একবিংশ শতাব্দীতে এসে নির্মাণসামগ্রীর তালিকায় অন্যতম দরকারি আইটেম পাইপ-ফিটিংস। বাড়ি নির্মাণ, সেচ প্রকল্প, খাওয়ার পানি ও গ্যাস সরবরাহ এবং পয়োনিষ্কাশনসহ নানা ধরনের কাজে পাইপ ব্যবহার করা হয়। লাইনে পাইপ সংযোজন, পাইপ লাইনের দিক পরিবর্তন, প্রধান পাইপ লাইন থেকে শাখা লাইন বের করা, বড় আকারের পাইপের সঙ্গে ছোট আকারের পাইপের সংযোজনে নানা প্রকার সাজসরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। এ সরঞ্জামগুলোকেই পাইপ ফিটিংস বলে।
২০ বছর আগে বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট পাইপের প্রায় ৭০ ভাগ চীন, ভারত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হতো। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন, এখন দেশেই ব্যবহৃত পাইপের প্রায় ৯০ ভাগ উৎপাদন হয়।
উন্নয়ন প্রকল্প, নগরায়ণ, মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে দেশে পাইপের চাহিদা অনেক গুণ বেড়েছে, যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। এছাড়া বর্তমানে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, গ্রামের মানুষের নগরমুখীতাসহ বিভিন্ন কারণে কৃষিজমির পরিমাণ দিনদিন কমে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জমিতে ফলন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ছোট কারখানা, হোটেল, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি জায়গায় গ্যাস সরবরাহের জন্য বর্তমানে সিলিন্ডার বেশি ব্যবহার হয়। মাঝেমধ্যেই গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণের ফলে নানা দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা এড়াতে বাসা বা প্রতিষ্ঠানের নিচে গ্যাস চেম্বার স্থাপন করে বিশেষ পাইপের মাধ্যমে রান্নাঘরে বা প্রয়োজনীয় জায়গায় গ্যাস পরিবহনের পদ্ধতি জনপ্রিয় হলে দেশজুড়ে পাইপের ব্যবহার আরো বাড়বে।
বাংলাদেশে পাইপের মোট বাজার বার্ষিক প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা, যার মাঝে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার পাইপ আমদানি করতে হয়। এ খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ২০ শতাংশ।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ আরএফএল পাইপের ব্যবসায় আসে ১৯৯৮ সালে। আহসান খান চৌধুরীর হাত ধরে তাদের প্রথম কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। কারখানাটির অবস্থান নরসিংদীর পলাশে, বাগমারা নামক এলাকায়। প্রতিষ্ঠাকালে ৫০ হাজার বর্গফুট আয়তনবিশিষ্ট কারখানাটিতে কাজ করতেন ১০০ জন। বর্তমানে আরএফএলের পাইপ-ফিটিংসের দুটি কারখানা আছে, নরসিংদীর প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাকের্র নিজস্ব কারখানায় আরএফএল পাইপ ও ফিটিংসের পণ্যগুলো উৎপাদন হয়। পাশাপাশি শিগগিরই আরেকটি কারখানা শুরু হতে যাচ্ছে।
বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গ্যাস ও দক্ষ শ্রমিক
কারখানা নির্মাণের সময় আরএফএলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গ্যাস ও দক্ষ শ্রমিক। ব্যক্তিগত বিনিয়োগ থেকে আসা ইকুইটি ও ব্যাংক লোনের মাধ্যমে অর্থের সংস্থান করা হয়েছিল। পরে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হয় এবং নতুন কর্মীও নিয়োগ করা হয়। শ্রমিকদের কমপ্লায়েন্স ও দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। শ্রমিকদের সুবিধার্থে কারখানায় ভর্তুকি মূল্যে খাবার দেয়া হয়, পাশাপাশি কর্মীদের সন্তান ও পরিবারের জন্য রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও স্কুল।
