পুঁজিবাজারে ভালোর চেয়ে জাঙ্ক কোম্পানি বেশি তালিকাভুক্ত হয়েছে

বাংলাদেশে শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৫২ সালের প্রথম দিকে, যখন কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জে পাকিস্তানের সব শেয়ার এবং সিকিউরিটিজ লেনদেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তত্কালীন প্রাদেশিক শিল্প উপদেষ্টা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) স্টক মার্কেট প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। ১৯৫৩ সালের ১৩ মার্চ শেয়ার মার্কেটবিষয়ক এ

বাংলাদেশে শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৫২ সালের প্রথম দিকে, যখন কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জে পাকিস্তানের সব শেয়ার এবং সিকিউরিটিজ লেনদেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তত্কালীন প্রাদেশিক শিল্প উপদেষ্টা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) স্টক মার্কেট প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। ১৯৫৩ সালের ১৩ মার্চ শেয়ার মার্কেটবিষয়ক কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই বৈঠকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য সচিব খালিলির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

অবশ্য এর আগে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার করাচি স্টক এক্সচেঞ্জের শাখা ঢাকায় খোলার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু কমিটি ওই প্রস্তাব বাতিল করে। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, পূর্ব পাকিস্তানে একটি স্বাধীন নিজস্ব স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করা হবে। কমিটি আরো সিদ্ধান্ত নেয়, ঢাকা নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সদস্যদের ভারতীয় মুদ্রায় হাজার রুপিতে সদস্যপদ ক্রয় করার জন্য বলা হবে। যাতে অর্থ দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ স্থাপন করা যায়। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ অথবা চট্টগ্রামকে লোকেশন হিসেবে ধরা হয়।

১৯৫৩ সালের জুলাই অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ১০০ জন সদস্য স্টক এক্সচেঞ্জ শুরুর ব্যাপারে সম্মত হন। ওই বৈঠকে মির্জা ইস্পাহানিকে আহ্বায়ক করে আটজনের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কাজ ছিল মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস, রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা; যা ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইন অনুযায়ী করা হয়েছিল।

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড শুরুর সব প্রস্তুতি নেয়া হয়। ১৯৫৬ সালে নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশে প্রথম স্টক ট্রেডিং শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে স্টক এক্সচেঞ্জ ঢাকার মতিঝিলে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার বিল্ডিংয়ে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৫৯ সালে বর্তমান (/এফ, মতিঝিল-সি/) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নিজস্ব ভবনে সব কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ২৩ জুন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয় এবং নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড রাখা হয়। ১৯৬৪ সালের ১৫ মে পুনরায় নাম পরিবর্তন করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড করা হয়।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে শেয়ার ট্রেডিং পাঁচ বছর বন্ধ ছিল, যা ১৯৭৬ সালে আবার শুরু হয়। সংক্ষেপে এই হলো বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে যাত্রা।

শুরুর পর থেকে সবসময় চেষ্টা করেছি শেয়ারবাজারের সংস্কারের কথা বলতে। পুঁজিবাজার উন্নয়নে বেশ আগেই একটি কমিটি করা হয়েছিল। আমাকেও ওই কমিটির একজন সদস্য করা হয়েছিল। আমি সবসময় কাজগুলো বিভাজিত করা, আন্ডার রাইটার বা ইস্যু ম্যানেজারদের লাইসেন্স দেয়া, সদস্য সংখ্যা বাড়ানো কাউন্সিলে বাইরের প্রতিনিধিত্ব রাখার কথা বলেছি। বিদ্যমান ব্রোকারদেরও কেউ কেউ ওই কমিটিতে ছিল। তারা সেটি ভালোভাবে নেয়নি। আমি নোট অব ডিসেন্টও দিয়েছিলাম, এটা না করলে শেয়ারবাজার মুষ্টিমেয় লোকের হাতে বন্দিই থেকে যাবে। আমরা যে একটি গতিশীল শেয়ারবাজার চাইছি, সেটি আর হবে না। বিশেষ করে আমি ডিএসইকে সংস্কার করতে বেশি বলেছি।

উল্লেখ করা দরকার, পুঁজিবাজার আগে থেকে থাকলেও এর কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল না। অনেক পরে ১৯৯৩-এর দিকে পরিপূর্ণ বাংলাদেশে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন হলো। সেপ্টেম্বরের দিকে এটি কাজ শুরু করে। প্রথম চেয়ারম্যান হলেন সুলতানুজ্জামান খান। সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনে একটা কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে আমাকেও রাখা হয়েছিল। আমি তার সদস্য ছিলাম। অর্থমন্ত্রী মহোদয় সভাপতি ছিলেন। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও সদস্য ছিলেন। ডিএসইর প্রতিনিধিরাও ছিলেন। এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। ওই কমিটির বৈঠকে আমি উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো জোরালভাবে তুলে ধরেছিলাম। স্মরণ আছে, ওই কমিটির এক বৈঠকে চট্টগ্রাম এক্সচেঞ্জ করার একটা দরখাস্ত এসেছে বলে জানানো হয়। এর পাইওনিয়ার ছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি অবশ্য আমাদের কমিটিতে ছিলেন না। সবাইকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এটা দেয়া যায় কিনা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রতিনিধিরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, আমাদের শেয়ারবাজারই চলে না ভালোভাবে। আরেকটার অনুমতি দিয়ে লাভ কী। কিন্তু আমি এর পক্ষে ছিলাম। আমি বলেছিলাম, একটা প্রতিযোগিতামূলক সিস্টেম দাঁড় করাতে হলে এর অনুমতি দেয়া দরকার। চট্টগ্রাম যেহেতু আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর এবং বাণিজ্যকেন্দ্র, সেখানে একটা স্টক মার্কেটের অনুমতি দেয়া হোক। ভারতে তখন ১২-১৩টি স্টক এক্সচেঞ্জ ছিল।

এরপর ১৯৯৬ সালে বড় ধরনের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি হল। ইকোনমিস্টে শিরোনাম হলো, ঢাকার রাস্তায় বিনিয়োগকারীদের জবাই করা হলো। ১৯৯৩ সালে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন হলো। তিন বছরের মাথায় ঘটনাটি ঘটল। কেউ টের পেল না। আমি তখন বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতাম। নিজের লেখায় সবসময়ই সংস্কারের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কেলেঙ্কারি যে ঘটছে সেটিও লেখার মাধ্যমে আমি বিএসইসিকে জানিয়েছিলাম। রাত-দিন শেয়ার বেচাকেনা হতো। চট্টগ্রাম থেকে লোক আসত এবং বাসে করে রাতে চলে যেত। এটা যে ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের ব্যাপার নয়, কৃত্রিমভাবে উল্লম্ফন করা হচ্ছে, সেটা ততটা অনেকে আঁচ করতে পারেনি। একেকটা শেয়ারের দাম কয়েক হাজার গুণ বেড়েছিল। একটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ছিল ১০০ টাকা। তার দাম হয়তো দাঁড়িয়েছিল ২৫ হাজার টাকায়। অনেক কোম্পানি নকল শেয়ারও ছেড়েছিল, যেহেতু ওই সময় যাচাই-বাছাই করার উপায় ছিল না। মাত্র অল্প দিনের মধ্যেই বড় কেলেঙ্কারি ঘটে গেল। বিদেশীরাও শেয়ার বিক্রি করে চলে গেল। 

অর্থনীতির অধ্যাপক আমীরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটা তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশন অনেক ব্রোকারসহ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের হর্তাকর্তাদের অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। অনেক মামলা-মোকদ্দমাও হলো। বিচার খুব একটা এগোয়নি। অনেক হূদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেল।

শেয়ারবাজার সংস্কারের জন্য এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এগিয়ে আসে। আবু সাইদ সাহেব বিএসইসির চেয়ারম্যান হলেন। আগে যারা ছিলেন সবাইকে বিদায় দেয়া হয়। তিনি ঢাকা চট্টগ্রাম এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাউন্সিল সংস্কারের উদ্যোগ নিলেন। তিনি ঢাকার বাইরে থেকে অর্ধেক সদস্য নিলেন। তখন তিনি আমাকে চট্টগ্রাম এক্সচেঞ্জ কমিশনের সদস্যও করেছিলেন। ঢাকায়ও অনেককে সদস্য করেছিলেন। কিছুটা সংস্কার হয়েছিল।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার। মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলসে আমাদের পুঁজিবাজারের সদস্য সংখ্যা ছিল ২৩০। পেইড আপ ক্যাপিটাল থাকলেও বাকি সদস্যপদ ইস্যু করা হয়নি। সেটা পরবর্তী সময়ে করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। প্রথম দিকে ভেতর থেকে একটা নম্বর ছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের। এটা ব্যক্তি ব্রোকারদের দেয়া হতো। পরে সেটা বাড়ানো হয়েছিল। অনেক ব্যাংক সদস্যপদ নিল। বিমা কোম্পানিও নিল। পরবর্তী সময়ে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম চেয়ারম্যান হলে ব্যক্তি খাতে প্রথম মিউচুয়াল ফান্ড শুরু হলো। এভাবে শেয়ারহোল্ডার বাড়তে থাকে।

