পূর্ববঙ্গে মফস্বলের রাজনৈতিক অভ্যুদয়ের একটা দীর্ঘ প্রেক্ষাপট আছে। প্রথমে সংক্ষেপে সেটি তুলে ধরা যাক। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে ১৭৯৩ সালে। ১৭৯৩ থেকে ১৮১১—এই ১৮ বছরেই ইংরেজদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, কলকাতার বাবুরা জমিদারি চালাতে পারবে না। ইংরেজরা মনে করেছিল, জমিদারি ব্যবস্থার কারণে এখানে ইংল্যান্ডের মতো কৃষি বিপ্লব হবে। কিন্তু এখানে তা হয়নি। তদুপরি আশানুরূপ খাজনাও পাওয়া যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় ইংরেজরা আরেকটা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণী সৃষ্টি করেছিল, যারা তালুকদার, মজুমদার, শিকদার প্রভৃতি নামে পরিচিত এ পত্তনি আইনের মাধ্যমে। এ মধ্যস্বত্বভোগীদের দিয়েই খাজনা আদায়ের কাজটি করা হয়। এরা ছিল কৃষক ও জমিদারদের মধ্যখানে। তারা কৃষকদের চিনত। ফলে খাজনাও বেশি আদায় হচ্ছিল। এ প্রক্রিয়ায় বাবু জমিদাররা অনেকটা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। যদিও তাদের সৃষ্টি করা হয়েছিল একটি অনুগত গোষ্ঠী হিসেবে। আগের জমিদারদের অনেকেই বাদও পড়ে যায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়। ফলে তাদের মধ্যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। তারা ছিল প্রধানত তুর্ক আফগানদের বংশধর। পরে তাদেরই একটা মধ্যশ্রেণী গিয়ে ফকির, সন্ন্যাসী, ফরায়েজিসহ অন্য আন্দোলনগুলো করে। ইতিহাসে আমরা যেসব আন্দোলন দেখেছি, তার সবই মধ্যশ্রেণী নেতৃত্ব দিয়েছে। তবে সব আন্দোলন তারা করেছে কৃষক শ্রেণীর সহায়তায়। এর কারণ তারা রুটি-রুজি হারিয়েছিল। আর তাদের সহযোগী হয়েছে কৃষক। ওই মধ্যশ্রেণী জানত, কৃষক ছাড়া তারা কিছুই করতে পারবে না। কাজেই কৃষকদের নানা বঞ্চনার কথা তুলে ধরে তারা তাদের সংগঠিত করেছিল। এ স্বার্থ সংঘাতের বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে।
আরেকটা দিক থেকে বিষয়টি দেখা যাক। ইংরেজ আমলে মফস্বলের স্থানীয় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত বাংলার বাইরের লোকেরা। বিশেষ করে গুজরাট থেকে আসা মাড়োয়ারিরা। তারা মফস্বলের সব মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিত। ব্যবসা-বাণিজ্যে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকাটি পালন করত মাড়োয়ারিরা, এমনকি পাট ব্যবসাও। মফস্বলের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ কিন্তু স্থানীয় মানুষের হাতে ছিল না। ফলে তাদের ক্ষোভ বাড়তে লাগল। বিশেষ করে মফস্বলের মানুষ যখন শিক্ষিত হওয়া শুরু করল।
বলতে গেলে উনিশ শতকে এসে পূর্ববঙ্গে মফস্বলের রাজনীতিটা খুব সবল এবং জঙ্গি হয়। তখনকার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ঢাকাও একটা মফস্বল। এটা তখন কেন্দ্র ছিল না, কেন্দ্র ছিল কলকাতা। ১৯০৫ সালে এসে ঢাকাকে একটা উপকন্দ্র করার চেষ্টা করা হয়। তখন বিভিন্ন দিক থেকে বাধা আসে। উপকেন্দ্রের সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক ছিল বৈরী। আবার মফস্বলের সঙ্গে গ্রামের সম্পর্ক অনেক স্বাভাবিক ছিল। সেদিক থেকে রাজনীতি নতুন গতি পেল। বিশেষ করে ১৯০৫ (বঙ্গভঙ্গ) সালের পর থেকে রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া রাজনীতিটা অনেক বেশি সফল হয়। ইংরেজরা চেয়েছিল কিছু গোষ্ঠীকে খুশি করে টিকে থাকতে। তারা যুদ্ধ করতে চায়নি। জানত যে যুদ্ধ করে তারা জিততে পারবে না।
