দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝামাঝি অবস্থানে ঢাকা। পশ্চিমে উপসাগরীয় দেশ ও ইউরোপ, পূর্বে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ান অঞ্চলের বড় অর্থনীতিগুলো। এর সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের নিজস্ব বড় প্রবাসী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পর্যটনভিত্তিক যাত্রীবাজার। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে ঢাকার বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় আড়াই কোটিতে উন্নীত হওয়ার কথা। ভৌগোলিক অবস্থান, নিজস্ব যাত্রীবাজার ও নতুন অবকাঠামো—এ তিন সুবিধাকে একটি কার্যকর নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে পারলেই আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্ভাব্য বাজারও ছোট নয়। ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বছরে আনুমানিক ২ কোটি ২ লাখ এবং উপসাগরীয় অঞ্চল বা জিসিসি ও আসিয়ানের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ দ্বিমুখী যাত্রী চলাচল রয়েছে। ইউরোপ ও চীনের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ এবং জিসিসি ও চীনের মধ্যে প্রায় ৯৭ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, চীন ও আসিয়ানকে ঘিরেও রয়েছে কয়েক মিলিয়ন যাত্রীর পৃথক প্রবাহ। এসব যাত্রীর বড় অংশ এখন ঢাকা ব্যবহার করেন না। তবে পূর্ব-পশ্চিমমুখী এসব করিডোরের একটি অংশকে ঢাকা হয়ে চলাচল করানো গেলে তা উল্লেখযোগ্য ট্রানজিট বাজার তৈরি করতে পারে।
ঢাকার জন্য বিশেষ সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের মধ্যে বছরে প্রায় ২৫ লাখ, কাতার ও চীনের মধ্যে ১৮ লাখ এবং সৌদি আরব ও চীনের মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ যাত্রী চলাচল করে। সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত ও ওমানের সঙ্গে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনেরও বড় যাত্রী চলাচল রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে এসব রুটের কাছাকাছি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে ঢাকা হয়ে পূর্বমুখী এবং বিপরীত দিকে সংযোগ তৈরির সুযোগ রয়েছে।
তবে কোনো বিমানবন্দর শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাব হয় না। হাব গড়তে হলে অন্যতম অগ্রাধিকার শক্তিশালী নিজস্ব বাজার। বাংলাদেশে আসা আন্তর্জাতিক যাত্রীর মধ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকেই প্রায় ৪২ লাখ ১৫ হাজার যাত্রী আসার তথ্য রয়েছে, যা মোট প্রবাহের ৬১ শতাংশের বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে প্রায় ২০ লাখ ৮২ হাজার এবং ইউরোপ থেকে প্রায় ৩ লাখ ৫৭ হাজার যাত্রী। তাই ট্রানজিট বাজার তৈরির আগে বাংলাদেশমুখী বিদ্যমান যাত্রাকে ধরে সরাসরি রুট ও ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানোই হবে ভিত্তি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফ্লাইটের সময়সূচির সমন্বয়। একটি কার্যকর হাবে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফ্লাইট কাছাকাছি সময়ে এসে পৌঁছায় এবং স্বল্প ব্যবধানে অন্য অঞ্চলের ফ্লাইট ছেড়ে যায়। ঢাকার ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ থেকে আসা ফ্লাইটের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ামুখী ফ্লাইটের সময় মিলিয়ে সমন্বিত আগমন-প্রস্থান সময়সূচি তৈরি করতে হবে। একইভাবে চীন, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ড থেকে আসা যাত্রী যেন দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপমুখী ফ্লাইট ধরতে পারেন সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু রুট থাকাই যথেষ্ট নয়; এক ফ্লাইট থেকে আরেক ফ্লাইটে সংযোগ কত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য, হাবের সাফল্য মূলত তার ওপর নির্ভর করবে।
