তুলা উৎপাদনের সক্ষমতা সীমিত হলেও সুতা উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। স্থানীয়ভাবে এখন তুলাভিত্তিক সুতা, বিশেষায়িত সুতা ও মিশ্র সুতা উৎপাদন হচ্ছে। ডেনিমের মতো কিছু কাপড়েও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। নিট কাপড়ের বড় অংশও দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে সুতার পরের ধাপে অর্থাৎ সুতা থেকে কাপড় তৈরিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা একই গতিতে বাড়েনি। বিশেষ করে উন্নতমানের বোনা কাপড়, বিশেষ ফিনিশিং এবং মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক কাপড়ের ক্ষেত্রে ঘাটতি এখনো বড়। এ কারণে দেশের পোশাক কারখানাগুলোকে প্রয়োজনীয় কাপড়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আর এ আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস চীন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পণ্য আমদানি পরিশোধের তথ্যও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখায়। ৮৫ শতাংশ বা তার বেশি তুলা থাকা হালকা বোনা কাপড় আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যয় করেছে প্রায় ৭০ কোটি ডলার। এর মধ্যে চীন থেকেই এসেছে প্রায় ৫৩ কোটি ডলারের কাপড়। ভারী বোনা তুলার কাপড় আমদানিতেও চীন ছিল অন্যতম প্রধান উৎস। এ শ্রেণীতে প্রায় ১৩১ কোটি ডলারের আমদানির মধ্যে চীন থেকে এসেছে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের কাপড়। নিট ও ক্রোশে কাপড় আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৯২ কোটি ডলার, যার প্রায় ১৬৬ কোটি ডলারের সরবরাহ এসেছে চীন থেকে।
তবে এ পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প সব ধরনের কাপড়ের জন্য চীনের ওপর সমানভাবে নির্ভরশীল। বরং উদ্যোক্তাদের বক্তব্য বলছে, স্থানীয় সক্ষমতা যেখানে তৈরি হয়েছে সেখানে চীন থেকে আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। অন্যদিকে যেসব কাপড়ে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা কম কিংবা দাম, মান, বিশেষ ফিনিশিং ও সরবরাহের সময়ের দিক থেকে দেশীয় মিল প্রতিযোগিতা করতে পারছে না, সেখানেই চীনের ওপর নির্ভরতা বেশি।
চিটাগং এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুস সালামের মতে, বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পের বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে পোশাকের পেছনে থাকা পুরো উৎপাদন শৃঙ্খল দেখতে হবে। তার পর্যবেক্ষণ, কাপড়ের পেছনে রয়েছে সুতা, আর সুতার পেছনে তুলা। বাংলাদেশের নিজস্ব তুলা উৎপাদনের সুযোগ সীমিত। দেশ ছোট এবং তুলা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় জমির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আমদানি করা তুলাকে দেশে সুতা ও পরবর্তী পর্যায়ের পণ্যে রূপান্তর করাই বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ।
এ জায়গায় গত ১৫ বছরে বড় অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে তুলাভিত্তিক সুতা উৎপাদনে বাংলাদেশ ভালো সক্ষমতা তৈরি করেছে। বিশেষায়িত সুতা ও মিশ্র সুতাও এখন দেশে পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু সুতার পরের ধাপেই সমস্যা। আব্দুস সালামের মতে, গত এক দশকে পশ্চিমা বাজারের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়ের স্থানীয় সরবরাহের অংশ প্রায় ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০-৩৫ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ সক্ষমতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু কাপড়ের চাহিদার তুলনায় তা এখনো যথেষ্ট নয়।
