দূর থেকে তার নাম শুনেছি। তখন বাংলাদেশের বাইরে থাকতাম, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) চাকরির সুবাদে ওয়াশিংটনে। সে হিসেবে বাংলাদেশের পত্রিকা মারফত জানতাম যে তিনি তখন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। সম্মুখ পরিচয় প্রথম হয় ড. ফখরুদ্দীন আহমদের ছেলের বিয়েতে। সেখানে ফখরুদ্দীন সাহেব পরিচয় করিয়ে দিলেন মির্জ্জা আজিজের সঙ্গে। যোগাযোগটা হয় আমাদের পরে। ঢাকায় এসে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (পিআরআই) ওনাকে সবসময় ডেকেছি। তিনি এসেছেন। ওনার মতো আরো যারা সহকর্মী ছিলেন, তারাও আসতেন।
যখনই আমাদের প্রোগ্রাম হয়, উনি আসেন। তিনি বলতে গেলে এককভাবেই গবেষণার কাজ করে যান। কোনো সংগঠনের সঙ্গে সেভাবে জড়িত নন। শিক্ষকতার সঙ্গেই জড়িত বলব। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন। তার প্রতিবেদন কিংবা অবজারভেশনগুলোতে আগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এসক্যাপে থাকার কারণে সংকট মোকাবেলার অভিজ্ঞতা তার সমৃদ্ধ। ব্যাংককে থাকার সময় এ অঞ্চল সম্পর্কে তার গভীর ধারণা তৈরি হয়। ওটাকে উনি বক্তব্যের মধ্যে প্রায়ই নিয়ে আসেন। ঘটনার প্রবাহ থেকে শেখার অভিজ্ঞতাটা তিনি খুব সুন্দরভাবে তুলে আনতে পারেন।
তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চারিত্রিক দৃঢ়তা। তাকে নিয়ে কোনো বিতর্ক কোথাও শুনিনি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে থাকার সময়ও কোনো রকমের গুজব শুনিনি। সবসময় পরিচ্ছন্ন, সবসময় ফোকাসড। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি দুই বছর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। সেই সময়ও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছেন। উনি কিন্তু খুব সাদাসিধে। তিনি আহামরি বক্তৃতায় যান না, কিন্তু খুব গভীরভাবে জিনিসটাকে বিশ্লেষণ করেন। একটা বিষয়ের জন্য আমি দুজনকে ক্রেডিট দেব। ফখরুদ্দীন সাহেবকে এবং ওনাকে। সেটা হচ্ছে আমাদের হাতিরঝিলের প্রকল্পটা। হাতিরঝিল একটা সময় সবচেয়ে অনিরাপদ জোন ছিল। মানুষ সন্ধ্যা হলে আর হাঁটত না নিরাপত্তার কারণে। মোটামুটি পরিত্যক্ত ছিল। অনেকে অনেক রকমের পরিকল্পনা করছিল এটাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার জন্য। এখানে একটা হোটেল হিলটন করার কথা ছিল। বিএনপি সরকার ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গরা চেয়েছিল হাতিরঝিলটাকে দখল করে নিয়ে সুন্দর একটা হোটেল করে ফেলবে। এটাকে তারা ক্যানসেল করে দেয়।
ওই সময় টাকার খুব অভাব। খাদ্য, চাল, ডাল ও সব জিনিসের দাম বেড়ে গিয়েছিল। তেলের দামও বেড়ে গিয়েছিল অনেক। খাবার পাওয়া যাচ্ছিল না বিদেশে টাকা দিয়েও। সেই সংকটটাকে তারা মোকাবেলা করেছেন। সেখানে ব্যালান্স অব পেমেন্টেও রকম কোনো অসুবিধা হয়নি।
এ সময়ের মধ্যেও তারা হাতিরঝিলের প্রকল্পের জন্য পুরো বাজেট বরাদ্দ দিয়েছেন। আমাকে ফখরুদ্দীন সাহেব বলেছেন, নিউইয়র্কে জেনারেল অ্যাসেম্বলি সেশনে হিলটনের চেয়ারম্যান পুনরায় বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ জানান। তার জবাব ছিল স্পষ্ট। আমরা এটাকে আমাদের মতো করেই করব। সুন্দরভাবে পরিকল্পিত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলব। যদিও শেষটা আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী করেছেন। কিন্তু শুরুটা ছিল প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ। শুরুটার জন্য মির্জ্জা আজিজ সাহেবকে অবশ্যই গুরুত্ব দেব। তিনি তখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। শত অসুবিধা সত্ত্বেও তহবিলের ব্যবস্থা করেছেন।
তিনি সাধারণ মানুষ। থাকেনও সাধারণভাবে। তিনি উত্তরার বাড়িতে থাকেন। সরকার থেকেই হয়তো প্লটটা দেয়া হয়েছিল। সেখানেই থাকেন। কোনো আতিশয্য নেই। সৎ ও সাধারণ জীবন যাপন করেন। বাইরে সারা জীবন থাকার পরে উনি দেশে চলে এসেছেন। হয়তো চিরকালের মতো থাকবেন। সাধারণত যারা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যায়, বিদেশে বহু বছর চাকরি করে, তারা আর ফেরে না। উনি ফিরেছেন। সেটাও একটা উল্লেখযোগ্য দিক আমি মনে করি। প্রশাসক হিসেবেও ওনার প্রশিক্ষণ আগে থেকেই ছিল। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য ছিলেন। সেই প্রশিক্ষণটা তিনি প্রয়োগ করেছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। দুটোতেই খুব গভীরভাবে প্রতিটি জিনিস দেখে অনুমোদন দিতেন। উনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। নিজেকে একেবারেই সমালোচনার বাইরে রাখতে পেরেছিলেন তিনি, কেউ কিছুই বলতে পারবে না। নতুন সরকার আসার পর বড় রকমের প্রশাসনিক রদবদল হয়। উনি মুহিত সাহেবকে একটা পরামর্শ দিয়েছিলেন। যত পরিবর্তন হচ্ছে হোক, ফাইন্যান্স সেক্রেটারিকে যেন অপরিবর্তিত রাখা হয়। এ কারণে ওই একটা পদে পরিবর্তন হয়নি। বাকিগুলোয় পরিবর্তন এসেছে। তিনি মেধার খুব প্রাধান্য দিতেন। যারা ভালো অফিসার, তাদের সবসময় সেভাবে সম্মান দিয়েই কার্য পরিচালনা করতেন।
