আর্থসামাজিক উন্নয়নে গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের রফতানি খাতে একটি উল্লেখযোগ্য উপাদানের নাম ম্যানুফ্যাকচারিং। এজন্য অবশ্য বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হয় তৈরি পোশাক খাতের দ্রুত বিস্তৃতিকে। ১৯৮৪ সালে মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে গার্মেন্ট রফতানি বাড়তে বাড়তে ২০১৪ সালে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। রফতানি আয়ের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে এখান থেকেই। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান

বাংলাদেশের রফতানি খাতে একটি উল্লেখযোগ্য উপাদানের নাম ম্যানুফ্যাকচারিং। এজন্য অবশ্য বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হয় তৈরি পোশাক খাতের দ্রুত বিস্তৃতিকে। ১৯৮৪ সালে মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে গার্মেন্ট রফতানি বাড়তে বাড়তে ২০১৪ সালে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। রফতানি আয়ের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসে এখান থেকেই। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান তৈরিতেও অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে পোশাক খাতের। বাংলাদেশে পোশাক খাতের এমন উত্থানের কারণে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ বড় পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে ৪০ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে, যাদের ৭০ শতাংশই নারী। উৎপাদনে যুক্ত শ্রমশক্তির ৫০ শতাংশের বেশি এখন এ খাতে কর্মরত এবং উৎপাদনে বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ এ খাতের অবদান। 

গত দুই দশকে বাংলাদেশে উৎপাদন খাতের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তা পোশাক খাতের সফলতারই গল্প। অস্বীকার করার উপায় নেই যে পোশাক খাতের সফলতার গল্প মূলত বিপুল সংখ্যক অদক্ষ শ্রমিকের মজুদের ওপর নির্ভর করেছে। তবে বিবেচনায় রাখতে হবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও চীনের মতো বাংলাদেশের এশীয় প্রতিবেশী এবং প্রতিযোগী দেশগুলোতেও একই রকম অদক্ষ কর্মী রয়েছেন। তার পরও বাংলাদেশ আজও কীভাবে তুলনামূলক সুবিধা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং রফতানি প্রবৃদ্ধি উপভোগ করেছে তা বেশ বিস্ময়কর। এভাবে স্বল্পমূল্যে শ্রমিক পাওয়া যখন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন কিছু চ্যালেঞ্জও এসেছে। যেমন ব্যবসা করার উচ্চমূল্য, দুর্বল অবকাঠামো, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক অসন্তোষ। তা সত্ত্বেও স্থানীয় খাতটি বেশ বিস্তৃত হয়েছে। 