এ বাস্তবতার কারণও একাধিক। প্রথমত, কাপড় উৎপাদনে বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি। দ্বিতীয়ত, একটি মিল স্থাপনে সময় লাগে অনেক বেশি। তৃতীয়ত, উৎপাদন শুরুর পর নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। চতুর্থত, চীনের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় এখনো অনেক ক্ষেত্রে বেশি।
আব্দুস সালামের হিসাবে, একটি গার্মেন্ট কারখানায় ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে কয়েক মাসের মধ্যে একটি মানসম্মত কারখানা দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু একটি কাপড়ের মিল স্থাপনে ন্যূনতম ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে এবং উৎপাদনে যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই বছর। শুধু মেশিন আমদানি করতেই দীর্ঘ সময় চলে যায়।
ফলে একজন উদ্যোক্তার কাছে দ্রুত রিটার্ন পাওয়া গার্মেন্ট কারখানায় বিনিয়োগের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি ও বেশি মূলধননির্ভর কাপড়ের মিলে বিনিয়োগ অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ডেনিমে চীননির্ভরতা নয়, প্রয়োজনের জায়গায় আমদানি
ক্রাউন ওয়্যার্স (প্রাইভেট) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বাংলাদেশের কাপড় শিল্পের সক্ষমতার এ পার্থক্যটিই তুলে ধরেছেন। তার মতে, চীন থেকে কাপড় আমদানিকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি বড় অসুবিধা। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, সব ধরনের কাপড়ে বাংলাদেশ চীনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
বিশেষ করে ডেনিমে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। তার মতে, বাংলাদেশ চীন থেকে ডেনিম না আনলেও টিকে থাকতে পারবে। বর্তমানে চীন থেকে যে ডেনিম আসে, তার একটি অংশ আসে দামের সুবিধার কারণে এবং আরেকটি অংশ আসে ক্রেতার বিশেষ ফিনিশিংয়ের প্রয়োজন থেকে।
এর পেছনে সরবরাহের সময়ও একটি বড় বিষয়। কোনো ক্রেতা নতুন ডিজাইনের জন্য বিশেষ ধরনের কাপড় চাইলে স্থানীয়ভাবে সেটি তৈরি করতে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অথচ ক্রেতা হয়তো চলতি মৌসুমেই সেই কাপড় চায়। ফলে অর্ডার ধরে রাখতে উদ্যোক্তাকে চীন থেকে কাপড় আনতে হয়।
অর্থাৎ ডেনিমে চীনের সরবরাহ অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতার বিকল্প নয়, বরং দ্রুত সরবরাহ, মূল্য সুবিধা ও বিশেষ চাহিদা পূরণের একটি মাধ্যম।
বাংলাদেশের স্থানীয় ডেনিম শিল্পের সক্ষমতা সম্পর্কে শোভন ইসলামের মূল্যায়নও বেশ ইতিবাচক। তার মতে, বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেনিম উৎপাদক। ফলে ডেনিমকে বাংলাদেশের কাপড় শিল্পের দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সমস্যা বেশি কটন ফ্যাব্রিকের উচ্চমানের অংশে
মৌলিক কটন কাপড় উৎপাদনে বাংলাদেশ মোটামুটি সক্ষম হলেও কাপড়ে উন্নত ফিনিশিং প্রয়োজন হলেই স্থানীয় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। উচ্চ মূল্যের ব্র্যান্ডের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়ের বড় অংশ তখন চীন অথবা ভারত থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
শোভন ইসলামের নিজের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাই এর একটি উদাহরণ। তিনি উচ্চ মানের চিনো পণ্যে কাজ করেন। তার মতে, ৮০ থেকে ১০০ ডলার খুচরা মূল্যের উচ্চ মানের চিনো প্যান্টের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় তিনি স্থানীয়ভাবে কিনতে পারেন না। এসব কাপড় চীন বা ভারত থেকে আনতে হয়।
এখানেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্তমান পরিবর্তনের সঙ্গে কাপড়ের ঘাটতির সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়। দেশের পোশাক কারখানাগুলো এখন শুধু কম দামের পোশাক তৈরি করছে না। উচ্চ মূল্যের ব্র্যান্ডের জন্য উন্নতমানের পোশাক তৈরির সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। ক্রেতারাও সেই ধরনের অর্ডার দিচ্ছে। কিন্তু সেই পোশাকের প্রয়োজনীয় কাপড় স্থানীয়ভাবে সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না।
