে চীন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ শক্তি এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে সম্পর্ককে একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে উন্নীত করা হয়েছে। বাংলাদেশ চীন থেকে রফতানির চেয়ে প্রায় ২৬ গুণ বেশি পণ্য আমদানি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীনে প্রায় ৬৯৪ মিলিয়ন ডলার রফতানি করেছে, অন্যদিকে আমদানি প্রায় ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করছে, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের অন্যতম বিপণনকারী গ্রুপ ইলেক্ট্রো মার্ট বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস কনকা ও গ্রী-এর চায়নার সঙ্গে প্রযুক্তি শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। গ্রুপটির শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামালের একটি বৃহৎ অংশ চায়না থেকে সংগ্রহ করছে।
বাংলাদেশ ও চায়নার সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে অনেক বিস্মৃত হয়েছে, এটি এখন শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ বা উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও শিল্প সহযোগিতা এখন এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমার বিশ্বাস, আগামী দিনে বাংলাদেশ-চায়নার সম্পর্ক হবে বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সর্ম্পকের সর্ববৃহৎ অংশ।
চীন বাংলাদেশকে যেভাবে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করছে, আগামীতে এ সম্পর্ক একটি দৃঢ় আঞ্চলিক সম্পর্কের পথ উন্মোচন করবে। চীন বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করছে। এর মাধ্যমে চীনে রফতানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, অর্থনৈতিক এবং উন্নয়ন সহায়তানির্ভর সম্পর্ক আগামীতে একটি শক্তিশালী সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করবে।
ছবি: ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপ
ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের সঙ্গে চায়নার বাণিজ্য সম্পর্কের সূচনা আশির দশক থেকে। তখনকার সময়ে বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যে জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের পণ্য বেশ পরিচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুন নেওয়াজ সেলিম বাংলাদেশে চায়নার ইলেকট্রনিক পণ্যগুলো আমদানি করতে শুরু করেন। প্রথম দিকে কয়েক লাখ টাকা নিয়ে ট্রেডিং ব্যবসা শুরু করেন উদ্যোক্তা নুরুন নেওয়াজ সেলিম। পরবর্তী সময়ে তার যোগ্য নেতৃত্বে তার সহোদর তিন ভাই মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ নুরুচ্ছাফা মজুমদার এবং মো. নূরুল আফছারের সহযোগিতা ও পরিচালনায় ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপ এখন প্রায় সাত হাজার লোকের কর্মসংস্থানকারী একটি বৃহৎ ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে চাইনিজ ইলেকট্রনিক পণ্যকে গ্রাহকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি ও আস্থায় আনতে সক্ষম হই। ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে চায়না ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারজাত করতে আমাদের বেশ কঠিন সময় পার করতে হয়। কারণ চায়না ব্র্যান্ডের প্রতি গ্রাহকদের একটি বিরূপ ধারণা ছিল। গ্রাহকদের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে আমাদের এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। আমাদের এ পথচলায় গ্রাহক, শুভানুধ্যায়ী, পার্টনার, ডিলারসহ অনেকে সহযোগিতা করছেন যাদের অবদান আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি এবং সবসময় আমরা তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। পণ্যের মান উন্নয়নসহ দেশের পরিবেশ এবং গ্রাহকদের চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পণ্য সরবরাহ করায় গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত আমাদের ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা রেখেছেন। ফলে কনকা, গ্রী ও হাইকো ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক পণ্য বর্তমানে শহর, উপশহর ও গ্রামগঞ্জের প্রতিটি ঘরে ঘরে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক পণ্য চাহিদার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদন হয়ে থাকে। যার সিংহভাগ যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের জোগানদার চীন। অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চীন থেকে নিরাপদ, মানসম্মত ও টেকসই কাঁচামাল সংগ্রহ করছে। যার ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি শিল্প খাতের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ চীন সরবরাহ করছে, যা শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এর মধ্য দিয়ে শুধু কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি হচ্ছে না; প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গেও বাংলাদেশের শিল্প খাতের একটি সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি আমদানিতেও দুই দেশের বাণিজ্য আরো সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে হলে কিছু বাধা দূর করতে হবে। কাস্টমস শুল্কায়ন কার্যক্রম সহজীকরণসহ সব সরকারের সব পর্যায়ে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনের খরচ কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ করা গেলে দুই দেশের বাণিজ্য অনেক বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যস্বত্বভোগী ব্যয় কমবে, সরাসরি সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হবে। ফলে দুই দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো গভীর হবে।
আমার বিশ্বাস, আগামী দিনের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক হবে আরো গভীর, বহুমাত্রিক ও পারস্পরিক লাভজনক। শুধু বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, টেকসই কৃষি, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের আধুনিকায়নেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।