আমি তার সঙ্গে সরাসরি কাজ করিনি। আমরা পিআরআই থেকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যদি তিনি চান, আমাদের অফিস দিয়ে দেব। আমাদের রিসার্চ সাপোর্টও দেব। উনি আমাদের এখানে থাকতে ও কাজ করতে পারেন। কিছুদিন এসেছিলেন। কয়েক মাসের মতো। তারপর আবার অন্যদিকে হয়তো ব্যস্ত হয়ে গেছেন। পরে আর আসেননি। আমরা চেয়েছিলাম তাকে আরেকটু সম্পৃক্ত করতে। কিন্তু সেটা হয়নি। উনি শিক্ষকতার দিকে চলে গেছেন। কিন্তু উনি সবসময়ই আমাদের পাশে আছেন।
আমাদের একটা অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আছে ডমেস্টিক রিসোর্স মোবিলাইজেশন সেন্টার নামে। সে সেন্টারের একটা বিশেষজ্ঞ দল আছে। তারা ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করে। বেশির ভাগ সদস্যই এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অথবা ফাইন্যান্স সেক্রেটারি ধরনের ব্যক্তিত্ব। মির্জ্জা আজিজ সে দলের এক্সপার্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে এখনো আমাদের সঙ্গে আছেন। সাধারণত কয়েক মাস পরপর অনুষ্ঠান করা হয়। সেখানে তিনি আসেন ও কমিটিকে পরিচালনা করেন। সেখানে আমরা রিসার্চ পেপার উপস্থাপন করি। সেটার ওপর আলোচনা করা হয়। সবাই তাদের মতামত জানায়। এখানে প্রেস থাকে না। উনি সার্বিকভাবে বিষয়টির পরিচালনা করেন। যখন আমরা ডাকি, উনি সবসময় সাড়া দেন।
আমি মনে করি, ওনার সবচেয়ে বড় অবদানটা ছিল অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে। দুই বছর সময় তো একেবারে কম না। তাছাড়া সময়টা বেশ প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ ছিল। সে সময়টায় তারা দুজনই অর্থনৈতিক দিক থেকে পারদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। ফখরুদ্দীন আহমদ সাহেব এবং তিনি। ফলে তারা খুব ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন পরিস্থিতি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, সিডর ও ঝড়ের মতো সংকট পরপর এল। দুবার হয়েছে বন্যা। ফসলের ক্ষতি হয়। বৈশ্বিক বাজারে খাদ্য সংকট চলছে। ভারত চাল দিচ্ছিল না। সব মিলিয়ে সে সংকটকে কাটিয়ে ওঠা ছিল যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু তারা সেটা ভালোভাবেই করেছেন। তারা সফল হয়েছেন প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায়, যেটা এখন আমরা করতে পারছি না। এখনকার অর্থনৈতিক অবস্থা কৃষির দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বন্যা হয়নি, সাইক্লোন হয়নি। সেই অর্থে কিছুই হয়নি। কিন্তু আমরা খারাপ পরিস্থিতিতে আছি। সেদিক থেকে ওই সময়টার সফলতার জন্য তাদের ক্রেডিট দিতেই হবে।
তাদের সময়ে পাবলিক সেক্টরের ব্যাংকগুলো ছিল সবচেয়ে ভালো অবস্থানে। চল্লিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত অবস্থান। লোন রেশিও এবং লোন ঘাটতি কমে আসছিল। সব সূচক ছিল ইতিবাচক। এদিকে রাজস্ব সংগ্রহও সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ২০০৭-০৮ সালে। গভর্ন্যান্সের ইনডিকেটর থেকেও দেখা যায়, দুর্নীতি ছিল না। কেউ বলতে পারবে না, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের কারচুপি ছিল। সেদিক থেকে তারা পরিচ্ছন্ন ও বিজ্ঞ নাগরিক হিসেবেই সুপরিচিত আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। ঠিক সেভাবেই আমরা তাকে স্মরণ করব। দুই বছরের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা এবং তার আগে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান পদে থাকা। এ সময়ে তিনি দেশের জন্যই শ্রম ও মেধা দিয়ে অবদান রেখেছেন। এখনো কাজ করে যাচ্ছেন দেশের জন্য। একজন নিরলস ও ত্যাগী ব্যক্তির দৃষ্টান্ত। তিনি আমাদের মধ্যে আরো অনেক দিন থাকুন। তার অবদান আমরা সবসময় মনে রাখব।
আহসান এইচ মনসুর: নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান