ভোক্তা পর্যায়ে ভ্যাট কমাতে হবে

করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বাজারে অস্থিরতা চলছে। ব্যবসা টিকে রাখতে বাজেটে কেমন সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন আলোচনা হচ্ছে সেটি নিয়েও। এসব বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন স্বপ্ন সুপার মার্কেটের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

করোনা মহামারী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বাজারে অস্থিরতা চলছে। ব্যবসা টিকে রাখতে বাজেটে কেমন সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন আলোচনা হচ্ছে সেটি নিয়েও। এসব বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন স্বপ্ন সুপার মার্কেটের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

করোনা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ক্ষতির মধ্যে আছেন ব্যবসায়ীরা। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবারের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

করোনার কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারেও পণ্যমূল্য বেড়েছে। এর মধ্যে পণ্য ক্রয়ের ওপর ব্যবসায়িক পর্যায়ে (ট্রেড ভ্যাট) শতাংশ ভ্যাট আছে, যা সুপারশপের ভোক্তাদের দিতে হয়। আমাদের ক্রেতা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি ভ্যাটের চাপ তাদের ওপর প্রতিকূল প্রভাব তৈরি করবে। আবার আমরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে ক্রয় করি, তখন সরকারকে ভিডিএস টিডিএস দিতে হয়। একটা হচ্ছে ভিডিএস (ভ্যাট ডিডাকশন অ্যাট সোর্স বা উৎসে মূল্য সংযোজন কর আদায়), আরেকটা টিডিএস (ট্যাক্স ডিডাকটেড অ্যাট সোর্স) এটা পণ্যের ওপর নির্ভর করে ১২ থেকে ১৪ দশমিক শতাংশ পর্যন্ত দিতে হয়। তিন ধরনের কর (ভোক্তাকর বা ট্রেড ভ্যাট, ভিডিএস, টিডিএস) দিতে হচ্ছে। যেটা সাধারণ একজন দোকানির বেলায় নেই। এখন সরকার যদি ভোক্তা পর্যায়ে শতাংশ কর কমিয়ে এটিকে অন্তত বা শতাংশ করে এবং ভিডিএস, টিডিএস থেকে আমাদের কিছু সময়ের জন্য অব্যাহতি দেয়, তাহলে আমাদের জন্য টিকে থাকা সহজ।

সুপারশপ বাড়লে দেশের বাজার ব্যবস্থা অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব পড়বে?

এতে অনেক লাভ আছে। যদি সুপারশপের সংখ্যা বাড়ে, তাহলে দেখা যাবে মধ্যস্বত্বভোগী বাদ দিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনা যাবে। তখন কৃষকও সরকার নির্ধারিত দাম পাবেন। আবার পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে চাষের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। সার, কীটনাশক ব্যবহারে কৃষককে সচেতন করা যাবে। এতে আরো সুবিধা আছে। একটা সুনির্দিষ্ট ডাটা থাকবে সরকারের হাতে। কোথায় কোনো পণ্য কতটুকু মজুদ আছে, কতটুকু উৎপাদন করতে হবে আর কতটুকু আমদানি করা লাগবে, দাম কত করা যৌক্তিক, কৃষক কোন পণ্যটি বেশি, কোন পণ্যটি কম উৎপাদন করবেন, আমদানি নীতি জনবান্ধব করে তৈরি করাএসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের সুবিধা হবে। সরকারের এখান থেকে আয়ও বাড়বে। সাধারণ মানুষও আর পণ্যের দাম মান নিয়ে শঙ্কায় থাকবে না। সুপারশপ যদি প্রতিটি কমিউনিটিতে থাকে, তাহলে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাজার ব্যবস্থা তৈরি করা যাবে।

বাংলাদেশে সুপারশপের ভবিষ্যৎ কী? দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুপারশপগুলো কী ভূমিকা রাখতে পারে?

আমাদের হিসাবমতে, বাংলাদেশে ১৬ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট আছে। সুপারশপগুলো যদি ১০ শতাংশও অবদান রাখতে পারে, তাহলে বিলিয়ন ডলার রেভিনিউ হবে। আশপাশের দেশগুলোয় সেক্টরের শেয়ার ১০-৪০ শতাংশের মতো। এখন পর্যন্ত হিসাবমতে, আমাদের এখানে সুপারশপের বাজার ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের মতো। আগামী পাঁচ বছরে এটি বিলিয়ন ডলারের মার্কেট হবে বলে আমি মনে করি। বর্তমানে স্বপ্নের বাজার ৪৫ শতাংশের বেশি। সুপারশপের সুবিধা হচ্ছে, এখানে বাজারের সব তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে থাকবে। যখন রেভিনিউ, মান মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তখন বাজেট ঘোষণার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। এটি অর্থনীতিকে দ্রুত এগিয়ে দেবে।

সরাসরি পণ্য আমদানি করতে পারলে স্বপ্নের ব্যবসা সম্প্রসারণে কতটা ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে?

আমাদের এখানে অনেক বেশি পণ্য। এতে নানা ভিন্নতা রয়েছে। এখন বিদেশী পণ্য আমরা যেসব আমদানিকারক থেকে নিয়ে আসি, তারা নিজেদের পছন্দ সক্ষমতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু পণ্য নিয়ে আসেন। অন্যদিকে এখন এলসি করতে গেলে ৭৫ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হচ্ছে। এসব জটিলতায় এখন পণ্য আনতে অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে। ফলে আমরা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ দিতে পারছি না। অন্যদিকে স্থায়ীয় বাজারের সঙ্গে আমাদের একটা প্রতিযোগিতা তো আছেই। দেখা যাচ্ছে, তখন ক্রেতা আকর্ষণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এখন আমরা যদি সরাসরি আমদানির অনুমতি পাই, তাহলে ব্যবসা পরিচালনা প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরিতে সুবিধা হবে।

দেশে সুপারশপের সংখ্যা শাখা বাড়ছে। ভোক্তাস্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি কোনো নির্দেশনা, নিয়ন্ত্রণ বা সুবিধা দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?

সুপারশপে শিক্ষিত যুবক, ছাত্র, ছাত্রী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। আবার যেকোনো পণ্যের দাম মান নির্ধারণ এবং সেটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও সরকারে পক্ষে সহজ। কিন্তু স্থানীয় সব বাজারে গিয়ে ঠিক রাখা, পর্যবেক্ষণ করা সরকারের পক্ষে সহজ নয়। এতে ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে শতশত দোকান নজরদারি করা এবং এসব দোকানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ নয়। কিন্তু ১০-১২টি চেইন নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ। এজন্য খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুপারশপের বিস্তার একান্ত সময়োপযোগী।

সুপারশপের ব্যাপক বিস্তার সাধারণ দোকানি বা স্থানীয় বাজার ব্যবস্থার জন্য অনেকে হুমকি মনে করেন। এটি কীভাবে দেখছেন?

আমরা স্বপ্নের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে একটি মডেল তৈরি করেছি। এটি নিয়ে কাজ হচ্ছে, সফলতাও আসছে। আমরা যেখানে স্বপ্নের শাখা দিচ্ছি, তার আশপাশে স্থানীয় দোকান যেগুলো রয়েছে, সেগুলোকে স্বপ্নের ফ্র্যাঞ্চাইজিং হিসেবে কনভার্ট করে নিচ্ছি। একজন মুদি দোকানি তার ব্যবসা স্বপ্নের নেটওয়ার্কে কনভার্ট করে লাভবান হচ্ছেন। কারণ আমাদের সাপ্লাই চেইনের সুবিধাটা তিনি পাচ্ছেন। তার আর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই। তাই এটিকে সাংঘর্ষিক না ভেবে একটি আরেকটির সম্পূরক হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সুপারশপগুলোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?

নিয়ন্ত্রণ এরই মধ্যে সরকার করছে। বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে পরীক্ষা করছে। নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় আনা সহজ। কিন্তু স্থানীয় বাজারে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে খুচরা ব্যবসার দোকানে কী চেক করা হবে, সেটি সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি। অনেক সময় দেখা যায় সমস্যাটি উৎপাদন পর্যায়ে। কিন্তু সেসব বিষয়ে খুচরা দোকানে গিয়ে জরিমানা করা ঠিক না। আমাদের প্রায় ৪২ হাজার পণ্য রয়েছে। সব পণ্য তো আমরা উৎপাদকের কাছ থেকে এনে এখানে পরীক্ষা করতে পারি না। আমাদের সে সক্ষমতাও নেই। আর এটি আমাদের কাজও না। বিএসটিআইয়ের সিল আছে। আমি এনে বিক্রি করছি। এখন সরকার কী চেক করবে, কোথায়, কীভাবে করবে, এটি যেসব সংস্থা করে তারা আমরা দুই পক্ষকেই সুনির্দিষ্ট করে জানাতে হবে। তাই বিষয়ে একটি সমন্বিত কার্যকর নীতিমালা জরুরি।

স্বপ্ন এরই মধ্যে পণ্য রফতানি শুরু করেছে। রফতানি বাড়াতে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

আমাদের এখন পর্যন্ত রফতানি যেগুলো হয়েছে, সেগুলো হংকংয়ে। সবজি ফল আমরা রফতানি করেছি। এখন আমাদের রফতানির ফরমায়েশ আসছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, সিঙ্গাপুর থেকে। আমাদের আপাতত লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশী ভারতীয়রা যেসব দেশে বেশি, সেখানে রফতানি করা। আশা করছি, ভবিষ্যতে রফতানির বাজার অনেক বড় হবে। এখনো বিদেশে আমাদের কোনো শাখা নেই। ভবিষ্যতে এটি হতে পারে। আমরা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম রিটেইলার যারা গ্লোবাল গ্যাপ সার্টিফিকেশন পেয়েছি। পশ্চিমা মূলধারার বাজারে এখন আমাদের পক্ষে কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।

 

আরও