১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম টেস্টটিউব বেবির জন্ম হয়। প্রথমে একজন গাইনিকোলজিস্ট এবং একজন ফিজিওলজিস্ট এটা নিয়ে কাজ শুরু করেন। এর আগে আরো কয়েক বছর অনেকগুলো সাইকেল নিয়ে কাজ করলেও সফলতা আসে ১০১তম সাইকেলে। তবে বাংলাদেশে ২০০১ সালে প্রথম টেস্টটিউব বেবির জন্ম নেয়। আইভিএফ(ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) চিকিৎসাপদ্ধতি বিশ্বে সুবর্ণ জয়ন্তীতে পদার্পণ করছে, অপরদিকে বাংলাদেশের এ পদ্ধতির রজত জয়ন্তী। প্রতিবছর ২৫ জুলাই বিশ্বব্যাপী আইভিএফ দিবস পালন করা হয়।
আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন হচ্ছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে অনেক নিঃসন্তান নারী সন্তান ধারণের সুযোগ পান। এছাড়া সারোগেসি বা গর্ভ ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
আইভিএফকে সহায়ক প্রজনন পদ্ধতির (এআরটি) সর্বাধিক পরিচিত ধরন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইভিএফে ওষুধ ও অস্ত্রোপচার পদ্ধতির মাধ্যমে শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণু নিষিক্ত করা হয়, পরে সেই নিষিক্ত ডিম্বাণু আবার নারীর জরায়ুর ভেতরে স্থাপন করতে সাহায্য করা হয়।
আইভিএফ মানে হচ্ছে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন। ভিট্রো মানে বাইরে। এ পদ্ধতিতে বাইরে ডিম্বাণু ফার্টিলাইজ করা হয়। স্পাম ও ওভাম এ দুটির ফার্টিলাইজেশনে যে এমব্রায়ো হয় তার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মানুষের জন্ম হয়। এ পদ্ধতিতে ফার্টিলাইজেশনটা বাইরে করা হয়। বাইরে করে এমব্রায়োটা তৈরি করা হয়। এরপর ইউটেরাসের ভেতরে এটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়। তারপর ইউটেরাস ইমপ্লান্টেশন হয়ে ধীরে ধীরে বড় হয়। কখনো কখনো বাইলেটারাল টিউবাল ব্লক থাকে। দুটি টিউবই যদি কারো বন্ধ থাকে, কাটা যায় বা কোনো রকম সংক্রমণ থাকে তাহলে সে গর্ভধারণ করতে পারে না। যেহেতু টিউব বন্ধ তাহলে ফার্টিলাইজেশন হবে না। সেখান থেকে এ চিন্তা এসেছে যে বাইরে ফার্টিলাইজেশনটা কীভাবে করা যায়? প্রাণীদের নিয়ে এ পদ্ধতিটি আরো আগেই ছিল। একসময় মানুষের ক্ষেত্রে এটি করার জন্য চিন্তা শুরু হয়। প্রথমে একজন গাইনিকোলজিস্ট এবং একজন ফিজিওলজিস্ট এটা নিয়ে কাজ শুরু করেন। অনেকগুলো সাইকেল তারা করেছেন। একশটিতে কোনো ফল আসেনি। ১০১তম সাইকেলে সফলতা আসে। এ পদ্ধতিতে অনেক মোডিফিকেশন হয়েছে। ১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম টেস্টটিউব বেবি জন্ম নেয়। তার নাম লুইস ব্রাউন। ইংল্যান্ডের একশতম শিশু জন্মগ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়।
সাধারণভাবে এ পদ্ধতিতে শুরুতে কিছু ওষুধ নিয়ে বেশকিছু ডিম্বাণুকে উপযুক্ত ও নিষিক্ত হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। এরপর চিকিৎসকরা সেই ডিম্বাণুকে শরীরের বাইরে বের করে আনেন এবং ল্যাবে সেটার সঙ্গে শুক্রাণুর মিশ্রণ ঘটানো হয়। তারপর যখন ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে যায়, সেটা আবার নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
সন্তান না থাকলে স্বামী-স্ত্রী দুজনই হতাশায় ভোগেন। ইনফার্টিলিটি সমস্যা স্বামী-স্ত্রী দুজনের কারণেই হতে পারে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। যার কারণে অনেকেই ইনফার্টিলিটি সমস্যায় ভুগে থাকেন। এছাড়া যেসব নারী ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিওসিস বা পলিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে ভুগছেন তাদের মধ্যেও বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দেখা যায়। বন্ধ্যাত্বের সমস্যা শুধু নারী নয়, পুরুষের মধ্যেও দেখা যায়।
