নতুন টার্মিনাল, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, উড়োজাহাজের বহর কিংবা কার্গো সক্ষমতা—এভিয়েশন খাতের উন্নয়নের দৃশ্যমান দিক এগুলোই। কিন্তু অবকাঠামো তৈরি করলেই তার পুরো সুফল পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন মানসম্পন্ন যাত্রীসেবা, দক্ষ জনবল এবং বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত নীতি ও পরিকল্পনা। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতেও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নতুন সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো। বিমানবন্দর, এয়ারলাইনস, কার্গো, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থল যোগাযোগের পরিকল্পনা একই লক্ষ্যে না এগোলে একটি খাতের অগ্রগতি অন্য খাতের সীমাবদ্ধতায় আটকে যেতে পারে।
এক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাত্রীসেবা। বিমানবন্দরে একজন যাত্রীর অভিজ্ঞতা শুধু টার্মিনালের আকার বা সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে না। ফ্লাইট সময়মতো ছাড়ছে কিনা, ব্যাগেজ কত দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে, নিরাপত্তা পরীক্ষা কতটা স্বাচ্ছন্দ্য, এক ফ্লাইট থেকে অন্য ফ্লাইটে যেতে কত সময় লাগছে এবং যাত্রীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা কত দ্রুত দেয়া হচ্ছে—এসবই সেবার মান নির্ধারণ করে। তাই যাত্রীসেবার মান নিয়মিত পরিমাপ ও প্রকাশের পাশাপাশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সেবায় নির্দিষ্ট মানদণ্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বড় বিষয় দক্ষ জনবল। এভিয়েশনের জন্য শুধু পাইলট ও কেবিন ক্রু তৈরি করলেই হবে না। প্রয়োজন ফ্লাইট ডিসপ্যাচার, এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার, এভিওনিকস বিশেষজ্ঞ, এমআরও পরিকল্পনাবিদ, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার, নিরাপত্তাকর্মী, উদ্ধারকর্মী ও গ্রাউন্ড অপারেশনের প্রশিক্ষিত জনবল। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, ডিজিটাল ব্যবস্থা, কার্গো ও নেতৃত্বেও দক্ষ লোক প্রয়োজন। এজন্য একটি জাতীয় এভিয়েশন একাডেমি গড়ে প্রশিক্ষণ, সনদ, কর্মসংস্থান ও দক্ষ কর্মী ধরে রাখার মধ্যে ধারাবাহিকতা তৈরি করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, এয়ারলাইনস, বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিদাতা প্রতিষ্ঠানকেও এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
এভিয়েশন খাতের নিরাপত্তা ও আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ, বিমানবন্দর পরিচালনা, দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল অধিকার, এয়ারলাইনস, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, এমআরও, অর্থায়ন, বাণিজ্য ও কাস্টমসের দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। এসব সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করলে সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক তৈরি হতে পারে। এজন্য জাতীয় এভিয়েশন উন্নয়ন কাউন্সিল এবং স্থায়ী বাস্তবায়ন ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। কাউন্সিল নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে, বাস্তবায়ন ইউনিট বিভিন্ন অংশের কাজ সমন্বয় করবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা তদারক করবে এবং অপারেটররা সেবা পরিচালনা করবেন।
এর সঙ্গে দরকার স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। স্লট বরাদ্দে প্রকাশিত মানদণ্ড, বিমানবন্দর চার্জে স্বচ্ছতা এবং সনদ, পারমিট ও লাইসেন্সের জন্য সময়সীমাবদ্ধ ডিজিটাল প্রক্রিয়া বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে পারে। যাত্রী অধিকার, সেবার মান এবং খাতভিত্তিক নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশও একইভাবে জরুরি।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের পরবর্তী অগ্রগতি শুধু নতুন অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করবে না। যাত্রীকে নির্ভরযোগ্য সেবা দেয়া, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল তৈরি করা এবং সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অপারেটরদের একই পরিকল্পনার মধ্যে আনা—এ তিন ক্ষেত্রেই একসঙ্গে অগ্রগতি দরকার। তাহলেই নতুন সক্ষমতা কার্যকর অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারবে।