স্বাধীনতাপূর্ব ভারী শিল্প

চট্টগ্রাম বর্ণিল বিশেষণে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। প্রায় হাজার বছর নানা জাতিগোষ্ঠীর আগমন-আক্রমণে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছিল নিয়তির খেলা আর মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতারও বাইরে মানিয়ে নেয়ার এক অসম্ভব শক্তি। মধ্যযুগের প্রাচীন হরিকেল রাজ্য কিংবা দেয়াঙ পরগনার সমৃদ্ধ ইতিহাসে মগ, পর্তুগিজ কিংবা ওলন্দাজদের আগমনের শেষার্ধে ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলেই প্রতিরোধ সংগ্রামের ঝলক দেখায় এ অঞ্চলের ভূমিপুত্ররা। তবে কাঁচামাল সংগ্রহ ও  পুঁজি গঠনে এ অঞ্চলের প্রকৃতি ও  শ্রমকে নিঃশেষিত করার প্রাক্কালে স্থায়ী বাণিজ্যের শিল্পও স্থাপন করে ভবঘুরে আগন্তুক কিংবা সুদূরপ্রসারী চিন্তার ওইসব বাণিজ্যরথী, যার স্মৃতিচিহ্ন এখনো চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের আনাচে-কানাচে দৃশ্যমান।

জেমস ফিনলে, ডানকান ব্রাদার্স কিংবা লিভার ব্রাদার্সের মতো বিশ্বখ্যাত বাণিজ্য গ্রুপ চট্টগ্রামেই তাদের পণ্য উৎপাদনের স্থানীয় কারখানা তৈরি করে। পরবর্তীতে তা পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রোথিত হয়। আর পাকিস্তান সরকারই চট্টগ্রামের এ অপারসম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগোলিকভাবে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে একের পর এক শিল্প স্থাপনে মনোযোগী হয়, যা ঐতিহ্য আর পরম্পরায় বাংলাদেশের ভারী শিল্প কিংবা যেকোনো নতুন শিল্প সম্ভাবনার সূতিগাকার হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম। পর্তুগিজ কিংবা তারও  আগের চট্টগ্রামে জাহাজ ভাঙা শিল্পের যে সূত্রপাত, তারই ধারাবাহিতকতা চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরাজ করছে। জাহাজ ভাঙা শিল্প, কাগজ, কেমিক্যাল, প্রসাধনী, ইস্পাত, পাট ও পাটজাত পণ্যের  যে সংস্কৃতি ভিনদেশীরা চট্টগ্রামে রেখে গিয়েছিলেন, তারই হাত ধরে একটি সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চলের প্রারম্ভিকতা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বণিকদের কাছে।

চট্টগ্রামের গর্ব করার মতো ছিল নানা অনুষঙ্গ। শৌর্য-বীর্যেও সূতিকাগার চাটগাঁ আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিপ্লবেও কখনো পিছিয়ে ছিল না।  নান্দনিক দৃষ্টিনন্দন অপ্সরীস্থানও হাতেগোনা নয়। তবে ভৌগোলিক ও  প্রকৃতিকগত কারণে উপমহাদেশের অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠীর দৃষ্টি ছিল চট্টগ্রামের দিকেই। সঙ্গত কারণে তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রামই হয়ে ওঠে বিকাশমান নানা ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। উপমহাদেশের আদি ব্যবসায়ীরা ভারী শিল্প স্থাপনে যেকোনো উপায়ে চট্টগ্রামকেই প্রথম সারিতে রাখতেন। কেবল এশিয়া মহাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে  বন্দর ও রেল সুবিধাসংবলিত অঞ্চলটি। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধানতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার সেই প্রচেষ্টা বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পর্যায়ে রেখেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের ফেলে যাওয়া শিল্প-কারখানাগুলো রাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে যুদ্ধপরবর্তীকালে বাংলাদেশ শিল্প খাতে একটি শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। পাকিস্তান আমলে সম্ভাবনাময় শিল্প-কারখানাসমৃদ্ধ অঞ্চলটি পাকিস্তানের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলেও নতুন পরিস্থিতিতে সেভাবে প্রসার ঘটাতে পারেনি। তবে ভারী শিল্পের এ অভিজ্ঞতা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের শিল্পের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। বন্দর সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখানকার পুঁজিপতিরা ট্রেডিং সংস্কৃতির বাণিজ্য থেকে ধীরে ধীরে শিল্পে মনোনিবেশ করতে থাকে। 

