বাংলাদেশ গভীর জলের ধানের আঁতুড়ঘর

আমরা যখন বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলি, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈচিত্র্য নিয়ে, তখন তা আমাদের গর্ব, মহিমা ও পরিচয়ের বিষয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও বৈচিত্র্য-বৈভবে অনন্য। আমরা প্রাকৃতিক কিংবা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বলতে পারি। পৃথিবীর এক ছোট্ট দেশ, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এ দেশে অবস্থিত। আমাদের ছোট এ দেশে রয়েছে

আমরা যখন বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলি, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈচিত্র্য নিয়ে, তখন তা আমাদের গর্ব, মহিমা পরিচয়ের বিষয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও বৈচিত্র্য-বৈভবে অনন্য। আমরা প্রাকৃতিক কিংবা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বলতে পারি। পৃথিবীর এক ছোট্ট দেশ, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন দেশে অবস্থিত। আমাদের ছোট দেশে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কিংবা বাংলাদেশই চামচ ঠুঁটো বাটান পাখি, ইরাবতী ডলফিন, নরম খোলের কালো কচ্ছপের প্রধান বিচরণস্থল। বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার জাতের ধান ছিল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের দাবি, এখন প্রায় আট হাজার জাতের ধান তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। আমাদের সমতল কি পাহাড়ে কৃষকদের মধ্যে এখনো অনেক জাত সংরক্ষিত আছে।    

বাংলাদেশ গভীর জলের ধানের (ডিপ ওয়াটার রাইস ভ্যারাইটি) আঁতুড়ঘর। এখানে সবচেয়ে বেশি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের গভীর পানির ধান পাওয়া যায়। ১৯৩৪ সালে হবিগঞ্জের নাগুড়ায় পৃথিবীর প্রথম গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশ বেগুনের আদি জন্মভূমি, যেটিকে কোনো একটি শস্য ফসলের জাতের ক্ষেত্রে সেন্টার অব অরিজিন বলা হয়। বর্তমানে জামালপুর জেলার চৈতন্য নার্সারিতে বেগুন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞান গবেষণা শুরু হয়।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, এখানকার বাস্তুসংস্থানের বৈচিত্র্য (ইকোসিস্টেম ডাইভারসিটি) অনেক বেশি। আমরা দেখি কোন এলাকায় চরে কাশবন, কোন এলাকার উপকূলে উপকূলীয় বন, কক্সবাজার-চকরিয়ায় গর্জন মাতৃবৃক্ষের অরণ্য আছে, আমাদের বিভিন্ন রকমের শালবন আছে। ভাওয়াল-মধুপুরে এক রকমের শালবন, আবার দিনাজপুরে সিংড়ার শালবন অন্য রকমের। আমাদের সিলেট, পার্বত্যাঞ্চলে মিশ্র পাহাড়ি বন আছে। সিলেটের লাউয়াছড়া, রেমাকালেঙ্গা, সাতছড়িতে বর্ষা-অরণ্য বা বৃষ্টিবন আছে। আমাদের অনেক গ্রামে গ্রামীণ বন আছে। এছাড়া বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশ্বাস এবং প্রথার মাধ্যমে পবিত্র বন সংরক্ষণ করেন। এই যে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য তার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও অনন্য। বাংলাদেশে ষাটের অধিক মাতৃভাষা আছে। বিরাট জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে তাদের যে জীবনযাপন, তাদের যে কৃষিপদ্ধতি, তাদের যে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সেটি কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি দলিল হয়তো সেগুলোর স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের পরিচয় বিকাশে এই বৈচিত্র্য খুব গুরুত্ব বহন করে।

এই প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো বিবেচনা করাটা কৃষি-প্রতিবেশবিজ্ঞান (অ্যাগ্রোইকোলজি) চিন্তার একটা প্রধান জায়গা। কোনো একটি এলাকায় প্রাকৃতিক সাংস্কৃতিক যে বৈচিত্র্য, সেখানে মানুষ যেভাবে বসবাস করে, যেখানে নারী-পুরুষের যে সম্পর্ক, সেখানে প্রবীণের সঙ্গে সমাজের যে সম্পর্ক, শিশুদের সঙ্গে যে সম্পর্ক, ওখানে যে দলিত জনগোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন ভিন্ন যে পেশাজীবী আছে, তাদের যে ভিন্ন ভিন্ন চর্চা আছে, সেসব চর্চার স্বীকৃতিসহ যে কৃষি ব্যবস্থায়, যে খাদ্য ব্যবস্থায় আমরা সবাইকে যুক্ত করতে পারে, সেটি আমাদের কৃষি-প্রতিবেশের ধারণাকে অনেক বেশি মজবুত করে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, বাংলাদেশের উপকূলে সুন্দরবনের কাছের একটি গ্রাম। এখানে প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় হয়, আমরা সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, ফণী দেখেছি এবং করোনাকালে ঘূর্ণিঝড় আম্পান দেখেছি। এই এলাকায় লবণাক্ততা মানুষের জীবনের জন্য একটি বড় সমস্যা। এলাকায় একসময় লবণ পানির ধান অনেক বেশি ছিল। করচামুড়ি, বড়ান, পাটনাই, কুটেপাটনাই, নারিকেলমুচি, সাদামোটা, লালমোটা, নোনাখচি, জটাইবালাম, বুড়োমন্তেশ্বর এগুলো লবণ পানিতে টিকতে পারে এবং কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাও আছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের জেনেটিকে রিসোর্স শাখার মাধ্যমে উপকূলের ধানের জার্ম প্লাজম নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, সেখানে প্রমাণ মিলেছে, নোনাখচি, জটাইবালাম, দাদখানি এসব জাত অনেকখানি লবণ পানির জাত।