ধাপে ধাপে ইস্যু ম্যানেজার এবং মার্চেন্ট ব্যাংকের ধারণা এল। বলা হলো, ইস্যু ম্যানেজার, আন্ডার রাইটার আলাদা থাকবে ইত্যাদি। আর এখন ধারণাটি এল আইপিও। অনেকেই জানত না। বিদেশে ছিল এটা। ইনিসিয়াল পাবলিক অফারিং (আইপিও) এটা প্রবর্তিত হলো এবং অটোমেশন হলো। চট্টগ্রাম এক্সচেঞ্জ কমিশন আগেই অটোমেশন করেছে। দুই বছর পর করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। ডিমিউচুয়ালাইজেশনও হলো।

উল্লেখ্য, যারা ব্রোকারস ছিল তারা এর মেম্বারশিপ চাইল এবং তারা যথেষ্ট শেয়ার নিয়ে গেল। ভ্যালুয়েশনও বেশি ছিল। ইচ্ছামতো ডিমিউচুয়ালাইজেশন করেছে এটা বলব না, তবে তারা অনেকটা সুবিধা নিয়েছে। সম্প্রতি যারা ট্রেড লাইসেন্স নিল, তাদের কোনো শেয়ারহোল্ডিং নেই। শেয়ারহোল্ডিং ওই ২৫০ জনের। বাজার মূলধন ১৩৫ কোটি টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ডিএসই নিজেই লিস্টিং হওয়ার কথা ছিল। বিদেশে কিন্তু তাই হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে তারা এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি।

এদিকে ২০১০ সালে অটোমেটিক ট্রেডিং সিস্টেমের মাধ্যমে ডিমিউচুয়ালাইজেশন আবার হলো। আরেকটা ধস হলো। ধস যে আসছে আমরা সবাই বুঝতে পেরেছি। অথচ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভূমিকা ছিল খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। ওই ধরনের কেলেঙ্কারির যারা হোতা, অনেকটা তাদেরই সহযোগিতা করা হলো। শেয়ারের জোগান কম যুক্তিতে তারা ডিরেক্ট লিস্টিং-এর অনুমতি দিল। ওই সুযোগের ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছে। একেকটা শেয়ার, যার মূল্য ১০০ টাকা, সেটি ১৫-২০ গুণ বেশি দামে কিনেছে। পরে শেয়ারের দাম চার ভাগের এক ভাগও থাকেনি অল্প কিছুদিনের মধ্যে। এটি নিয়েও একটা তদন্ত কমিশন গঠন হয়েছিল প্রয়াত ইব্রাহীম খালেদের নেতৃত্বে। তিনিও প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন। দায়ীদের অভিযুক্ত করেছিলেন। এর পেছনে যারা কারসাজি করেছে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি দেখা যায়নি।

আগে মার্জিন ঋণের নীতিমালা ছিল না। ইচ্ছামতো ব্যাংকগুলো শেয়ার কিনেছে আর ঋণ দিয়েছে। ব্যাংক হয়ে গেছে শেয়ারবাজারের সাপ্লাইয়ার। এরপর যখন হুঁশ হলো বাংলাদেশ ব্যাংক মার্জিন ঋণ নীতিমালা করল। শেয়ার কেনায় ঋণ প্রদানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল। এটা আগেই দরকার ছিল। ব্যাংকগুলো মনে হয়, এখন নিজের পোর্টফোলিওতে শেয়ার কিনতে পারে না। এটা করা হয়েছিল মার্জিন ঋণ নীতিমালা দিয়ে। দুর্ভাগ্যক্রমে আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল, সেটি হলো গ্রাহকের শেয়ার জোর করে বিক্রি করে দেয়া (ফোর্সড সেল) গ্রাহক ঠকে গেছে। তার টাকাও যাচ্ছে। কোনো কোনো গ্রাহক অজ্ঞতাবশত বলেছিল আমারটা বিক্রি করবেন না। দেখি, দাম বাড়ে কিনা। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন, ফোর্সড সেলটা আপাতত বন্ধ রাখো। তার হয়তো দায়িত্ব ছিল, সূচক নামলেও নামুক, ধীরে ধীরে নামুক। ফোর্সড সেলটা আপাতত বন্ধ রাখো। কিন্তু যারা ফোর্সড সেল করেছে তারা বেঁচে গেছে। কিছুদিন পর সেটি আরো কমে গেছে।