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত বিষয় এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার বিষয়ে বেশ উদ্বেগ রয়েছে। গত কয়েক বছরে বিষয়গুলো এ খাতের ভবিষ্যতের জন্য আরো বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। এর পেছনে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে, যেখানে হুমকি আকারে বলা হয়েছে—কর্মপরিবেশ বজায় রাখা না হলে পশ্চিমা দেশগুলোয় বড় আধিপত্যের জায়গা বাতিল করে দেয়া হবে। মূল্য প্রতিযোগিতার তুলনায় এখন গুণগত প্রতিযোগিতা বেশি অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে উঠছে। আর পণ্য কতটা গুণগত মানসম্পন্ন সেটা দিয়েই বোঝা যায় শ্রমিকরা উৎপাদনের মুহূর্তে কত ভালোভাবে জীবনযাপন করেন। এসব উদ্বেগকে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে নিতে হবে, যা দিয়ে বিশ্ববাজারে এ খাতের সুনাম তৈরি করার সুযোগ পাওয়া যাবে। অন্যান্য অনেক কিছুর মধ্যে এখানে পোশাক খাতে শ্রমিকসংক্রান্ত বিষয়গুলো সাবধানতার সঙ্গে মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে। কিছু বিষয় যেমন বেতন. কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ফ্রিঞ্জ বেনিফিট, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ইত্যাদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। এ খাতকে আরো বেশি টেকসই করতে হলে বর্তমানে পোশাক খাতে যে ধরনের শ্রমচর্চা রয়েছে তা উন্নত করতে হবে। শ্রমিকের পরিস্থিতি উন্নত করার বিষয়টি তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পাশাপাশি গার্মেন্ট পণ্যে আরো বেশি মূল্য সংযোজনের জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণেও বিনিয়োগ করতে হবে। বিজিএমইএ ও সরকারকে এক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে হবে, এ-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলোর সহায়তায় কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখন একটি বাঁক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু এদিকটাতেই মনোযোগ দিতে হবে—কীভাবে বাংলাদেশ তার তুলনামূলক সুবিধাগুলোকে কাজে লাগাতে পারে। অক্ষুণ্ন রাখতে পারে ধারাবাহিক সাফল্যের গল্পকে। বিপুল পরিমাণ অদক্ষ কর্মীদের ওপর ভরসা করে থাকা কিংবা সনাতন পদ্ধতিতে কাজ করাটা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে এখানকার সুবিধাগুলো মূলত নিশ্চল তুলনামূলক সুবিধা (স্ট্যাটিক কমপারেটিভ অ্যাডভান্টেজ)। অর্থাৎ অন্যান্য দেশের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, ক্রমবর্ধমান কঠোর কমপ্লায়েন্স ইস্যু এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি বিবেচনা করে আগামী দিনগুলোয় নিশ্চল তুলনামূলক সুবিধাকে বজায় রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। তাই সেক্টরের লক্ষ্য হওয়া উচিত সচল তুলনামূলক সুবিধা তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে এ খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে। শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদন লাইনে নতুন প্রযুক্তি প্রবর্তনের মাধ্যমে উচ্চমূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসায়িক খরচ কমিয়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। 

এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে তুলনামূলক সুবিধাকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হিসেবে ধরে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্যবসায় খরচ অনেক বেশি। তাই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বজায় রাখতে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্য সুযোগ-সুবিধা কমানোর একটি প্রবণতা আছে। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের কল্যাণের খাতিরে বাংলাদেশে ব্যবসার ব্যয় কমানোটা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ধরনের নানা ধরনের খরচে গার্মেন্ট শিল্প বাঁধা পড়ে আছে। উচ্চ লিডটাইম এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বন্দরগুলোর অদক্ষতা এবং এ খাতের পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর অকার্যকরতা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও মূলধন, উচ্চ সুদহার, দুর্বল অবকাঠামো, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ব্যবসার নানা অদৃশ্য খরচ ইত্যাদি রফতানির ক্ষেত্রে বড় বাধাগুলোর অন্যতম। দিনশেষে এ বিষয়গুলোই বাংলাদেশের গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি ও রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নির্ধারণ করবে। তাই এ সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে কৌশলগত পরিকল্পনা নিতে হবে এবং সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যদিও গবেষণা থেকে পাওয়া ব্যবসা-প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসা-দারিদ্র্য সম্পর্কের ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু বলার সময় এখনো আসেনি। অন্তত এটুকু বলা যায় যে তৈরি পোশাক রফতানি দারিদ্র্য দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মাধ্যমে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। রফতানি খাত প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়েছে কিনা এবং সে প্রবৃদ্ধি কতটুকু দরিদ্র জনগোষ্ঠী পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ ধরনের চরম বিতর্কিত বিষয়ের গভীরে না গিয়েও এটি বলা যেতে পারে যে তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ব্যাপক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা ও দারিদ্র্যের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে। আর শ্রমিকদের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো কতটা সতর্কতার সঙ্গে ও যথাযথভাবে মীমাংসা করা হচ্ছে, তার ওপর এ ইন্ডাস্ট্রির স্থায়িত্ব নির্ভর করছে।

[লেখকের Our garment industry at a crossroad শীর্ষক রচনার অনুবাদ। শিরোনামটি বদল করা হয়েছে]

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক

আরও