শুধু বাংলাদেশে না, বিশ্বব্যাপীই বন্ধ্যাত্বের সমস্যা বাড়ছে। বন্ধ্যাত্বের সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে পরিবেশগত পরিবর্তন। আরেকটি বিষয় হলো নারীর বয়স। আজকাল অনেক নারীই পড়াশোনা শেষ করে বা বেশি বয়সে ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর বিয়ে করেন এবং গর্ভধারণ করেন। ৩০ বছর পার হয়ে গেলেই মেয়েদের ওভারি ডিজার্ভ বা ডিম্বাশয়ের পরিমাণ কমতে থাকে। তখন গর্ভধারণ করতে গেলে সমস্যা হয়। আরেকটি বিষয় থাকে তরুণ বয়সে ক্রনিক মেডিকেল ডিজওর্ডার বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যাধিতে ভোগেন। যেমন হাইপোথাইরয়েডিজম, ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশন। বর্তমান সময়ে ব্যাপক পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, যা নারী-পুরুষের সন্তান জন্ম দেয়ার ওপর প্রভাব ফেলছে। যার কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি আইভিএফ হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশে অর্থনৈতিক কারণে ততটা বেশি হচ্ছে না। এ চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক ব্যয়বহুল।
বাংলাদেশে আইভিএফ কিংবা টেস্টটিউব বেবি নিয়ে এখনো অনেকের মাঝে অনেক কুসংস্কার বা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। সেগুলো হলো: আইভিএফ মুসলমানের জন্য ধর্মীয় বাধার সৃষ্টি করে। আইভিএফ সন্তান দম্পতির নিজস্ব সন্তান নয়। আইভিএফ সন্তান টেস্টটিউবে জন্ম হয়। আইভিএফ অনেক কষ্টদায়ক একটি প্রক্রিয়া। আইভিএফে সন্তানের জন্মগত ত্রুটি হয় বেশি এবং তারা নিজেরাও ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যায় ভোগে। প্রথম আইভিএফে সফল না হলে পরবর্তী সময়ে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা আর থাকে না। আইভিএফের মাধ্যমে সবসময় যমজ কিংবা ট্রিপল বেবি হয়। আইভিএফে শতভাগ গর্ভধারণের গ্যারান্টি রয়েছে।
এ ধরনের কুসংস্কারের জন্য কিছু মানুষ এখনো এত উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আইভিএফ প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর করার জন্য যে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তার মাঝে প্রথমত জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের প্রচারমাধ্যম যেমন পত্রিকা, ম্যাগাজিন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিভি প্রোগ্রামগুলোয় আইভিএফ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে সঠিক ধারণা দেয়া যেতে পারে।
প্রত্যেক রোগীকে আইভিএফ পদ্ধতির ধাপগুলো এবং এর মাধ্যমে গর্ভধারণের সম্ভাবনা ও জটিলতা নিয়ে কাউন্সেলিং করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব হাসপাতালে বন্ধ্যাত্ব রোগীদের জন্য ইনফার্টিলিটি কর্নার থাকা প্রয়োজন। এতে সঠিক রোগী নির্বাচন করে চিকিৎসা দেয়া যায় এবং প্রয়োজনে সঠিক চিকিৎসকের কাছে রেফার করা যায়।
দেশের সব হাসপাতালে এ সুবিধা এখনো চালু হয়নি। শুধু ইনফার্টিলিটি সেন্টারগুলোয় এ সেবা পাচ্ছেন তারা। তবে বর্তমানে দেশে অনেক আইভিএফ সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেক গাইনি বিশেষজ্ঞ বন্ধ্যাত্ব বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। অনেকে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বন্ধ্যাত্ব রোগের ওপর ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে আসছেন নিজের দেশে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার জন্য। এতে নিঃসন্দেহে বোঝা যাচ্ছে ভবিষ্যতে আমাদের দেশ আইভিএফ চিকিৎসায় কোনো অংশে অন্য দেশগুলো থেকে পিছিয়ে থাকবে না। দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন উন্নত পদ্ধতির ট্রেনিং নেয়া সুলভ/সহজ হয়েছে, এছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইভিএফ ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