এরপর খায়রুল কমিশন এল। কিছু নিয়ম-কানুনে পরিবর্তন আনা হলো। দুর্ভাগ্যক্রমে তার সময়ে সবচেয়ে বেশি জাঙ্ক স্টক লিস্টিংয়ে এসেছে এবং ইচ্ছামতো প্রিমিয়ামও নিয়েছে, জাঙ্ক স্টকে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ওটিসি মার্কেটে ৯০-৯২টি কোম্পানি পা রেখেছে, যেখানে কোনো ট্রেডিংই হয়নি। আর কোনো জবাবদিহিতাও নেই। জনগণের টাকা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলা বাংলাদেশেই সম্ভব হয়েছে। অডিটররাও ইচ্ছা-খুশিমতো রিপোর্ট দিত। পয়সা খেয়ে তারা ফেইক রিপোর্ট দিত। ফুলিয়ে-ফাপিয়ে দেখানো হতো আর্থিক প্রতিবেদন।

পরে এডিবি সংস্কারের উপায় হিসেবে বলেছে, ডিমিউচুয়ালাইজেশন কর এবং এফআরসি কর। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কমিউনিটি প্রথম দিকে আবার এফআরসির বিরোধিতা করেছিল। কারণ তারা কারো খবরদারির অধীনে যেতে চায় না। পৃথিবীতে অডিটরদের রেগুলেটর আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি হতে দেয়া হয়নি প্রথম দিকে। এখন একটা এফআরসি আইন করা হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) করা হয়েছে। সবই করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে লোকবল নেই।

বাংলাদেশে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন জিডিপির ১৮ শতাংশ। ভারতে ৪০, যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ শতাংশ বা তারও বেশি। আরো কিছু দেশে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন জিডিপির ১০০ শতাংশের ওপর আছে। আমাদের জিডিপির আকার এখন ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। বাজার মূলধনের ১৮ শতাংশ। অনেকে বলে থাকে, জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজার অনেক পিছিয়ে। যেসব দেশে জিডিপির তুলনায় বাজার মূলধন এগিয়ে, সেসব দেশে ভালো ভালো সব কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। বাংলাদেশে এখনো ভালো ভালো অনেক কোম্পানি লিস্টিংয়ের বাইরে আছে। বিশেষ করে ওষুধ শিল্প এবং অন্য কিছু খাতের ভালো কোম্পানি এখনো বাজারে আসেনি। জাঙ্ক স্টক দিয়ে দাম বাড়িয়ে মার্কেট ভ্যালু যদি দেখানো হয়, তাহলে সেটি বিপজ্জনক। যে গতিতে শেয়ারবাজার বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে বেড়েছে আমাদের জিডিপি। শেয়ারবাজার বেড়েছে তার চেয়ে কম গতিতে।

বর্তমানে আমরা যে টার্নওভার দেখি ( হাজার কোটি, হাজার ৯০০ কোটি বা ৫০০ কোটি) সেটি দেখতে খুবই ভালো লাগে, প্রথম প্রশ্ন হলো এটি স্থিতিশীল কিনা। দ্বিতীয়ত, সূচক বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশের মতো। কিন্তু এটা স্থিতিশীল বা টেকসই কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ ভূমিকা রাখছে জাঙ্ক স্টক। যেগুলোর এক পয়সা ডিভিডেন্ড দেয়ার ক্ষমতা নেই। ১০ বছর ধরে কোনো টাকা দেয়নি। ফ্যাক্টরি বন্ধ, অফিস বন্ধ। সেগুলোই কিন্তু তিন-চার গুণ বেড়েছে গত এক-দুই বছরে। এগুলোর মাধ্যমে যদি শেয়ারবাজারকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাওয়া হয়, তাহলে তা হবে আমাদের জন্য একটা ভ্রান্ত নীতি। ভালো কোম্পানির শেয়ার যদি লিস্টিংয়ে আনা না যায়, তাহলে খুব একটা লাভ হবে না। এতে আবারো একটা কেলেঙ্কারি হতে পারে। সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হওয়া ভালো।

সরকার এখন অবকাঠামো খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এর অনেকগুলো সরকার ইচ্ছা করলে প্রাথমিকভাবে আইপিওর মাধ্যমে ছাড়তে পারে। বিভিন্ন দেশে সরকারি অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে সরকারি শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশ যা চিন্তাই করেনি। এখানে আমি ছোট একটা উদাহরণ দেব। মোট জীবন বীমার ৪৫ শতাংশই মেটলাইফের দখলে। লিস্টিংয়ে সেটিকে আনার জন্য কোনো প্রচেষ্টাই নেয়া হয়নি। তারপর ফার্মা সেক্টরে বেশ কয়েকটি বিদেশী কোম্পানি ছিল। তাদের তালিকায় আনা হয়নি। এক-দুটি তো চলেও গেছে।

শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে-যাবে, তাদের নিয়ে বিশেষ উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই। যদি গুণগত মানের স্টক সাপ্লাই দিতে পারি, বাজারের পরিবেশ যদি ঠিক থাকে, তাহলে তারা আসবে এবং তারা অতীতে এসেছে। গত পাঁচ-ছয় মাসে মনে হয় কিছুটা ব্যাকফুটে গেছে, বিক্রি করে দিয়েছে শেয়ার। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এখনো ফ্রন্টিয়ার মার্কেট, আমরা এখনো ইমার্জিং মার্কেটে যেতে পারিনি। উদীয়মান বাজার ক্যাটাগরিতে যেতে হলে আরো ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারের লিস্টিংয়ে আনতে হবে, বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। বেশির ভাগ বন্ডই লিস্টিংয়ে নেই। মাত্র দুয়েকটা তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে সেগুলো তেমন ট্রেডিং হয় না। সরকারি শেয়ারগুলো ফ্রি ফ্লোট করার জন্য আমরা অনেক বলেছি। এখান থেকে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা পেত। সরকার সেটিও মনোযোগ করেনি। আমি বলব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নজর দিলে কাজটি হতে পারে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। স্ববিরোধী কিছু নীতি রয়ে গেছে। গ্রামীণফোনের শেয়ার যখন বাজারে এসেছে, তখন আমিও ছিলাম সেখানে। তালিকাভুক্ত হলে করপোরেট করহার ১০ শতাংশ কমানোর কথা ছিল। দুই-তিন বছর যাওয়ার পর তাদের করপোরেট কর ছাড় শতাংশে নামিয়ে আনা হলো। গ্রামীণফোন বিদেশী কোম্পানি, মুনাফা করছে, সেজন্য মেনে নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের বিনিয়োগকারীরা। দেশী কোম্পানির জন্য করহার তো বোঝা। বেশি করপোরেট করে আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের দেশী বিনিয়োগকারীরা। আবার করপোরেট কর বেশি হলে বিদেশী কোম্পানি আসতেও চায় না। করপোরেট কর ভারত কমিয়ে দিয়েছে, থাইল্যান্ড কমিয়ে দিয়েছে, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোয় কম; তাহলে আমাদের এখানে বেশি হবে কেন? একসময় যুক্তরাষ্ট্রেও হাই ট্যাক্স রেজিম ছিল। ট্রাম্পের সময় সেখানেও কমিয়ে দেয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যও কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ কিন্তু এখনো করপোরেট কর বেশি। গত বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। একইভাবে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রেও আড়াই শতাংশ কমোনা হয়েছে। আগে শতাংশ পার্থক্য ছিল, সেটি থেকে গেছে। আবার এই আড়াই শতাংশ প্রযোজ্য হবে না ব্যাংকিং কোম্পানি, মোবাইল টেলিফোন এবং সিগারেট কোম্পানির ক্ষেত্রে। এই হলো সার্বিক অবস্থা।

