দেশের তরুণ সমাজ তথ্যপ্রযুক্তির মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠছে। তারা ‘ডিজিটাল টুল’ দিয়ে এরই মধ্যে একটা বিপ্লবও করে ফেলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তরুণদের ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখানোর কথা তোলাটা অবান্তর। তবে এ দেশে নারী ও যুবদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পদক্ষেপে পরিবর্তন আনতে হবে। গ্রাম ও শহরের পার্থক্য, বয়স ও দক্ষতার ভিন্নতা—এ ধরনের বিষয় মাথায় রেখে নিতে হবে ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ। ‘নারী ও যুবদের ক্ষমতায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার: আমাদের প্রস্তুতি ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ অভিমত তুলে ধরেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) ও বণিক বার্তা যৌথভাবে ২০ অক্টোবর এর আয়োজন করে। বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে বৈঠক বসে রাজধানীর কারওয়ান বাজার বিডিবিএল ভবনে; বণিক বার্তার প্রধান কার্যালয়ে
শীষ হায়দার চৌধুরী
সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়
আজকের বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটা দেশের জন্মের প্রায় ৫৫ বছর পর এ নিয়ে আসলে নতুন করে আলোচনার কিছু নেই, বরং বিষয়গুলো রিফ্রেশ করা যেতে পারে। কারণ আমরা এরই মধ্যে ইনফরমেশন হাইওয়েতে উঠে গেছি। এখন এটার যে আপডেটেড ভার্সনগুলো আছে, সেগুলোর সঙ্গে আমরা কোপউইথ করতে পারছি কিনা, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। আর সরকারি ও বেসরকারি সর্বত্রই কোঅর্ডিনেশনের ঘাটতি থাকায় আমাদের অ্যাসেস এবং রিঅ্যাসেস করতে হচ্ছে। আমি এ বিভাগে যোগদানের পর বিদ্যমান কিছু প্রকল্প ফ্রিজ করা হয়েছে। কারণ ফ্রিজ করা প্রকল্পগুলোর স্টকটেক করা হচ্ছে। হাই-টেক পার্ক অথরিটি অনেক বড় ও সম্ভাবনাময় একটি প্রতিষ্ঠান। এর অধীনে যে প্রজেক্টগুলো রয়েছে, তার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই আবার ডুপ্লিকেশন পাওয়া যাচ্ছে। নারী ও যুবদের জন্য ‘হার পাওয়ার’ একটি প্রজেক্ট রয়েছে, যা নারীদের প্রযুক্তিগত ক্ষমতায়নে ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে। এছাড়া আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্টার্টআপ বাংলাদেশ নামে যে কোম্পানি রয়েছে, সেটাকেও রিভিজিট করা হচ্ছে। এর আওতায় ‘ফান্ড অব ফান্ড’ কনসেপ্টটাকে আরো কার্যকরী করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে, যাতে স্টার্টআপগুলোকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করা যায়। আইসিটি মাস্টারপ্ল্যানকে রিশেপ করা হচ্ছে। আজকে যে আলোচনা এখানে হচ্ছে, তা আইসিটি মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফ্রিজ করে দেয়া প্রজেক্টগুলো থেকে অর্থ বের করে নতুনভাবে অনেক কাজ করা সম্ভব। তবে ডিজিটাইজেশনের এই অ্যাডভানটেজ পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মাইন্ডসেট ও এটিটিউডে পরিবর্তন আনতে হবে।
ফাহিম মাশরুর
চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার
বিডিজবস ডটকম
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা শিক্ষিত বেকার নিয়ে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী বের হন। ডিজিটাল সাক্ষরতা নিয়ে অনেক কথা হয়। আমাদের যুবকরা তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যেই বেড়ে উঠছে। তাদেরকে যখন ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখানোর কথা বলা হয়, এর থেকে বড় ভ্রম আর কিছু হতে পারে না। আমাদের যুবকরা ডিজিটাল টুল দিয়ে পুরো একটা বিপ্লব করে ফেলল, আর আমরা এখন তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার শেখাব—এ জিনিসটা আমরা চিন্তা না করি। ডিজিটাল সাক্ষরতা শেখানোর নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করার কোনো অর্থ নেই। সমস্যাটা হচ্ছে, ডিজিটাল ব্যাপারগুলো ব্যবহার হচ্ছে অর্থনীতিতে অনুৎপাদনশীল ও ধ্বংসাত্মক কাজে। যুবকরা অনলাইন বেটিংয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এগুলো নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। টাকাগুলো মোবাইল ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। বিএফআইইউ চাইলেই এগুলো বন্ধ করতে পারে। আমরা বাংলাদেশে ব্যবসা সহজীকরণের কথা বলি। কিন্তু ব্যবসায় প্রবেশ করা অনেক কঠিন। সিঙ্গাপুরে ব্যবসা শুরু করার তিন বছরের মধ্যে ট্যাক্স দেয়া লাগে না। আমাদের দেশে ব্যবসা ১ লাখ টাকার হোক কিংবা ১০০ কোটি টাকার হোক, তাদেরকে ট্যক্স দেয়াই লাগে। বিষয়গুলো আরো একটু ভাবার দরকার আছে।
ওয়াসীম আলিম
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, চালডাল
আমাদের তরুণরা কাজ করছে। কিন্তু তারা বিনিয়োগ পাচ্ছে না। কেন পাচ্ছে না? ব্যাংক খাতে আমাদের ৬০ বিলিয়ন ডলার ভেনিশড। আমরা কোনো কিছু চিন্তা না করে বিনিয়োগ করে যাচ্ছি। কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এমন কোথাও আমরা সেভাবে বিনিয়োগ করছি না। এখানে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে এবং আরো বোল্ড হতে হবে। আমরা মনে করি, একটা মাইক্রোসফট ওয়ার্ড শিখিয়ে দিলাম, তাতেই প্রশিক্ষণ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবী এগিয়ে গেছে। আমাদের এখন যে এআই এসেছে, মাইক্রোসফটের এক লাখ প্রকৌশলী আছেন, আমাদের কয়জন আছেন? এগুলো করতে পারলে আমাদের সফলতা আসবে।
শরিফুল হাসনাইন সবুজ
ম্যানেজার, ডাটা ও অ্যানালিটিকস টিম, প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্স বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড
বাংলাদেশে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ কম থাকার বড় কারণ ইন্টারনেট ডাটা মূল্য, গ্রামের মানুষের সক্ষমতা না থাকা এবং কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা শুধু শহর এলাকাকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রযুক্তিগুলোর উন্মোচন হয়েছে সেসব বিষয় নিয়ে যারা কথা বলে তারা শহুরে তরুণ। গ্রামের তরুণরা এটা নিয়ে সচেতন না। সচেতন না থাকার বড় কারণ গ্রাম পর্যায়ে ইন্টারনেট সংযোগ পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। ডিজিটাল অ্যাকসেসরিজের দামও অনেক বেশি। দাম বেশি হওয়ার কারণে গ্রামের মানুষজন ইন্টারনেটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন না। আমাদের এখানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য বিলিয়ন ডলার বৈশ্বিকভাবে বিনিয়োগ করে। এ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জার্নিটা করে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে। আমরা কেন এসব প্রযুক্তিকে দেশে নিয়ে আসতে পারছি না? আমরা এখানে দু-একটা সফল উদাহরণ তৈরি করতে পারছি না? সেখানে দু-একটা সফল উদাহরণ তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশে গ্লোবাল কোম্পানিগুলোর জন্য উৎসাহের জায়গা হয়ে উঠব।
মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী
সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে তরুণদের ভূমিকা আমরা ৩৬ জুলাই দেখেছি যে তরুণদের কোথায় রাখা দরকার। আমরা তরুণদের অংশগ্রহণ দেখছি, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নেই। আমরা আমাদের জেন-জি নিয়ে অনেক বেশি সন্দেহে ছিলাম যে তারা সারা দিন কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকে, তারা কী চিন্তা করে! কিন্তু এখন আমি তাদের দর্শন সম্পর্কে পরিষ্কার। তাদের চিন্তার জগত অনেক ওপরে উঠে গেছে। সিঙ্গাপুরে ইন্টারনেটের মাথাপিছু ব্যবহার হচ্ছে ৫৫৫ কেপিবিএস, আর বাংলাদেশের হচ্ছে শূন্য দশমিক ৫ কেপিবিএস। এটাই হচ্ছে ডিজিটাল পার্থক্য। এটা আমাদের কমাতেই হবে। সমস্যাটা হচ্ছে, প্রযুক্তি খাতে আমরা পেশাদারত্বকে কম গুরুত্ব দিয়ে রাজনীতিকরণকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সরকারের যারা কাজ করতে চায়, তাদেরকে পেশাদারত্বের সুযোগটুকু দিতে হবে। যুবকদের এখানে সংযুক্ত করতে হবে। আমাদের দরকার হচ্ছে যুবদের প্রয়োজনীয়তা পর্যালাচনা করা। তারা কী চায়, সেটা দেখা। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বর্তমানে বিপিওতে আমাদের বাজার হচ্ছে ৬০০ বিলিয়ন। এর মধ্যে জিডিপিতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের অবদান কত? আমাদের জিডিপির আকার হচ্ছে ৪৬০ বিলিয়ন। ফিলিপাইনের জিডিপিতে বিপিওর ভূমিকা হচ্ছে ৮-১০ শতাংশ। আমাদের দেশে তা শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও নিচে। আমাদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করতে হবে। যুবকদের যুক্ত করতে হবে। সেজন্য আমাদের নীতি ঠিক করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের সুযোগ করে দিতে হবে।
কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ
কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ
দি এশিয়া ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ
নারী ক্ষমতায়নের জন্য যখন প্রণোদনা দেয়া হচ্ছিল, তখন আমরা দেখলাম যে সেখানে একটা ভালো নীতি থাকতে পারত। করোনার সময় নারী উদ্যোক্তাদের অনেক প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকে অর্জন খুবই কম ছিল। সুতরাং নীতি তৈরি নিয়ে আমাদের আরো ভাবা উচিত। ক্ষমতায়নের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সাইবার নিরাপত্তার বিষয় আছে। যেহেতু আমরা অনেক বেশি যুবক ও নারীদের ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে নিতে চাচ্ছি, সেখানে নারীরা কীভাবে ডিজিটাল জগতে নিরাপদে ব্যবসা করতে পারে, সে ধরনের বিষয়গুলোও চিন্তা করা দরকার। এছাড়া প্রযুক্তিকেন্দ্রিক বৈশ্বিক অনেকগুলো অনুষ্ঠান হয়। সেখানে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি কম দেখা যায়। এসব অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে এগুলো ব্যবহার করে অনেক বেশি জনসংখ্যাকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা যাবে।
ড. তাপস কুমার পাল
সহকারী অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান তৈরি ও রাজস্ব সৃষ্টির অনেক জায়গা আছে। আউটসোর্সিং একটা বড় জায়গা। এটা নিয়ে আমাদের আনুষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিবিএস এখানে কাজ করতে পারে। এটাকে সরকার কীভাবে জিডিপির আওতায় নিয়ে আসতে পারে ও আরো সম্ভাবনার দিকে যেতে পারি, সে বিষয়ে আমাদের ভাবা দরকার।
আমরা রাইড-শেয়ারিং নিয়ে একটা গবেষণা করছি। চালকদের গড় বয়স ৩৩ পেয়েছি। সেখান থেকেও সরকারের রাজস্ব আয়ের সুযোগ আছে। অনেকেই ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যবসা-বণিজ্য করছে। এগুলো থেকে রাজস্ব আয় করার বড় একটা সুযোগ আছে। কিন্তু এগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে আমরা দেখি যে আমাদের ৩০ শতাংশ অর্থনীতি এখনো জিডিপিতে দেখা যায় না। মূল বিষয় হচ্ছে, অনানুষ্ঠানিক ক্রিয়া-কলাপগুলোকে আনুষ্ঠানিক করা দরকার। এছাড়া আমাদের শিক্ষিত বেকারদের কীভাবে কর্মসংস্থানের আওতায় নিয়ে আসা যায়, সেটা নিয়েও এখন আলোচনা করা জরুরি।
শাহীন সিয়াম
পরিচালক (স্ট্র্যাটেজি)
শপ-আপ
এ আন্দোলনের পর আমাদের জেন-জেড প্রজন্ম এক্সট্রিমলি মোটিভেটেড। তাদেরকে এখন আমাদের গাইডলাইন দেয়া প্রয়োজন। গাইডলাইনই তাদেরকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের মেন্টরশিপ দেয়া প্রয়োজন। মেন্টরশিপ তাদের অনেক দূর নিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে। আমাদের লিডিং পজিশনে থাকা নারীরা নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত নারীদের দারুণভাবে সহযোগিতা করে। আমরা আমাদের কোম্পানি এবং পার্শ্ববর্তী অনেক কোম্পানির ওপর গবেষণা পরিচালনা করেছি। আমরা দেখেছি, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই শুরুতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। তারা জানেনা কীভাবে তারা কী করতে পারে। সেজন্য তারা আমাদের দ্বারস্থ হয়। যাদের এই নেটওয়ার্কটা নেই, তারা কীভাবে কী করবে? এটা তাদের জন্য অনেক কঠিন।
যাদের ব্যবসা করার ইচ্ছা আছে, তারা গাইডলাইন জানে না। একটা ট্রেড লাইসেন্স করা, রেজিস্ট্রেশন করাকে তারা অনেক ভয় পায়। এর জন্য ই-অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ দরকার, যেখানে সব সেবা একসঙ্গেই পাওয়া সম্ভব।
ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান
মহাপরিচালক
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর
আমাদের যুবশক্তির যে মাত্রা তা অত্যন্ত আশাপ্রদ ও একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও শঙ্কার বার্তা দেয়। আমাদের মোট জনশক্তির প্রায় ৩০ শতাংশ যুবক রয়েছে। পরিসংখ্যানগত হিসেবে তা ছয় কোটি। এর মধ্যে নিটে (শিক্ষা, কর্ম ও প্রশিক্ষণে নেই যারা) রয়েছে ১ কোটি ৮২ লাখ। এরাই আমাদের সংকটের জায়গায়। কারণ তারা শিক্ষা, কর্ম ও প্রশিক্ষণে না থাকলেও তাদের ব্যয় কিন্তু রয়েছে এবং সমাজে তারা বোঝা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। আবার তারা সম্ভাবনাময়ও। কারণ আমরা বছরে প্রায় তিন লাখ লোককে আমরা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় আনি। অন্যান্য প্রকল্পের আওতায় আরো নিয়ে আসি এক থেকে দুই লাখ। আমাদের চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর তিন লাখ করে তিন বছরে নয় লাখ লোককে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসছি। এর বাইরে আর্ন (ইকোনমিক এক্সিলারেশ অ্যান্ড রেজিলিয়েনস ফর নিট) নয় লাখ যুব নারী ও যুবককে প্রশিক্ষিত করা হবে। অর্থাৎ ১ কোটি ৮২ লাখের মধ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রায় ২০ লাখ লোককে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসছে। তবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য সমগ্র জনগোষ্ঠী নিয়ে ভাবতে হবে। নিট জনগণকে নিয়ে ১৭-১৮টি মন্ত্রণালয় কাজ করে। তবে কেউ কোনো প্রশিক্ষণ না পেলে তাকে আমার এলাকার বাইরে বলা হয়। এ নিট জনগণের নাম-ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করে এগোতে পারলেই তাদের নিয়ে কাজ করা সহজ হবে। আমাদের যুবরা সৃজনশীল। তারা ফেসবুক ইউটিউবে নানা ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে আয় করছে। এদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ দিয়ে আরো গোছানোভাবে কাজ করার সুযোগ আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে অর্জন করে নিতে হবে।
শামস্ মাহমুদ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
শাশা ডেনিমস, পরিচালক বিজিএমইএ
প্রযুক্তি আমাদের এখানে অনেক সুযোগ এনে দিয়েছে। কভিডের সময় আমাদের এখানে অনেক নারী কর্মী গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দেশে চলে যায়। কেউ খামার করেছেন, কেউ বুটিক করেছেন। তাদের জন্য মাইক্রো বিজনেস পরিচালনার জন্য একটা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এটা তাদেরকে ক্ষমতায়িত করত। কিন্তু তাদের জন্য সে সুযোগ নেই। তাদের জন্য সে সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। আমাদের অফিশিয়াল ই-মেইল থাকলেও আমি কখনো তা চেক করি না। আমি সব সময় ই-মেইল চেক করি। সার্ভারে আমি ঢুকতে যাব, তখন দেখি সার্ভার ডাউন। সার্ভিসকে ফোন দিলে তারা বলে যে তাদের কিছু করার নেই। এর জন্য আমাদের প্রযুক্তি অবকাঠামোও ঠিক করতে হবে। আমাদের কিছু লেভেল দেয়ার সমস্যা আছে। যুব সমাজের কেউ কাজ করছে না তো তাকে কৃষিতে লাগিয়ে দাও। এ ধরনের কথা বলাও বন্ধ করতে হবে। একটা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ডাটার অনেক দাম। এগুলো আমাদের গ্রামের যুবকরা অনেক সময় এফোর্ট করতে পারছে না। ডাটার অনেক দাম, এখানে ডাটা মূল্য না কমাতে পারলে তাদের এগিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
ফাইরুজ মুবাশ্বিরা
শিক্ষার্থী, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট
প্রকৌশল ও প্রযুক্তি খাতে মেয়েরা আসতে অনাগ্রহ বোধ করেন। আমাদের সমাজে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, মেয়েরা প্রকৌশল বিদ্যায় ভালো করতে পারেন না। ফলে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের চেয়ে কম। এটা শুধু বুয়েটের নয়, দেশের সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পরিস্থিতি। এখানে জেন্ডার রোলের ভূমিকা আছে। মা-বাবা, অভিভাবকরা এ ধরনের চিন্তা সন্তানদের মধ্যে দিয়ে থাকেন। মেয়েদের জন্য ডাক্তারি বা শিক্ষকতার মতো পেশাগুলো বেটার। আমরা যারা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি, তাদের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের কর্মপরিধি সমাজের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে এ ধারণা ভেঙে দিতে হবে। পাঠ্যপুস্তকগুলোয় এ বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে এ ধারণাটি ভেঙে দেয়া সম্ভব। মানসিক স্বাস্থ্যগুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা সম্ভব, কিন্তু আমাদের অবকাঠামোগত স্বল্পতা রয়েছে। এ প্রযুক্তিগুলোর মাধ্যমে সংযুক্ত করে সেবা প্রদান করা হলে সমাজের ট্যাবুও দ্রুত কাটাতে সহযোগী হবে। নারীদের ইন্ডাস্ট্রি ও চাকরির সঙ্গে পরিচিত করা গেলে নারীদের কর্মক্ষেত্রে যোগদানে উৎসাহ কাজ করবে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্টার্ন করার সুযোগ দেয়। যদি সরকারিভাবে তরুণদের ইন্টার্নের ব্যাপারগুলোর সঙ্গে পরিচিত করানো যায়, সুযোগ প্রদান করা হলে চাকরির বাজার সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে। আমরা করতে পারি মানে, আমাদের ক্যাপাবিলিটি আছে। তখন চাকরি সম্পর্কে উদ্যোক্তাও তৈরি হবে অনেক।
রিফাত জাবীন খান
ফেলো
গ্লোবসাইট
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে উপযুক্ত রেফারেল মেকানিজমের অভাবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। এর জন্য নাগরিকদের দুর্দশা নয়, যারা সেবা প্রদান করছে তাদেরও দুর্দশার বিষয়টি এখানে আছে। ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজের আওতায় স্বাস্থ্য অধিকার আমাদের বড় জায়গা। এটা শক্তিশালী হওয়ার জন্য সব খাতের অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু একটি প্রতিষ্ঠান এটি করলে শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়। সরকারি পর্যায়ে ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার স্ট্র্যাটেজির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একে ত্বরান্বিত করতে পারলে আমাদের সমাজ ও দেশের জন্য একটি ভালো উদাহরণ তৈরি হবে।
ড. ফাহমিদা খাতুন
নির্বাহী পরিচালক
সেন্টার ফর পলিসি
ডায়লগ (সিপিডি)
আমরা যে সময়ে বসবাস করছি, তাকে প্রযুক্তির যুগ বলা হচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা তৈরির দরকার পড়ছে। এটার মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনা যায়। আমাদের জনগণের গড় বয়স হচ্ছে ২৭ বছর। কিন্তু যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। এর মধ্যে নিটেও (শিক্ষা, কর্ম ও প্রশিক্ষণে নেই যারা) একটা ভয়াবহ সংখ্যা আছে। ১৫-২৪ বছর বয়সীদের প্রায় ৪০ শতাংশই নিটে আছে। এ ৪০ শতাংশের মধ্যে আবার মেয়েদের সংখ্যাটা অনেক বেশি, যেটা ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ। আর নিটে ছেলেদের সংখ্যা হচ্ছে ১৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। তাদেরকে শ্রমবাজারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অন্যদিকে যাদের আয় কম এবং কাজের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, এ রকম ৮০ শতাংশ লোক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাই সুনির্দিষ্টভাবে তরুণদের জন্য শোভন কর্মসংস্থান তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি যা অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহয়ক হবে। এজন্য দরকার অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। বস্তুত, শিক্ষা খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিত (স্টেম) শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। তাছাড়া তাদের উদ্যোগী হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে ঋণসহায়তার মাধ্যমে। বিদেশেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ার জন্য তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দরকার।
