বে’জ এজওয়াটার

আমরা যখন কোনো সুন্দর, পরিপাটি শহরের কথা বলি, তখন আসলে বোঝাতে চাই যে, এর বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটগুলোর একটা পরিশীলিত, সুবিন্যস্ত আবহ আছে। স্থপতির কাজ ভবনের সীমানার ভেতর, কিন্তু তার স্থাপত্যকর্ম দৃশ্যমান যে জায়গা থেকে, সেটা ব্যক্তিমালিকানার বাইরে। সেটা নাগরিকের স্থান। এ কারণেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার মালিকানাধীন জমির ওপর একদম নিজস্ব মর্জি অনুযায়ী কিছু তৈরি করতে পারেন না— তাকে নির্মাণবিষয়ক কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এ আইনগুলোর প্রণেতা এবং সাধারণভাবে এগুলো কোন ভবন কী আয়তনের হবে, তাতে গাড়ি পার্কিং, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য, আলো-বাতাস চলাচল ইত্যাদির ব্যবস্থা— এ-জাতীয় বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। যেটা করে না, যৌক্তিকভাবেই, সেটা হলো নান্দনিক বিষয়াদি। নান্দনিকতার জায়গাটা পুরোটাই স্থপতির এখতিয়ার।

স্থাপত্যের মান বিচারে একটা তৈরি হওয়া ভবন সফল, উত্কৃষ্ট, নিকৃষ্ট নাকি নেহাতই মামুলি— এটা স্থপতির দায়ভার বলেই মনে হয়। কিন্তু স্থপতিকে প্রশ্ন করলে এর আরেকটা উত্তর মেলে— দায়ভার ভবনের মালিক ও ব্যবহারকারীদেরও। একটা উঁচু মানসম্পন্ন স্থাপত্যকর্মও নির্মাণকালীন পর্যায়ে বা পরে ব্যবহারকারীর খামখেয়ালিপনা, অযত্ন ও যথার্থ মূল্যায়নের অভাবে ব্যর্থতায় মুখ থুবড়ে পড়ে। বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, এর অসংখ্য হূদয়বিদারক উদাহরণ আছে। যেমন সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক ভবনগুলো। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ব্যবহারের পর্যায়ে প্রথমেই শুরু হয় সাইনবোর্ড আগ্রাসন। বিভিন্ন তালায় বিভিন্ন আকারে বিভিন্ন রঙের সাইনবোর্ডে ক্রমেই ভবনের ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। কখনো কোনো তলায় পুরো কাচের গায়ে সেঁটে দেন নিজের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনী স্টিকার। সুচ্যগ্র মেদিনী ছেড়ে না দেয়ার প্রত্যয়ে সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে লাগিয়ে ফেলেন দোকানের নাম। ভবনের বাইরে বাতির রঙ বদলে হয় লাল-নীল-বেগুনি রুচিহীন মিশেল। সব মিলিয়ে অল্প কয়েক দিনেই ভবনের চেহারা হয়ে যায় কিম্ভূতদর্শন আর স্থাপত্যের জায়গা হয় আস্তাকুঁড়ে। একটা প্রাসঙ্গিক সমান্তরাল উদাহরণ হতে পারে প্রায় ৬০ বছর আগে তৈরি হওয়া স্থপতি মিজ ভ্যান ড্যর রোহের নিউইয়র্কের সিপ্রাম বিল্ডিং, যাকে এখনো অনেকেই ‘আমেরিকার শ্রেষ্ঠ স্কাইস্ক্রেপার’ বলে থাকেন। ৩৮ তলা এ ভবনে অনেকগুলো ব্যাংক এবং কোর সিজনস্সহ বিখ্যাত অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট থাকলেও বাইরে নেই সাইনবোর্ড একটিও।

এ সবকিছুর হিসাবে ঢাকার গুলশানে বে’জ এজওয়াটার ভবনটি এ দেশে একটি ব্যতিক্রম। স্থাপতিক উত্কর্ষের জন্য বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি স্থাপত্য পুরস্কার বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড ও বার্জার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন আর্কিটেকচার এ ভবনটিকে সমৃদ্ধ করেছে।

প্রায় ৩৮ কাঠা জমির ওপর বানানো এ ভবনের উত্তর-পূর্ব দিকে বারিধারা লেকের বিস্তৃত অংশটি। যেকোনো ভবনের নকশার মূল ভাবনায় স্থপতিরা জমির পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় এনে থাকেন। এ ভবনটিতে লেক একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এবং স্থাপত্য নকশায় তা প্রবলভাবে স্বীকৃত হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে লেকের স্নিগ্ধ, শান্ত দৃশ্য উপভোগের জন্য কাচ, খোলা টেরেস ইত্যাদি স্থাপতিক উপকরণ ব্যবহূত হয়েছে।