ব্রিটিশদের দিয়ে চট্টগ্রামে শিল্প স্থাপনের শুরু হলেও রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণতা পায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের সময়ে। পরবর্তীতে এ ধারায় সারা দেশের শিল্প গ্রুপগুলো এগিয়ে আসে। চট্টগ্রাম স্টিল মিলস একসময় জার্মানিসহ উন্নত বিশ্বের সবচেয়ে ভালো মানের ইস্পাতপণ্য তৈরির অভিজ্ঞতা দিয়েছে এখানকার ব্যবসায়ী শ্রেণীকে। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম থেকেই দেশের ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ এমনকি জাহাজ ভাঙা শিল্প অগ্রসরমান শিল্পে রূপান্তর হয়েছে।

পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষিত পূর্ব বাংলায় সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক প্রবাহ ছিল পাকিস্তান সরকার কিংবা তাদের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীদের। স্বল্পমূল্যের কাঁচামাল, বিশ্ববাজারে সহজেই রফতানির সুযোগ, সস্থা শ্রমবাজারের কারণে নদী ও সমুদ্রকেন্দ্রিক চট্টগ্রামে একের পর এক বৈচিত্র্যময় শিল্প স্থাপন করে পাকিস্তানি বৃহৎ শিল্প গ্রুপগুলো। পাকিস্তান সরকার চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতীরবর্তী এলাকায় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কাগজ উৎপাদন কারখানা স্থাপন করলেও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের বৃহৎ দাউদ গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়। দৈনিক ১৫০ টনেরও বেশি কাগজ উৎপাদনের মাধ্যমে কারখানাটি এশিয়ার সবচেয়ে বড় কাগজ কারখানায় রূপান্তর হয়। পরে স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয়  বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের আওতায় নিয়ে এসে পরিচালনা শুরু করে সরকার। যদিও বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে কর্ণফুলী পেপার মিল। এর পরও দেশের শিল্প খাতে কারখানাটি একটি মাইলফলক হিসেবে রয়েছে।

নানা পথপরিক্রমা, নানামাত্রিক পরিবর্তিত পরিস্থিতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার ছন্দপতন, ব্যবসায়ীদের চিন্তাচেতনার পরিবর্তন, কিছু ব্যবসায়ীর ঢাকাকেন্দ্রিক মানসিকতা ও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক অবয়বে। নিবু নিবু করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়েছে অনেকগুলো, আছে বন্ধ হওয়ার পথেও। এসব তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘতর হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে আসাম বেঙ্গল রেল হেডকোয়ার্টার স্থাপন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যে অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তাও কালে কালে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামে হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ জোন স্থাপনের মাধ্যমে এ বন্দর শহরটিকে শিল্প শহরে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সরকার প্রাইভেটাইজেশনের নামে অনেক কল-কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করেছে। এসব কল-কারখানা আর চালু হয়নি।

চিটাগং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নে প্রায় ৯২ একর জমির ওপর ১৯৬৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বার্ষিক প্রায় ২২ হাজার টন রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানটিতে সাত হাজার টন কস্টিক সোডা, ৪ হাজার ৬০০ টন তরল ক্লোরিন, সাত হাজার টন হাইড্রোলিক অ্যাসিড, ৬০০ টন ব্লিচিং পাউডার ও ২ হাজার ৪০০ টন ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্লোরাইড উৎপাদনক্ষমতা ছিল। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনকভাবে চালু ছিল। কিন্তু সরকার বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ২০০২ সালে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। ২০০৩ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয় চিটাগং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স। চীনা একটি প্রতিষ্ঠানকে এটি চালু করতে দিলেও তা এখনো চালু করা হয়নি।

কর্ণফুলী পেপার মিলস
চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় ১৯৫৩ সালে কর্ণফুলী পেপার মিল প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন ‘পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা’ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পেপার মিলটি ১৯৫৩ সালের ১৬ অক্টোবর বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্যমাত্রা ছিল বার্ষিক ৩০ হাজার টন কাগজ উৎপাদনের। তবে শুরুতে ব্যবস্থাপনা ত্রুটি থাকায় ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার দাউদ গ্রুপের কাছে কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়। পরে তারাই এটির আধুনিকায়ন করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ‘বাংলাদেশ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা’ এটি অধিগ্রহণ করে।

কর্ণফুলী পেপার মিলের ক্রয়কৃত জমির পরিমাণ প্রায় ৩২ দশমিক ৪৭ একর, লিজপ্রাপ্ত জমির পরিমাণ ১১৯২ দশমিক ৯৬ একর ও এটির মিল এলাকা ৪৪২ দশমিক ৩২ একর। মিলটির প্রধান কাঁচামাল হলো বাঁশ। বাঁশ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বাঁশের জন্য স্থানীয় রাইংক্ষ্যং এলাকায় লিজপ্রাপ্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৮৩ হাজার ৪০৮ একর ও কাচালং এলাকায় লিজপ্রাপ্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার ৮৬৯ একর।

টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড
টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড। চট্টগ্রাম নগরের উত্তর পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র ফসফেট সার কারখানা। টিএসপি কমপ্লেক্স তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (ইপিআইডিসি) সময় প্রতিষ্ঠা হয়। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় ১৯৭৪ সালে। বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা এক লাখ টন। সমুদ্রবন্দর তীরবর্তী সুবিধা কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্ণফুলীর তীরে একাধিক সার কারখানা নির্মাণ করেছে, যার শুরুটা শিল্প পাকিস্তান আমলের।

চিটাগং স্টিল মিলস
পূর্ব পাকিস্তানের সামগ্রিক ইস্পাতের চাহিদা ছিল ব্যাপক। এ চাহিদা বিবেচনা করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬০ সালের দিকে চট্টগ্রামে ‘চিটাগং স্টিল মিলস’ নামে একটি ইস্পাত কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে ১৯৬০ সালের শেষের দিকে প্রায় ২২২ দশমিক ৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কারখানাটি স্থাপনে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় তৎকালীন ৫৬ দশমিক ৭০ কোটি রুপি। এর মধ্যে ১৬ দশমিক ৬৭ কোটি রুপি ছিল বৈদেশিক সহায়তা। এটি স্থাপনের দায়িত্ব দেয়া হয় ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (ইপিআইডিসি) নামে সরকারি একটি  সংস্থাকে। জাপানের কোবে স্টিল লিমিটেডের মাধ্যমে ১৯৬৭ সাল নাগাদ কারখানাটির স্থাপন কাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় ১৯৬৭ সালের আগস্টে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে এটিকে একটি পৃথক  কোম্পানিতে পরিণত করা হয়। তবে এটি কর্ণফুলী নদীতীরে অবস্থিত হওয়ায় ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে কারখানাটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে সরকার কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করে। এ কারখানাই চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রসিদ্ধ ভারী ইস্পাত শিল্প হিসেবে পরিচিত ছিল। চট্টগ্রামের ইস্পাত শিল্পের বিকাশে তৎকালীন চিটাগং স্টিল মিলসের অবদান এখনো অনস্বীকার্য।

সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে ১৯৬৬ সালে গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গাড়ি সংযোজন কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তান। স্বাধীনতাপরবর্তী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের আওতায় প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ নামে যাত্রা করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায়, যা দেশের গাড়ি সংযোজনের ক্ষেত্রে এখনো শীর্ষস্থানীয়। বছরে প্রায় এক হাজার নতুন ব্র্যান্ডের গাড়ি সংযোজন ও বিপণনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশে ভারী শিল্প হিসেবে অগ্রগণ্য। ইংল্যান্ডের জেনারেল মোটরসের কারিগরি সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত প্রগতি দীর্ঘদিন ধরে জাপানের মিত্সুবিশি করপোরেশন ছাড়াও বর্তমানে ভারতের মাহিন্দ্রা, টাটা ছাড়াও বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহযোগিতায় দেশে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান তৈরির স্বপ্নকে জিইয়ে রেখেছে।

