আমদানিনির্ভরতা থেকে উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতার দিকে উত্তরণের পথ

অধ্যাপক ড. মো. রাকিবুল হক

পরিচালক, সেন্টার ফর চায়না স্টাডিজ; চেয়ারম্যান, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

২০১০ সাল থেকে টানা ১৬ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু এ দীর্ঘ সম্পর্কের ভেতরে যে চিত্রটি লুকিয়ে আছে, তা মোটেই ভারসাম্যপূর্ণ নয়।

জাতিসংঘের কমট্রেড উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন থেকে বাংলাদেশে পণ্য রফতানি হয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, বিপরীতে একই বছরে বাংলাদেশ থেকে চীনে পণ্য রফতানি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারের। এ গভীর বাণিজ্য অসমতা বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘ট্রেড গ্যাপ’ কমানোর প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এ আমদানিনির্ভরতার ধরন লক্ষ করলে বোঝা যায়, চীন থেকে যা আসছে তার সিংহভাগই বাংলাদেশের শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি। কমট্রেডের হিসাবে ২০২৪ সালে চীন থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম (২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার), তুলা (২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার), যন্ত্রপাতি (২ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার), নিটেড ফ্যাব্রিক (১ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম তন্তু (১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম ফিলামেন্ট (১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার), জ্বালানি তেল (১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার), প্লাস্টিক (১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার) এবং লোহা-ইস্পাত (৬৪৬ মিলিয়ন ডলার)। অর্থাৎ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বেশির ভাগ কাঁচামাল, শিল্প যন্ত্র ও ভোগ্যপণ্য আসছে চীন থেকে, যা দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে।

বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে চীনে যা যাচ্ছে, তার পরিমাণ ও বৈচিত্র্য দুটোই সীমিত। ২০২৩ সালে চীনে বাংলাদেশের রফতানির প্রধান খাত ছিল নিট ও নন-নিট পোশাক (প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার), উদ্ভিজ্জ টেক্সটাইল তন্তু, মাছ ও চিংড়ি জাতীয় পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং তুলা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হিসাবেও দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে চীন থেকে, অথচ রফতানির ক্ষেত্রে দেশটির অংশ ছিল নগণ্য। এ অসামঞ্জস্য থেকেই স্পষ্ট, বাংলাদেশ এখনো মূলত চীনা পণ্যের বাজার হিসেবে কাজ করছে, উৎপাদন-অংশীদার হিসেবে নয়।

সুযোগের দরজা একেবারে বন্ধ নয়। চীন সরকার ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছিল, আর ২০২৫ সালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শতভাগ পণ্যই এখন চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। এমনকি স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের পরও ২০২৮ সাল পর্যন্ত এ শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকগুলোতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এত বড় শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে পারছে না-কারণ রফতানিযোগ্য বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরির সক্ষমতাই এখনো গড়ে ওঠেনি।

বিনিয়োগের দিক থেকে চীনের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণা তথ্য বলছে, চীন থেকে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) ২০১৫ সালের ৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৪১ কোটি ডলারের ঘরে পৌঁছেছে, আর চীনের প্রতিশ্রুত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার—দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পরই যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সাম্প্রতিক মোংলা বন্দর উন্নয়ন, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল স্থাপন এবং কারিগরি সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ২১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতিও এসেছে। এসব বিনিয়োগ যদি প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনমুখী খাতে যায়, বিশেষ করে চীন থেকে স্থানান্তরিত কারখানার মাধ্যমে, তাহলে তা বাংলাদেশের রফতানি-উৎপাদন ভিত্তি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র হয়ে ওঠার। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু চীনা পণ্যের আমদানিনির্ভর বাজার হয়ে থাকলে চলবে না; বরং চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য, ওষুধশিল্প ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের মতো খাতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলে, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের বর্তমান চিত্র একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—সম্পর্কের গভীরতা যতটা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে দৃশ্যমান, বাণিজ্যিক ভারসাম্যে ততটা প্রতিফলিত নয়। শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, ক্রমবর্ধমান চীনা বিনিয়োগ আগ্রহ এবং আঞ্চলিক সংযোগে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান—এ তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলেই কেবল বাংলাদেশ আমদানিনির্ভরতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে প্রকৃত উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতার পথে এগোতে পারবে।

তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ কমট্রেড ডেটাবেজ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বাংলাদেশ ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট গবেষণা উপাত্ত ও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি বিবৃতি

আরও