আরো কিছু স্ববিরোধী ব্যাপার রয়েছে। গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির কর নিয়ে বিরোধ। মামলা চলছে। এসব ঘটনা আমাদের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত করে। আমি মনে করি, ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি কোর্ট সিস্টেমের বাইরে করা উচিত। এটা করা যেত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি করা হয়নি। তারপর সরকারি তিতাস গ্যাস একটা তালিকাভুক্ত কোম্পানি। কোনো আলোচনা করেই হুইলিং চার্জ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তারা যে কমিশন পেত, সেটি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। একটা নীতি নেয়ার পর সেটি যদি দ্রুতই পরিবর্তন করে ফেলা হয়, তাহলে তো কোনো কাজে আসে না। যেমন বার্জার, ওয়ালটন আইসিবিকে এক বছরের মধ্যে ফ্রি ফ্লোট শেয়ার ১০ শতাংশ উন্নীত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলো যখন তালিকাভুক্ত হয় তখন ওই শর্ত ছিল না। এখন তাদের ওপর চাপ দেয়া শুরু হচ্ছে। এতে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটা অন্যায় পলিসি শিফট কীভাবে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন করল, সেটি আমার মাথায় আসে না। একদিকে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন লিকুইডিটি সাপ্লাই বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মতো উদ্যোক্তাদের হাজার হাজার কোটি টাকা বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। অবিবেচনাপ্রসূত চিন্তা থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ধরনের রেগুলেশন জারি করেছে, আমি এটিই বলব। এখানে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করা হয়নি।

সত্যি কথা বলতে কি, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আমাদের নীতিনির্ধারকদের বোকা মনে করে। এজন্য যে সরকার শেয়ারবাজার চাইছে অথচ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো লিস্টিংয়ে নেই। যেমন ইউনিলিভার। ইউনিলিভারের প্রধান ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। যেটি বোম্বেতে আছে। আবার মেটলাইফ, র্যাডিয়েন্ট, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি কোম্পানিগুলোও তালিকাভুক্ত নয়। আমরা কি তাদের কখনো চা-পানের জন্য ডেকেছি। বলেছি, আপনারা ১০ শতাংশ শেয়ার ফ্রি ফ্লোট করেন। এটি বলতে হবে। বলতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। তারা ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়কে দেখতে হবে। চা-পানের ব্যবস্থা করে সেখান থেকে যদি বলা হয়, আমার জনগণকে কেবল ১০ শতাংশ মালিকানা দেন। আমরা আর কিছুই চাই না। তারা খুশিতে রাজি হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে, উচ্চপর্যায় থেকে তাদের জীবনেও অনুরোধ করা হয়নি।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে অনেক উত্থান-পতন ছিল। নিয়ন্ত্রকদের দুর্বলতার কারণে মাঝে দুটি বড় কেলেঙ্কারি হয়ে গেল। তার পরও উচ্চমধ্যবিত্তের জন্য শেয়ারবাজার ছাড়া আর কোনো অপশন নেই। সঞ্চয়পত্র দিয়ে তাদের ক্ষুধা মেটানো যাবে না। সারা বিশ্বে সঞ্চয়পত্র অত বড় ভূমিকা রাখে না। বড় ভূমিকা রাখে শেয়ারবাজার। আমাদের শেয়ারবাজারকে মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্তের জন্য উপযোগী করতে পারি, তাহলে ডিস্ট্রিবিউশন অব ইনকাম নিয়ে খুব একটা চিন্তা করতে হবে না। জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। কেননা জনগণকে অ্যাসেটের মালিকানা না দিলে সম্পদ গুটিকয়েক পরিবার বা ব্যক্তির কাছে কেন্দ্রীভূত হবে। দেখা যাচ্ছে, পরিবারভিত্তিক কতগুলো কোম্পানিতে বাবা মারা যাওয়ার পর দ্বন্দ্ব হচ্ছে। পরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এসব কোম্পানি যদি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত থাকত এবং করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেত, তাহলে সেগুলো যুগের পর যুগ চলত, যেভাবে অন্য দেশগুলোয় চলছে।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির কথা বলা যাক। আদি উদ্যোক্তারা কত আগেই মারা গেছে। কিন্তু তাদের করপোরেট ব্যবসা বড় হয়েছে, আরো বড় হয়েছে। আর এখানে যদি ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিগুলো লিস্টিংয়ে না আসে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবারভিত্তিক কোম্পানিগুলো টিকবে না। এক প্রজন্মের পরে টিকবে না। তাদেরও বোঝাতে হয়েছে। আবার সরকারকেও ট্যাক্স রিলিভ দিতে হবে, যাতে ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। গুণগত মানের কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা না গেলে জুয়াড়িদের হাত থেকে শেয়ারবাজারকে রক্ষা করা যাবে না।

আবু আহমেদ: শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

আরও