ফলে পোশাক তৈরির সক্ষমতা এবং পোশাকের কাঁচামাল তৈরির সক্ষমতার মধ্যে একটি ফাঁক তৈরি হয়েছে।
বড় বাধা গ্যাস
এ ব্যবধান কমানোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দুই উদ্যোক্তার বক্তব্যেই উঠে এসেছে জ্বালানি।
শোভন ইসলামের মতে, উন্নতমানের ফিনিশড ফ্যাব্রিক তৈরিতে বড় বয়লার সক্ষমতা প্রয়োজন। আর বয়লার মানেই বড় পরিমাণ গ্যাসের প্রয়োজন। দেশে গ্যাসের নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন কাপড়ের মিল স্থাপন এবং পুরনো মিলের সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
গার্মেন্ট কারখানার ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কিছু সুযোগ থাকলেও টেক্সটাইল প্রসেসিং ইউনিটে সেটি অনেক বেশি কঠিন। ফলে একজন বিদেশী বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে কাপড়ের মিল স্থাপনের প্রস্তাব দিলে প্রথম প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যাবে কিনা।
শোভন ইসলামের ভাষায়, ‘কয়েক বছরে আমরা যে পারলাম না, সেটার মূল প্রতিকূলতা বা প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আমাদের গ্যাস, গ্যাস, গ্যাস আর গ্যাস।’
মোহাম্মদ আব্দুস সালামের বক্তব্যেও একই সমস্যা উঠে এসেছে। তার মতে, গত দুই দশক ধরেই গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট বিনিয়োগের পথে বাধা। বিনিয়োগকারী তখনই অর্থ বিনিয়োগ করবেন যখন উৎপাদন চালানোর নিশ্চয়তা থাকবে।
ফলে স্থানীয় কাপড় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য শুধু প্রণোদনা বা সহজ লাইসেন্সিং যথেষ্ট নয়। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও অবকাঠামোর নিশ্চয়তাও দিতে হবে।
বিনিয়োগের ঘাটতিতে থেমে আছে কাপড়
বাংলাদেশে কাপড় উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দুই উদ্যোক্তার বক্তব্য প্রায় মিলে যায়।
আব্দুস সালামের মতে, একটি কাপড়ের মিল স্থাপনে গার্মেন্ট কারখানার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ ও সময় প্রয়োজন। ফলে সুদের হার, গ্যাসের অনিশ্চয়তা এবং বাজার ঝুঁকি একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোক্তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
শোভন ইসলামও বলছেন, স্থানীয়ভাবে কাপড় তৈরির জন্য বড় উৎপাদনকারীরা চেষ্টা করছেন। স্থানীয় কাপড় ব্যবহারে প্রণোদনাও রয়েছে। কিন্তু কভিডের পর কটন ফ্যাব্রিক খাতে নতুন বিনিয়োগ খুব বেশি হয়নি।
তাঁর মতে, বিনিয়োগের আগ্রহ একেবারে নেই তা নয়। বরং উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত, বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু জ্বালানি নিশ্চয়তা না থাকায় আলোচনা চূড়ান্ত বিনিয়োগে রূপ নিচ্ছে না।
এখানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ হলো মানবসৃষ্ট তন্তু। বিশ্ববাজারে সক্রিয় পোশাক ও অন্যান্য উচ্চ মূল্যের পোশাকে মানবসৃষ্ট তন্তুর ব্যবহার বাড়ছে। এ তন্তুর উন্নত মানের উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
শোভন ইসলামের মতে, উচ্চমানের মানবসৃষ্ট তন্তুর ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনাম শক্তিশালী। ভিয়েতনামে আবার চীনা বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি ও উৎপাদন পরিবেশের অনিশ্চয়তার কারণে আগ্রহ বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নিচ্ছে না।
চীনের কাপড় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের কাপড় আমদানিতে চীনের বড় অবস্থানকে শুধু স্থানীয় শিল্পের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