ফাহিম আহমেদ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
পাঠাও লিমিটেড
আমাদের ইন্টারনেটে খরচ অনেক বেশি এবং গুণগত মান খুবই খারাপ। যার কারণে কম ডাটা ব্যয় হয়। এর পেছনে বেশকিছু কারণ আছে। তার মধ্যে হচ্ছে কমপ্লেক্স টেলকো রেগুলেশন, কয়েক স্তরের অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্সিং আছে, কর কাঠামো অনেক বড়। টেলকোর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে ভয়েসকে প্রায়োরিটাইজ করা হয়েছে, যেখানে ডাটাকে ডিপ্রায়োরিটাইজ করা হয়েছে। এ কারণগুলোর সমাধান না করলে প্রযুক্তি কখনো সাশ্রয়ী হবে না এবং মানুষও ব্যবহার করবে না। আমাদের কনজিউমার ডিজিটাল সার্ভিসের মূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকা। এটা একটা জেনারেল এস্টিমেট। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ এফ কমার্সের অংশ। আমার পাঠাও প্লাটফর্মে দুই লাখের বেশি ই-মার্চেন্ট যুক্ত আছে। আমার এস্টিমেট অনুযায়ী, এর মধ্যে ৫০ শতাংশ পাঠাও প্লাটফর্মের মাধ্যমে যায়। এ পণ্যগুলো অনেক জায়গায় রিচ করছে। যুব সমাজের আয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। রিটেইল কমার্সে যত খরচ হয়, তার মাত্র ১ শতাংশ ডিজিটালি ব্যয় হচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো অনেক কম। প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব পুরো সেবা দেয়া সম্ভব হলে তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করবে।
উমামা ফাতেমা
সমন্বয়ক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
এখনকার প্রজন্মের পুরোপুরি বিকাশটাই তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটে। ২০২২-২৩ সালে সরকার যে কারিকুলাম তৈরি করেছিল, সেটাকে পুরোপুরি মোবাইলভিত্তিক করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এটি আমাদের সমাজের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এ পরিবর্তনটাকে মেনে নিতে পারেননি। এমনকি শিক্ষকরা ডিজিটাল ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কীভাবে পরিচালনা করবেন, সেটাতে তারা অভ্যস্ত নন। এর কারণে দেখা গেল যে শিক্ষার্থীরা গুগল করে কপি-পেস্ট সিস্টেমে পড়াশোনা করছে। তারা যদি এ রকম চুরিই শিখতে থাকে, তাহলে তাদের বড় ধরনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটা নষ্ট হয়ে যায়। সরকার আগামী ২০ বছর পর যুবকদের কোথায় দেখতে চায়, এ দর্শনটা পরিষ্কার থাকা খুবই জরুরি। এটা পরিষ্কার না থাকলে এখানে যতই ইনপুট দেয়া হোক না কেন, এখান থেকে কোনো ফলাফল আসবে না। উবার, পাঠাওয়ের মতো রাইড-শেয়ারিং অ্যাপগুলো যখন বাজারে এল, সেখানে সরকার কোনো নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি। সরকার হুট করে সেখানে ভ্যাট বসিয়ে দিল। ফলে তারা যাত্রীর অ্যাপকল কেটে দিয়ে ম্যানুয়ালি ভাড়া নিচ্ছে। এভাবে তরুণদের সঙ্গে সরকারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
মালিহা ইকবাল
হেড অব পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রোগ্রাম, ইয়ুথ অপরচুনিটিজ
বাংলাদেশ ছোট হলেও আমাদের উন্নতি করার অনেক সুযোগ রয়েছে। আমাদের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন কেনার ক্ষমতা বেড়েছে। তবে শহর ও গ্রামের পার্থক্য এবং পুরুষ ও মহিলার ইন্টারনেট ব্যবহারের পার্থক্যটাও এখনো রয়ে গেছে। এ পার্থক্যটা কমানোর পদ্ধতি আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। ডিজিটাল সাক্ষরতা নিয়ে আমরা কথা বলি। কিন্তু শহুরে ও গ্রাম্য যুবকের জন্য একই প্রশিক্ষণ দরকার আছে কিনা তা ভেবে কর্মসূচি সাজানো উচিত। পুরুষ ও মহিলার ইন্টারনেট, মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহারের অনুপাত খুবই কম। বিষয়টা আমাদের আগের প্রজন্মও মোকাবেলা করেছে। বর্তমান প্রজন্মও করছে। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব একটা বিশেষ দিক বলে আমি মনে করি। এটা পরিবার থেকেও হতে পারে, শিক্ষকদের থেকেও হতে পারে। তারা মেয়েদের নেতৃত্বের বিষয়ে অনুপ্রাণিত করতে পারে।