সন্নিহিত লেক ও রাস্তার অবস্থান বিবেচনায় ভবনটির নিচতলায় তিনটি পৃথক জোন লক্ষণীয়— দক্ষিণ-পশ্চিমে প্লাজা, উত্তর-পূর্বে সবুজ অংশ ও দক্ষিণের প্রবেশ প্লাজা। এ খোলা জায়গাগুলোয় ঘাস, বৃক্ষ, জলাশয়, র্যাম্প, ধাপ ইত্যাদি মধ্যবর্তী উপকরণ ব্যবহার করে লেক ও রাস্তা থেকে ভবনে প্রবেশের পর্যায়কে ধীর ও ক্রমশ করার প্রচেষ্টা স্পষ্ট।

বাংলাদেশের স্থাপত্যে এ অঞ্চলের জলবায়ু সচেতনতার প্রতিফলন থাকা খুব জরুরি। হালে ‘গ্রিন বিল্ডিং’-এর প্লাটিনাম-গোল্ড-সিলভার ইত্যাদি তকমার প্রচলন হলেও স্থপতিরা শিক্ষার্থী থাকাকালীন থেকেই বন্ধ পশ্চিম-খোলা দক্ষিণ জাতীয় মূল বিবেচনাগুলো তাদের কাজে প্রয়োগ করে থাকেন। বে’জ এজওয়াটার ভবনের পশ্চিমে প্রায় পুরো অংশে দেয়াল থাকায় শেষ বেলার সূর্যের প্রখর তাপ প্রবেশের পথ রুদ্ধ। এতে ভবনের এয়ারকন্ডিশনিং খরচ সাশ্রয় হয়। অন্য তিনটি দিকে কাচ, ফলে ভেতরে দিনের আলোর প্রাচুর্য আর ভেতর থেকে লেকের দৃশ্যের নেই কমতি। দক্ষিণে নর্থ এভিনিউ সারা দিনই যানবাহন চলাচলে সরগরম। দুই স্তরের কাচ বাইরের শব্দ কমিয়ে ফেলে আর দক্ষিণের সূর্যের তাপ প্রবেশ করতে দেয় না। পশ্চিম দিকের বদ্ধ ভাবকে কিছুটা সহনীয় করছে দেয়ালের ওপরের অংশে বিশাল চারকোনা জানালা আর নিচের অংশে খোলা সিঁড়ি, যা সরাসরি উঠে যাচ্ছে দোতলার ক্যাফের দিকে।

বে’জ এজওয়াটার ভবনের দৃশ্যমান প্রধান নির্মাণ উপকরণ দুটো— কাচ এবং ফর্সা (ফেয়ার ফেস) কংক্রিট। একদম ওপরে তিনটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টকে কিছুটা আড়াল করার জন্য পূর্ব দিকে লোহার ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে। নিচের অংশে ডাবল হাইট ও অন্যান্য স্থাপতিক অনুষঙ্গ যেমন ভবনটির ত্রিমাত্রিক বিন্যাসের শুরু, তেমনি দক্ষিণে ওপরের অংশে বেরিয়ে আসা কংক্রিট ক্যানোপি এই কম্পোজিশনের সমাপ্তি। সামগ্রিক স্থাপত্যে একটা সংযত, পরিশীলিত মেজাজ আছে— ভেতর-বাইরে ভবনটি উদ্ধত নয়, মার্জিত।

যে কথা শুরুতে বলা হয়েছিল— কোনো ভবনের স্থাপত্যে চমত্কারিত্ব থাকলেও ব্যবহারকারীর অবহেলায় তা ম্লান হয়ে যায়। আসলে নির্মাণ পর্যায় শেষ হলে ব্যবহারিক পর্যায়ই ভবনের মূল জীবন শুরু। বৈরী আবহাওয়া আর ভূমিকম্পের মতোই অসংবেদনশীল, দুর্বল অভিভাবকও ভবনের জন্য ক্ষতিকর। শহরজুড়ে অধিকাংশ ভবনের দীনতা প্রকৃতপক্ষে সামগ্রিক রুচির অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। বে’জ এজওয়াটার প্রমাণ করে যে, স্থাপতিক উত্কর্ষ ও পরবর্তীতে তার সুষ্ঠু অভিভাবকত্ব নগরের নান্দনিক মাত্রায় গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।

স্থাপত্য নকশা: ডিডব্লিউএমফোর আর্কিটেক্টস

ডিটেইল নকশা ও ল্যান্ডস্কেপ নকশা: ইন্টার স্টুডিও

নির্মাতা: বে ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড

 

লেখক: স্থপতি ও পার্টনার, ডিডব্লিউএমফোর আর্কিটেক্টস

আরও