চীনের বড় সুবিধা হলো উৎপাদনের পরিসর, বৈচিত্র্য, দাম ও দ্রুত সরবরাহ। একটি নির্দিষ্ট ধরনের কাপড় স্থানীয়ভাবে তৈরি করতে যেখানে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে, চীনের সরবরাহকারী সেটি প্রস্তুত অবস্থায় দিতে পারে। বড় ক্রেতার বড় অর্ডারও দ্রুত সামাল দিতে পারে।
এ কারণে বাংলাদেশের উদ্যোক্তার কাছে চীন শুধু সস্তা কাপড়ের উৎস নয়। এটি একটি বড় ও নমনীয় সরবরাহ ব্যবস্থা।
এর আরেকটি দিকও রয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক রফতানি যত বাড়বে, স্থানীয় মূল্য সংযোজনের প্রশ্ন তত গুরুত্বপূর্ণ হবে। সুতা দেশে তৈরি হলেও যদি কাপড় বিদেশ থেকে আনতে হয়, তাহলে উৎপাদন শৃঙ্খলের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে থেকে যায়।
বিশেষ করে উচ্চ মূল্যের পোশাকের বাজারে যেতে হলে উন্নতমানের কাপড়ের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন।
সুতা থেকে কাপড়, কাপড় থেকে উচ্চ মূল্যের পোশাক
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ তাই শুধু নতুন গার্মেন্ট কারখানা স্থাপনের ওপর নির্ভর করছে না। নির্ভর করছে পশ্চাৎ সংযোগের দুর্বল জায়গাগুলো কতটা দ্রুত শক্তিশালী করা যায় তার ওপর।
সুতায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে বেশ অগ্রগতি করেছে। ডেনিমেও সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। নিট কাপড়ের বড় অংশ দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। মৌলিক কটন ফ্যাব্রিকেও সক্ষমতা বাড়ছে।
কিন্তু উন্নত ফিনিশিং, উচ্চ মানের বোনা কাপড় এবং মানবসৃষ্ট তন্তুভিত্তিক কাপড়ে বড় ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতিই চীন ও ভারতের মতো দেশের ওপর নির্ভরতা তৈরি করছে।
তাই চীন থেকে কাপড় আমদানি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ আমদানি নিয়ন্ত্রণ নয়। বরং দেশে এমন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত, প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং প্রয়োজনীয় মানে কাপড় তৈরি করা যায়।
এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ এবং বড় বিনিয়োগের নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ৫০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি ধরে রেখে ১০০ বিলিয়ন ডলারের দিকে যেতে চাইলে এ সক্ষমতা আরো জরুরি হয়ে উঠবে। কারণ শুধু পোশাকের পরিমাণ বাড়িয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন করলে আমদানিনির্ভরতাও বাড়তে পারে।
আব্দুস সালামের ভাষায়, দেশের পোশাক রফতানি আরো বড় করতে হলে নিজস্ব কাঁচামালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আর শোভন ইসলামের বক্তব্যে উঠে এসেছে, সেই সক্ষমতা তৈরির জন্য উদ্যোক্তার আগ্রহের ঘাটতি যতটা নয়, তার চেয়ে বড় সমস্যা উৎপাদনের পরিবেশ।
বাংলাদেশের জন্য চীন তাই একই সঙ্গে প্রতিযোগী ও সরবরাহকারী। আজ চীন থেকে যে কাপড় আমদানি হচ্ছে, তার একটি অংশ আগামী দিনে বাংলাদেশে তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে চীনের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে।
আর যদি উচ্চমানের কাপড় ও মানবসৃষ্ট তন্তুর সক্ষমতা তৈরি না করা যায়, তাহলে পোশাক শিল্পের উৎপাদন যতই বাড়ুক, কাঁচামালের একটি বড় অংশের জন্য বিদেশী সরবরাহের ওপর নির্ভরতা থেকেই যাবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পরবর্তী লড়াই তাই শুধু পোশাক রফতানির নয়। এটি সুতা থেকে কাপড় এবং কাপড় থেকে উচ্চ মূল্যের পোশাক তৈরির পুরো উৎপাদন শৃঙ্খল দেশে কতটা গড়ে তোলা যায়, সেই লড়াই।
সুতা উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেকটা পথ এগিয়েছে। এখন সেই সুতাকে আরো বেশি পরিমাণে এবং আরো উন্নতমানের কাপড়ে রূপান্তর করতে পারাই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।