আইভিএফ গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। আইভিএফের অনেকগুলো পর্ব থাকে। সেগুলো পূরণ করতে কয়েক মাস লাগে। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম চেষ্টায় বাবা-মা হওয়ার সুযোগ মিলে। তবে কিছু ক্ষেত্রে একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়।
তার পরও শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয় বলেই মন্তব্য চিকিৎসকদের। কারণ প্রতিটি মানব শরীর আলাদা এবং আইভিএফ সবার ক্ষেত্রে একই রকম কাজ করে না।
বর্তমানে দেশে বন্ধ্যাত্বের হার ২০ শতাংশ। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো জরিপ নেই। দেখা যায়, এসব নিঃসন্তান দম্পতির মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী এবং একইসংখ্যক স্বামীদের শারীরিক সমস্যা থাকে। ১০ ভাগ ক্ষেত্রে দুজনেরই সমস্যা থাকে। বাকি ১০ ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা অজানা থেকে যায়। নারীর কর্মজীবন, দেরিতে সন্তান গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ দূষণও বর্তমানে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে বেশ প্রভাব তৈরি করছে। বাংলাদেশে আইভিএফ সেবা প্রদান শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে, সেই ১৯৯৮ বা ২০০০ সাল থেকে। কিন্তু সে সময় থেকেই সবার কাছে সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি এ সেবা। সম্প্রতি বাংলাদেশের বেশকিছু হাসপাতাল এ সেবা প্রদান শুরু করেছে।
আইভিএফ নিয়ে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হচ্ছে ইনফার্টিলিটি সেন্টার মানেই আইভিএফ। কিন্তু আইভিএফ সেন্টারে নিঃসন্তান দম্পতিদের অনেক চিকিৎসা দেয়া হয়। বন্ধ্যাত্বের কারণ বুঝে সেখানে এসব চিকিৎসা দেয়া হয়। বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ধাপটি আইভিএফ। অনেক নিঃসন্তান দম্পতির এ সেবা পর্যন্ত যাওয়ারই প্রয়োজন পড়ে না। তার আগেই অন্যান্য সেবায় তারা সন্তান ধারণে সক্ষম হন। বর্তমানে দেশে ১০০ জনকে আইভিএফ চিকিৎসা দেয়া হলে ৩৫-৪০ শতাংশ সফল গর্ভধারণের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
আইভিএফ চিকিৎসা এখনো বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। প্রায় ১৫-২০ দিনের একটা ট্রিটমেন্ট থাকে। সেক্ষেত্রে খরচ লাখের ওপর চলে যায়। তবে আশার কথা হচ্ছে এখন দেশের সরকারও এ বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে। সরকার তাদের বেশ ভালো ফান্ড দিচ্ছে, যেখানে চেষ্টা করা হচ্ছে কীভাবে রোগীদের খরচ কমিয়ে এন তাদের এ সেবা দেয়া যায়।
মানুষ সবসময় বংশপরম্পরায় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। গর্ভধারণ মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে না পারায় দম্পতিদের পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি ছয় দম্পতির মধ্যে একটি দম্পতি বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভোগেন। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা মানবদেহের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান দিয়েছে। বর্তমানে ইনফার্টিলিটি সমস্যারও সমাধান রয়েছে। সন্তান ধারণে প্রাথমিক বেশকিছু প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলেও সমাধান দিতে পারে আইভিএফ।