ইংরেজরা প্রথম খুশি করার চেষ্টা করেছিল দুই বিবদমান মধ্যবিত্তকে। অর্থাৎ আগের মধ্যবিত্ত ও নতুন মধ্যবিত্ত। এজন্য ব্রিটিশরা তাদের চাকরিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। ইংরেজরা আসলে ভয় পেত কৃষককে সবচেয়ে বেশি। কারণ কৃষকরাই একমাত্র সশস্ত্র বিদ্রোহ করতে রাজি ছিল। ঐতিহাসিকভাবেই কৃষকের দালালি করা সম্ভব ছিল না। ইংরেজদের দালালি করার জন্য যা যা করার কথা, কৃষকরা একটাও করতে পারতেন না। খাজনা আদায় করতে গিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন হয় সবচেয়ে বেশি। কৃষকদের বিদ্রোহের ফলে কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। তাদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। উপনিবেশে কৃষকের কোনো লাভ ছিল না। এ কারণে তারা এতটা বিদ্রোহ করেছেন। ফলে কৃষকই হয়ে উঠলেন বিদ্রোহী সমাজ। তাদের সংগঠিত করেছে রাজনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগী, যাদের বেশির ভাগের বাস মফস্বলে। সময়ান্তরে তারাই আমাদের রাজনীতিতে হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় নিয়ন্তা।
আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের তিনজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান মফস্বলের এ রাজনৈতিক পটভূমিতে। সবার কাছে পরিষ্কার ছিল, তারা কার সঙ্গে লড়াই করছে? ১৯৩৮ সালে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী সভা করতে পারেননি স্থানীয় কংগ্রেস ও স্বদেশীদের কারণে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার বন্ধুবান্ধব স্থানীয় কংগ্রেস ও স্বদেশীদের সরিয়ে দিয়ে সভা করার ব্যবস্থা করেছিলেন। গোপালগঞ্জে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে বঙ্গবন্ধুকে জেলে যেতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক শত্রু-মিত্রের দ্বন্দ্বটা তৈরি হয়েছে মফস্বল তথা গোপালগঞ্জ থেকে। গোপালগঞ্জ একটা মফস্বল। এখানে কোর্ট-কাছারি আছে। মফস্বলে এর চেয়ে বেশি কিছু থাকে না। এখানেই তার রাজনৈতিক হাতেখড়ি। এক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ না বুঝলে শেখ মুজিবুর রহমানকে বোঝা যাবে না।
অন্যদিকে মওলানা ভাসানী মাদ্রাসাকেন্দ্রিক কৃষকপন্থী রাজনীতি থেকে উঠে এসেছিলেন। মাদ্রাসার অবস্থান খারাপ হয়ে যাওয়ায় তিনি আসামে চলে যান, যে অভিবাসনটা বিত্তহীন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্য স্বাভাবিক ছিল। তিনি সেখানে লড়েছেন পূর্ববঙ্গের দরিদ্র কৃষকের জন্য, যারা ওখানে গেছে কাজ করতে। তাহলে মফস্বল ও গ্রামের মজলুম নেতা রাজনীতি করছেন প্রবাসে, আসামে। ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে করিমগঞ্জকে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করেন। মওলানা ভাসানী গ্রাম থেকে উঠে আসা করিমগঞ্জে রাজনীতি করা মানুষ। সেই অর্থে রাজনৈতিক দিক থেকে মধ্যস্বত্বভোগী। একইভাবে ফজলুল হক একজন মধ্যস্বত্বভোগী। মফস্বলের লোক। চাখার কলেজ থেকে শুরু করে সবই তখন মফস্বলের কেন্দ্র। কোনোটাই ঢাকার নয়, কোনোটাই কলকাতার নয়। সুতরাং আমাদের রাজনীতিতে মফস্বলের মৌলিক ভূমিকা রয়েছে।
১৯৪৭ সালের পর রাজনীতিটি ভাষা আন্দোলনের কারণে ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ঢাকা ছিল করাচির সঙ্গে লড়াইয়ের কেন্দ্র। অর্থনৈতিক ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় যে মফস্বলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা তৈরি হয়েছে বিশেষ করে পাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। ১৯৪৭ সালের পর অনেক মাড়োয়ারিরা এ ব্যবসা ছেড়ে চলে যায়। সে জায়গাটি দখল করে বাংলাদেশের কিছু মানুষ, পাকিস্তানের কিছু মানুষ। এ মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ঢাকা ও গ্রামের। অতএব বিচ্ছিন্ন রাজনীতি ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক এমন ভাবনাটি ভ্রান্ত। এমনকি পরবর্তীকালে কৃষিতে অর্জিত আয়ের ওপর নির্ভর করে মানুষ উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে আসে। মফস্বলের মানসিকতাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পাটাতন তৈরি করেছে। মূল আন্দোলন দানা বেঁধেছে মফস্বল থেকে, কৃষকের কাছ থেকে।
১৯৭১
আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও বিদ্রোহ, প্রতিরোধ হয়েছে বড় বড় শহরে নয়, মফস্বলে। ৩৬টি জায়গায় সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিটিই মফস্বলে। মফস্বলের এসব যুদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে আঘাত পেয়েছে, সেখান থেকে তাদের পক্ষে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। পাকিস্তান ভেবেছে ঢাকাই হলো বাংলাদেশ। এটা আসলে বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশটা ঢাকার বাইরে—মফস্বলে-গ্রামে। ওইখানে মানুষ সফলভাবে বিদ্রোহ করেছে।
আমরা ঢাকার দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির কথা ভাবি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তিনি ঢাকার কথা বলেননি। গ্রাম ও মফস্বলের কথা বলেছেন। আমরা মনে করি, ঢাকায় মিছিল না হলে আন্দোলন জমবে না। ঢাকায় তাকে মিছিল করতে হয়নি। তিনি সারা জীবনই মিছিল-লড়াইয়ের মধ্যে ছিলেন। কৃষককে কি পলিটিক্যাল ক্লাস করতে হয়েছে? করতে হয়নি। বিভিন্ন আসনের জনপ্রতিনিধি কারা নির্বাচন করে? মফস্বল ও গ্রামের মানুষই। গোটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক চাপটা মফস্বলের রাজনীতিবিদই ধারণ করেন।
বঙ্গবন্ধুকে মফস্বলের মানুষ তাদের নেতা মনে করত। কারণ বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে তাদের রাজনীতির মিল ছিল। এজন্য শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি সবার কাছে গেছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে আছে, রাতে পাহারা দেয়ার জন্য তাকে ও মোয়াজ্জেম চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কারণ তারা বন্দুক চালাতে জানত। এটা ইঙ্গিত করে যে তারা মফস্বল থেকে আসা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। এ শ্রেণীই পুরো পূর্ববঙ্গের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছিল। জমিদাররা রাজনীতিতে ব্যর্থ হয়েছে, শেষ হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ রদ করার পর। মফস্বলের মানুষের রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা অনেক বাস্তব ছিল। শহরের মানুষ সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত কিন্তু অনেক সময় আদর্শবাদী। তাদের একজন ছিলেন আবুল হাশিম। তিনি মনে করতেন, হিন্দু-মুসলমানকে এক করা যাবে, পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গকে এক করা যাবে। হিন্দু ও মুসলিম এক কিনা সেটি বলা যাবে না, কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ আলাদা, এটা বাস্তবতা। যে কারণে ১৯৪৭ সালে যৌথ বাংলা আন্দোলন ভেস্তে গেল। পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা কেন পূর্ববঙ্গের লোকের অধীনে থাকবে? কোনো কারণ আছে কি? স্বভাবত থাকেনিও। ফলে যুক্ত বাংলার আন্দোলনটা ব্যর্থ হলো।
অন্যদিকে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনটা চালিয়ে গেছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, মওলানা ভাসানী আগে একদিনও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থেকে কীভাবে নেতা হলেন? কারণ তার চেয়ে সবল কেউ ছিল না অভিজ্ঞতার দিক থেকে। উল্লেখ করা দরকার, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় হোসেন সোহরাওয়ার্দী এখানে ছিলেন না। তিনি না থাকার ফলে এ দলে অনেক নেতাকর্মী, মানুষ এসেছে যারা খুবই জঙ্গি, প্রতিবাদী।
বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি সোহরাওয়ার্দীকে আজীবন শ্রদ্ধা করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ভেতরে ভেতরে বিভাজন ছিল। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পুরোপুরি পাকিস্তানপন্থী। কাজেই কেন্দ্র কোনোদিনই এ রকম বিপ্লবী সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে বিষয়টি খুব পরিষ্কার। খোকা রায়ের বই ‘আমার দেখা রাজনীতির দুই দশক’-এ উল্লেখ আছে, তিনি জিজ্ঞাসা করছেন শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার কথা বলছেন কেন। তিনি তো সোহরাওয়ার্দীর লোক। বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেছিলেন, লিডারের রাজনীতি লিডারের কাছে। আমার রাজনীতি আমার কাছে। শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে দ্বৈততা। কারণ তিনি এমন এক রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন, যেটা সোহরাওয়ার্দী কোনোদিন দেখবেন না। দেখেনওনি। শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের শক্তিকে ব্যবহার করেছেন নিজের ভাবনার জন্য। ঠিক একইভাবে আমরা দেখছি মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আঁতাত করেছেন ১৯৬৮ সালে আন্দোলনের সময়। কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে। গোপালগঞ্জ বা আসামে, মফস্বল পর্যায়ে যারা ক্ষমতাকাঠামোয় ছিলেন তারা কলকাতার বাবুদেরও প্রতিনিধি। ভাসানী বা শেখ মুজিবুর রহমান বাবুদেরই অস্বীকার করছিলেন। মফস্বল ও কেন্দ্রের মধ্যে একই ঘটনা ঘটছে। তারা কেন্দ্রের সঙ্গেই লড়াইটা করছে। মফস্বলটা সবচেয়ে সবল। কেননা এর সঙ্গে যোগাযোগ গ্রামের। মফস্বলের রাজনীতি শক্তিশালী না হলে ঢাকায় ডাক দিয়ে লাভ নেই। তার মানে রাজনীতিতে মফস্বলের বিরাট ভূমিকা রয়েছে, সেটি আমাদের ইতিহাসে উঠে আসে না।
অস্বীকার করার জো নেই, অভিজাতরাই রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। ওই দলের ভেতরেই কাজ করেছেন মফস্বল থেকে উঠে আসা নেতারা। তারা বাইরে থেকে কিছু করেননি। ভেতরে থেকেই বৃহত্তর স্বার্থের জন্য লড়েছেন। ফজলুল হক বিষয়টি ধরতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, তারা আমার লোক। তারা আমার হয়ে কাজ করবে। তিনি বুঝতে পারেননি, কৃষক শ্রেণী ও গ্রামের মানুষ কারো লোক নয়, নিজেদেরই লোক। শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানী এটা ধরতে পেরেছিলেন। সেজন্য তারা সফল হয়েছেন। যদিও দুজনের মধ্যে কিছু তফাত আছে। মওলানা ভাসানী ক্ষমতার রাজনীতি করেননি। অতএব, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। আর বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার রাজনীতি করেছেন, সফল হয়েছেন। যার যে উদ্দেশ্য তাতে দুজনই সফল হয়েছেন।
আমরা দেখি, পাকিস্তান হওয়ার পর প্রথম প্রতিবাদ সভা হয় ডিসেম্বর, ১৯৪৭। আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর পেরিয়ে নভেম্বরে গণ্ডগোল। ডিসেম্বরে সভা। প্রথম সভায় যারা অংশ নিয়েছিলেন তারা মফস্বল থেকে এসেছিলেন। ঢাকা হলো ইতিহাসের পথে একটা রেলওয়ে স্টেশন। কিন্তু মূল শক্তিটা ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে। বারবারই এটি হয়েছে। এখনো তাই।
ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টি করেছেন, যার ভিত্তি ছিল পূর্ববঙ্গ, কিন্তু যেহেতু তিনি ক্ষমতাপন্থী ছিলেন, তিনি পূর্ববঙ্গের কৃষক সমাজকে ধরতে পারেননি শেষে এসে। বঙ্গবন্ধু মফস্বল থেকে উঠে আসেন। ১২ বছর বয়স থেকে তার মধ্যে প্রতিবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। বলতে গেলে তার জন্মটাই হয়েছে প্রতিবাদ করতে করতে। স্কুলে তিনি হরতাল করিয়ে দিয়েছিলেন। একজন শিক্ষার্থী গোটা স্কুলকে বন্ধ করে দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। মফস্বল থেকে তার রাজনীতির সূচনা। সেখান থেকে এসে কেন্দ্রের রাজনীতিটা দখল করেছেন। তিনি মফস্বল থেকে কেন্দ্রে এলেও মফস্বলকে কখনো ত্যাগ করেননি। সবসময় যোগাযোগ রাখতেন। নিজের ব্যাপারে তিনি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। এর কারণ তার ভিত্তিটা অনেক শক্তিশালী।
উল্লেখ করা দরকার, শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্বপুরুষ কিন্তু আফগানিস্তান থেকে আসা। আফগানরা যখন এখানে ক্ষমতায় ছিল তাদের বংশধররা বিভিন্ন জায়গায় গেছে। তারা ইংরেজের সঙ্গে লড়াই করেছিল। তারা তাদের শত্রু কে সেটি বুঝেছিল। এই যে শেখ মুজিবের ভেতরের একটা রাগ ছিল। কাজেই তিনি ইংরেজ ও ইংরেজদের দালালদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। এ ম্যাট্রিক্সে চিন্তা করলে মফস্বলকে বোঝা অনেক সহজ হতো। কেন শহরে নেতা তৈরি হচ্ছে না, নেতা সব তৈরি হচ্ছে মফস্বলে।
অথচ আমরা মনে করছি, এককভাবে রাজনীতির কেন্দ্র ঢাকা। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ সবই মফস্বলে ছড়িয়েছে বলে সফল পরিণতি লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে মূল প্রতিরোধ শহরে হয়নি, হয়েছে মফস্বলে। প্রতিরোধের সময়েও, বিজয়ের প্রাক্কালেও। রাজনীতিটাও গ্রাম থেকে আসা। এজন্য মফস্বল-গ্রামের মানুষ তাদের সমর্থন দিয়েছে।
বর্তমানে আমরা মফস্বলকে দেখি উপরাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে। মফস্বলকে নিয়ে আমরা গবেষণা করি না। মফস্বল এখন অনেকখানিই অবহেলিত গবেষণায়। আমরা মফস্বলকে মনে করি শহরের একটা উপসংস্করণ। মফস্বলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা এখন নয়া ঔপনিবেশিক সম্পর্ক হয়ে যাচ্ছে, এটা হওয়া উচিত নয়। এ অঞ্চলের রাজনীতিতে মফস্বল বরাবরই বড় ভূমিকা ছিল। আজও সার্বিকভাবে মফস্বলের অভ্যুদয় ছাড়া বড় রূপান্তরকামী রাজনীতি সম্ভব নয়।
আফসান চৌধুরী: লেখক ও সাংবাদিক