চট্টগ্রামে স্থাপিত শতাধিক ভারী শিল্পই পাকিস্তান সরকারকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়েছে। যদিও এর ফল পূর্ব বাংলার মানুষ ভোগ করতে পারেনি। তবে ওই সময়কার শিল্প স্থাপনের সংস্কৃতি চট্টগ্রামকে অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি শিল্পবান্ধব করে তুলেছে পরবর্তীকালে। তৎকালীন স্থাপিত বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়াও কিছু কিছু এখন মৃতপ্রায় হলেও চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের পরবর্তী শিল্পগোষ্ঠী বিকল্প ভারী শিল্পের বাণিজ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে বিভিন্নভাবে।

নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘতর হতে চলেছে। ঈগল টেক্সটাইল মিল ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের পর তার বিশাল জায়গায় গড়ে উঠেছে হাউজিং এস্টেট। কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে ইস্পাহানির মালিকানাধীন চিটাগং জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিতে ১২ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন। ১৯৯৮ সালে মিলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তাছাড়া এ শিল্পাঞ্চলে এ কে খান প্লাইউড, এ কে খান ম্যাচ কোং, ইব্রাহিম ম্যাচ ফ্যাক্টরির মতো পুরনো মিলগুলো এখন ভুতুড়ে এলাকায় পরিণত হয়েছে। থেরাপিউটিকস নামে একটি ওষুধ কারখানাও এখন বন্ধ। প্যাসিফিক ইন্ডাস্ট্রিজ, যেখানে একসময় ন্যাশনাল ব্র্যান্ডের টিভি তৈরি হতো, তাও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। এখানে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের উড ট্রিটিং প্লান্ট ও চিটাগং বোর্ড মিল দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত। দোহাজারীতে সাঙ্গু ভ্যালি টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ আছে। সীতাকুণ্ড ও ফৌজদারহাট শিল্পাঞ্চলে এস কে এম জুট মিল, জেএম টেক্সটাইল, মকবুলার রহমান জুট মিল, আনোয়ারা জুট মিল, সুলতানা জুট মিল, কাসেম জুট মিল, সালেহ জুট মিলস, সালেহ-জরিনা রি-রোলিং মিল, জলিল টেক্সটাইল, ন্যাশনাল কটন মিল, গোল্ডেন বেঙ্গল টোব্যাকোসহ অনেক প্রসিদ্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি মালিকানাধীন এসকেএম জুট মিল, আর আর টেক্সটাইল, হাফিজ টেক্সটাইল, অ্যারোমা টি কোম্পানি, লিপটন চা কোম্পানিও বন্ধ। পাহাড়তলী শিল্পাঞ্চলে ইস্পাহানির ভিক্টোরি জুট প্রডাক্টস বন্ধ ১৯৯৫ সাল থেকে। একই সময় বন্ধ হয় এ কে খান গ্রুপের চিটাগং টেক্সটাইল, এ কে খান জুট, আমীন জুট মিল ইত্যাদি।

রাঙ্গুনিয়ার কর্ণফুলী জুট মিল ও ফোরাত-কর্ণফুলী কার্পেট মিলস বন্ধ ঘোষণার পর শিল্পাঞ্চলটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। নগরীর পতেঙ্গা শিল্পাঞ্চলে আইয়ুব আমলে গড়ে ওঠে চিটাগং স্টিল মিল, ড্রাইডক, টিএসপি সার কারখানার মতো ভারী শিল্পও এখন বন্ধ। হালিশহর সিএসডি গুদামও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নাসিরাবাদ, ষোলশহর শিল্পাঞ্চলে ওয়ালি অয়েল মিলস, চিটাগং অ্যালুমিনিয়াম, ক্রিসেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, আদম অয়েল, জেনারেল আয়রন, বায়েজিদ ইন্ডাস্ট্রিজ, হামিদিয়া অয়েল, বেঙ্গল বেল্টিং, তারা ফ্যান ইন্ডাস্ট্রিজ, ভালিকা উলেন মিলস, হাশমী ক্যান কোং, রবি প্লাইউড, ইব্রাহীম কটন মিল, এশিয়াটিক কটন মিলের মতো অনেক নামি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

আরও