ফেনীর ভিশন টাচ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের স্বত্বাধিকারী আবুল বাশার। বন্যার পানি ঢুকে তার কারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সপ্তাহখানেক ধরে বন্ধ কারখানা, যার কারণে চলতি মাসের ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে পারেননি তিনি। এছাড়া কারখানা ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে গত মাসে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে দেশের পরিস্থিতি। এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। ওই সময়কার অস্থিরতা ও চলমান বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ অবস্থায় তারা ঋণের কিস্তি ঠিকঠাকভাবে পরিশোধ করতে পারছেন না। এমনকি নতুন করে ঋণও নিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তারা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ এবং দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এখনো ব্যবসা-বাণিজ্যে পূর্ণ গতিশীলতা ফিরে আসেনি। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। সহসা ব্যবসায় গতিশীলতা ফিরে না এলে অনেকের উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ারও রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
আবুল বাশার বলেন, ‘আমাদের এ অঞ্চলে যে বন্যাটি হয়েছে, বিগত ১০০ বছরেও এমন বন্যা হয়নি। এ বন্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে এ এলাকার মানুষজনের আগে থেকে ধারণা ছিল না, যার কারণে আমরা ব্যবসায়ীরাও সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারিনি। বর্তমানে ফেনী শহরে যে ব্যবসায়ীরা আছেন তারা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কারখানাটি রাস্তা থেকে প্রায় তিন ফুট উঁচুতে। এত উঁচুতে থাকা সত্ত্বেও আমাদের কারখানায় প্রায় দুই ফুটের মতো পানি ছিল এখানে প্রায় অনেক মেশিনারিজ নষ্ট হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে আমাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুরোপরি বন্ধ ছিল। আমাদের যে যন্ত্রপাতিগুলো ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, সেগুলো রেডি করতে প্রায় এ সপ্তাহ চলে যাবে। যার কারণে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ফ্যাক্টরি খরচ সেগুলো আর উঠবে না। আমাদের একটি ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট থেকে লোন নেয়া ছিল। ২৪ আগস্ট সেটার কিস্তি দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দিতে পারিনি। তবে তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। তারা আমাদের সময় দিয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, বৈশ্বিক ব্যবসার ৯০ শতাংশ, কর্মসংস্থানের ৭০ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫০ শতাংশই এ খাতের অবদান। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান এখনো বেশ কম। এসএমই খাতের ওপর কভিডের প্রভাব নিয়ে করা লাইট ক্যাসেল পার্টনার্সের এক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ইন্দোনেশিয়ার জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ৫৯ শতাংশ। একইভাবে কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৫২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৪০ শতাংশ এবং ভারতের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ। এ বছরের মধ্যে এটি ৩২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশই হচ্ছে এসএমই খাতের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ এর তথ্যানুসারে, গত ১০ বছরে দেশের সিএমএসএমই খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। যদিও এ সময়ে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৪ সালে দেশের সিএমএসএমই খাতে মোট ১ লাখ ৯১০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ বা ৩ হাজার ৯৩৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ঋণ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। ২০১৫ সালে এ খাতের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা এবং নারী উদ্যোক্তারা পেয়েছেন ৪ হাজার ২২৭ কোটি টাকার ঋণ। ২০১৬ সালে সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তারা পেয়েছেন ৫ হাজার ৩৪৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ঋণ। ২০১৭ সালে নারী উদ্যোক্তাদের দেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা এবং এ খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫১০ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ৫ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার ঋণ। ২০১৯ সালে বিতরণ করা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ঋণের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ৬ হাজার ১০৯ কোটি টাকা।
কভিডের বছর ২০২০ সালে দেশে সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬ হাজার ৮০৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তারা পেয়েছেন ৮ হাজার ২৪৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২০২১ সালে এ খাতের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের দেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮০১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০২২ সালে ২ লাখ ৪২ হাজার ৩৭৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে সিএমএসএমই খাতে এবং এর মধ্যে নারীরা পেয়েছেন ১৩ হাজার ৭৪৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩ সালে সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪ হাজার ২৪২ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের দেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। গত ছয় বছর সিএমএসএমই খাতের যে পরিমাণ ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল সেটি পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে দেশের দুই কোটির বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই এসএমই খাতে। অবশ্য বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার ও উদ্যোক্তারা বলছেন, এসএমইর সম্ভাবনার অনেকটাই এখনো কাজে লাগানো হয়নি। অর্থনীতির বর্তমান সংকট কাটাতে এ খাতই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মায়ের দোয়া হ্যান্ডিক্রাফটসের স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি তার ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিসিক গাজীপুর শাখা থেকে কিছু ঋণ নিয়েছিলেন। ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতিতে সে ঋণ তিনি এখন পরিশোধ করতে পারছেন না।গত মাসের কিস্তি দিতে না পারায় তিনি এখন হতাশায় রয়েছেন। ঋণ পরিশোধ ও পুনরায় তার ব্যবসা চালু করার বিষয়ে এখন কী করবেন তার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
চট্টগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রাজীব দত্ত। দীর্ঘদিন ধরে আইপিএস, ব্যাটারিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য সংযোজন ও পার্টস তৈরির কারখানা স্থাপন করেছেন কর্ণফুলী নদীর অপর প্রান্তের মইজ্জারটেক এলাকায়। পাওয়ারসেল ইলেকট্রনিকস নামের কারখানাটিতে সর্বমোট কাজ করে ১৭ জন। আগে প্রতিদিন ১৫-২০টি আইপিএস সিস্টেম বাঁধাইয়ের কাজ হলেও বর্তমানে সেটি নেমে এসেছে পাঁচ-ছয়টিতে। গ্রীষ্মকালে এ কারখানায় দৈনিক ৫০টি পর্যন্ত আইপিএস তৈরি হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক দেশীয় সংকটের মধ্যে বিক্রি অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন ভাতা দিতে পারছেন না তিনি। সবচেয়ে বড় সংকটের বিষয় হচ্ছে ঋণদানকারী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেয়া হলেও কিস্তি পরিশোধে বেগ পেতে হচ্ছে। আদায়কারীরা কারখানা, অফিস ও শোরুমে এসে বসে কিস্তির টাকা আদায়ে বাধ্য করছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদহার কমানো ও যারা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন এসএসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক মির্জা নূরুল গণী শোভন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কটেজ ইন্ডাস্ট্রিগুলো বর্তমানে একটি নাজুক অবস্থায় আছে। আমি মনে করি, এটার সুরাহা করার জন্য বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবেন। সেক্ষেত্রে সুদহারকে এসএমইগুলোর জন্য কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি যারা ঋণের কিস্তি খেলাপি হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার কীভাবে ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’