এ নেটওয়ার্ক শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমানের বহরে ২১টি উড়োজাহাজ ছিল, যার ১৯টি নিজস্ব। ওই সময়ে সংস্থাটি প্রায় ৩৪ লাখ যাত্রী বহন করেছে এবং কেবিন ফ্যাক্টর ছিল ৮২ শতাংশ। লাভজনক ও সংযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুটে বিমানের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি ক্যারিয়ার, সম্ভাব্য বাজেট এয়ারলাইনস এবং বিদেশী এয়ারলাইনসের ফ্রিকোয়েন্সিও বাড়াতে হবে। লক্ষ্য হতে হবে এমন একটি নেটওয়ার্ক, যেখানে প্রতিটি এয়ারলাইনস সামগ্রিক কানেক্টিভিটিতে নতুন মূল্য যোগ করে।
বিদেশী এয়ারলাইনস আকর্ষণ করতে বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে। নতুন রুট অনুমোদন, জিএসএ নিয়োগ ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার জন্য একক বা ‘ওয়ান-স্টপ’ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ স্লট বরাদ্দ, পূর্বানুমানযোগ্য মৌসুমি অনুমোদন এবং সময়সীমাবদ্ধ ডিজিটাল প্রক্রিয়া দরকার। বিমানবন্দর চার্জ ও প্রতিযোগিতার নিয়মও স্পষ্ট হতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসকে দীর্ঘমেয়াদি সময়সূচি ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হলে আগে থেকেই জানতে হবে কোন নিয়মে, কত সময়ে এবং কী খরচে তারা বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোকে হাব পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার ও অন্যান্য আঞ্চলিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট এমনভাবে ঢাকায় আনা যেতে পারে, যাতে যাত্রী দ্রুত আন্তর্জাতিক সংযোগ ধরতে পারেন। এতে এসব বিমানবন্দর ঢাকার ‘ফিডার’ হিসেবে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীভিত্তিও বড় হবে।
থার্ড টার্মিনাল অবকাঠামোগত বড় সুযোগ তৈরি করলেও এর পূর্ণ সুবিধা পেতে এয়ারসাইড সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে শাহজালাল বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিল প্রায় ৭৯ লাখ ২০ হাজার, যা তখনকার প্রায় ৮০ লাখ ধারণক্ষমতার কাছাকাছি। নতুন টার্মিনালে সেই সীমা প্রায় দুই কোটিতে উঠবে। কিন্তু ঢাকার রানওয়ে একটি। ফলে ফ্লাইট বাড়ার সঙ্গে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, স্ট্যান্ড, টোয়িং এবং বিঘ্ন সামলানোর দক্ষতা বাড়াতে হবে। হাবের সক্ষমতা শুধু যাত্রী ও ফ্লাইটে সীমিত নয়। ট্রাফিক বাড়ার সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, ক্যাটারিং ও লজিস্টিকসের পরিসরও বাড়াতে হবে। এসব সেবা বড় হলে ব্যবহার ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব হবে; আর তা আরো বেশি ফ্লাইট, গন্তব্য ও যাত্রীর বিকল্প তৈরিতে সহায়ক হবে।
ট্রানজিট যাত্রীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে নির্বিঘ্ন সেবা। উড়োজাহাজ থেকে নামার পর পরবর্তী গেটে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে, নিরাপত্তা পরীক্ষা কত দ্রুত হচ্ছে, ব্যাগেজ পরবর্তী ফ্লাইটে ঠিকভাবে যাচ্ছে কিনা এবং ফ্লাইট সময়মতো ছাড়ছে কিনা—এসবই হাবের মান নির্ধারণ করবে। তৃতীয় টার্মিনালকে তাই শুধু নতুন ভবন নয়, একটি সমন্বিত অপারেটিং ব্যবস্থা হিসেবে চালাতে হবে। যাত্রী চলাচল, নিরাপত্তা, ব্যাগেজ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, স্ট্যান্ড ও এয়ারসাইড অপারেশনকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। দুই যোগ্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার, অভিন্ন নিরাপত্তা মান, স্বচ্ছ সেবামান চুক্তি বা এসএলএ এবং স্বাধীনভাবে কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণের প্রস্তাবও রয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই মূল পরীক্ষা অবকাঠামো নির্মাণের নয়, সমন্বিত কানেক্টিভিটি তৈরি করার। প্রথমে টার্মিনালের পূর্ণ অপারেশনাল প্রস্তুতি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, রুট উন্নয়ন ও প্রকৃত যাত্রী চাহিদার তথ্য; এরপর কৌশলগত নতুন রুট, সময় মেলানো ফ্লাইট ব্যাংক এবং প্রয়োজনীয় ফ্রিকোয়েন্সি। ট্রানজিট বাজার বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি রানওয়ে ও বিমানবন্দর বিনিয়োগও চাহিদা অনুযায়ী এগোতে পারে।