বর্তমানে আরএফএলের প্লাস্টিক কারখানায় কোনো বিদেশী কর্মচারী নেই। সম্পূর্ণ বাংলাদেশী দক্ষ কর্মীদের মাধ্যমে আরএফএল দেশজুড়ে নিজেদের মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের ব্যবস্থা করেছে, যা দেশের কর্মসংস্থানে রেখেছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। বর্তমানে আরএফএলের কারখানায় কর্মরত ১ হাজার ১৫০ জন।
কারখানা শুরুর সময় আরএফএলের প্রথম পণ্য ছিল হ্যান্ড টিউবওয়েলের দেড় ইঞ্চি পাইপ। বর্তমানে তারা পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), হাইডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপাইলিন র্যানডম (পিপিআর), ক্লোরিনেটেড পলিভিনাইল ক্লোরাইড (সিপিভিসি), সফট পিভিসি বা ফ্লেক্সিবল পিভিসি, এমএস ও জিআই ক্যাটাগরিতে পাইপ উৎপাদন করে, যা আরএফএল, সুলভ, ফ্যালকন ও ভিগো ব্র্যান্ডে বাজারজাত করা হয়।
উন্নত কাঁচামাল ও ইউরোপীয় প্রযুক্তি
দুটি কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ লাখ ৯২ হাজার টন। পাইপ ও ফিটিংস উৎপাদনের জন্য ১৫০টি এক্সট্যাকশন ও ৪০০টি ইনজেকশন মোল্ডিং মেশিন রয়েছে কারখানায়; যা ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছে। উৎপাদিত বিভিন্ন ক্যাটাগরির পাইপের দাম ৬ টাকা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে।
উন্নত কাঁচামাল ও ইউরোপিয়ান প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি হওয়ায় আরএফএল পাইপ ও ফিটিংস অত্যন্ত টেকসই ও মানসম্মত। সহজে এই পাইপ-ফিটিংস ভাঙে না, পাশাপাশি আরএফএলের পণ্য উচ্চ চাপ নিতে সক্ষম। আরএফএল পাইপ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব প্রতিরোধী ও সিসামুক্ত। এছাড়া এ পাইপগুলোয় শ্যাওলা জমে না, ফলে পানি পরিবহন ও সেচ প্রকল্পে ব্যবহারে আরএফএল বিশ্বস্ততার জায়গা দখল করেছে। পণ্যগুলো বিএসটিআই, আইএসও এবং ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী উৎপাদন হয়। এছাড়া আরএফএলের কোয়ালিটি চেকিং ল্যাব দেশের অন্যতম আধুনিক ল্যাব, যেখানে বিশ্বের সর্বাধুনিক মান নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। ল্যাব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই কেবল এসব পণ্য বাজারজাত করা হয়।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট পাইপের প্রায় ৭০ ভাগ পিভিসি। দীর্ঘস্থায়ী, পরিবেশবান্ধব ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এইচডিপিইর চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। আরএফএল এক্সক্লুসিভ শোরুম, রেইনবো শোরুম ও প্রায় ১০ হাজার খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সারা দেশে পাওয়া যাচ্ছে আরএফএল পাইপ ও ফিটিংস। পাশাপাশি অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয় সাইট অথবা ডট কমের মাধ্যমেও এ পণগুলো অর্ডার করা যায়।
যেখানে অতীতে দেশের পাইপ ফিটিংসের বাজার ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর, সেখানে এখন দেশেই মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্লাস্টিক পাইপ-ফিটিংস রফতানি হচ্ছে বিদেশেও। যুক্তরাষ্ট্র, নেপাল, ঘানা, ভুটান, ব্রনেই ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশে আরএফএল পাইপ ও ফিটিংসের পণ্য নিয়মিত রফতানি করছে। সম্ভাবনাময় শিল্পোন্নত দেশ গড়ার জন্য প্রতিবন্ধকতা দূর করে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে পাইপ-ফিটিংস রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিও হবে সমৃদ্ধ, এমনটাই আশা করে আরএফএল।