ষাটের দশকে জনগণের সম্মতি ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে যে বাঁধ দেয়া হয়েছে, যেটি নদীর সাথে জমির সম্পর্ক, খালের সম্পর্ক, সেখানে জোয়ার-ভাটার প্রবাহকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সব কৃষি জমি এখন আবারো চিংড়ি ঘেরে পরিণত হচ্ছে, তার পাশাপাশি বছর বছর ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে, মানুষ তখন কৃষিতে থাকতে পারছে না, মানুষ তখন অন্য পেশায় দিনমজুর হচ্ছে, তারা ইটভাটায় চলে যাচ্ছে। যে সমস্যা আমরা ভোগ করছি। আমাদের আশপাশের পুরুষরা ইটভাটায় চলে যাচ্ছে। আসলে আমরা স্থানীয় সমাজ জীবনধারাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং সেখানকার কৃষি বাস্তুসংস্থানকে বিবেচনা করে কোনো কৃষি পরিকল্পনা করিনি। আমরা এখন যে পরিস্থিতিতে আছি, সেটা বলে দিচ্ছে, কোনো একটি বিপর্যয়, কোনো একটি দুর্যোগ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো যে সংকট সেগুলো মোকাবেলা করার মতো আমাদের এখন এলাকা উপযোগী জলবায়ুসহনশীল জাতগুলো দরকার।

দেখা যায় সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কিছু গবেষণা করছে কিন্তু তারা কৃষকদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করছে না। কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, তাদের লোকায়ত জ্ঞানকে সম্মান দিয়ে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। নোনাখচি, জটাইবালাম, দাদখানি, বুড়োমন্তেশ্বরের মতো জাতগুলো, যেগুলো কৃষকের জাত, সেগুলোর মাধ্যমে লবণাক্তসহিষ্ণু জাতের কোনো গবেষণা করতে চাইলে সেখানে কৃষকের যে জ্ঞান, প্রাণসম্পদের ওপর তার যে মালিকানা, তার যে অধিকার সেসব প্রতিষ্ঠা জরুরি। তা প্রতিষ্ঠা করে একসঙ্গে কাজ করা যায়। সেখানে কৃষকসমাজ, গ্রামীণ যুবসম্প্রদায়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী, গবেষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যম একযোগে রকম কাজ করতে পারে।

আমরা যে বিভিন্ন কৃষি জমি দেখি; যেমনউঁচু জমি, মাঝারি উঁচু, মাঝারি, একটু নিচু, একদম নিচু জমি বা বিল জমি, হাওরের কান্দা জমি, বাঁওড়ের নিচু জমি রকমের একেকটি জমিতে একেকটি ফসলের বিন্যাস থাকে। বিভিন্ন ধরনের ধান আছেকোনটি একটু উঁচু জমিতে, কোনটি একটু নিচু জমিতে, কোনটি মাঝারি উঁচু জমিতে হয় কিংবা আমাদের বসতবাড়ির বাগানে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য সেগুলোও ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়। আমরা যখন কোনো একটি জায়গায় কাজ করব, তখন সেখানে জমির ধরন কী রকম, ওই ধরনের জমিতে কী ধরনের ফসলের বিন্যাস হলে ভালো হয়, কোন মৌসুমে কী ধরনের ফসল ভালো হয় সেটা জানা জরুরি। সব মাটিতে সব ধরনের ফসল হয় না। জমি মাটিকে বিবেচনা না করে আমরা সিনথেটিক সার সমানে মাটিতে ঢেলেছি। রোগবালাই রোধে সমানে বিপজ্জনক বিষ দিয়ে জোর করে ফসল ফলাতে গেলে কোনো উপকার হবে না। আমরা হয়তো কিছু শাকসবজি বা কিছু ফসল পেলাম কিন্তু মাটি মারা গেল। রকম জমি তার পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারে না। মাটি এক জীবন্ত বাস্তুসংস্থান। এখানে অণুজীব, কেঁচো, পতঙ্গ, ক্ষুদ্র উদ্ভিদ, ঘুমিয়ে থাকা বীজদানাসহ কত কী থাকে। সিনথেটিক সার বিষ দিয়ে এই মাটি হত্যা করে কৃষি উৎপাদন কৃষি-প্রতিবেশবিজ্ঞান সমর্থন করে না।

কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল হিসেবে কৃষি জমির ভাগটা হয়ে থাকে। একেক অঞ্চলে একেক রকমের জমি। চরের জমি এক রকম, বিলের জমি এক রকম, বরেন্দ্র অঞ্চলের জমি এক রকম, উপকূলের জমি এক রকম, পাহাড়ের জমি এক রকম, টিলাভূমি এক রকম আবার গড় অঞ্চলের জমি এক রকম। বাংলাদেশের বিভিন্ন রকমের জমি, ভিন্ন মাটির ধরন নদী অববাহিকা, এগুলো মিলিয়ে বলা হচ্ছে কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চল। কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশকে প্রধান ৩০টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই ৩০টি অঞ্চলের ফসলের বিন্যাস চাষের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন। বাংলাদেশে অবস্থিত ২৩০টি নদীর হিসেবে বাংলাদেশকে ১৭টি হাইড্রোলজিক্যাল রিজিয়নে (পানি অঞ্চল) ভাগ করা হয়েছে। এই ভিন্ন ভিন্ন নদী অববাহিকার প্রতিবেশ, বাস্তুসংস্থান ভিন্ন ভিন্ন রকমের, সেখানকার মানুষের কৃষি-সংস্কৃতি ভিন্ন রকমের। এসব বিবেচনায় রেখেই আমরা একটি কৃষিচর্চাকে গ্রহণ বা এগিয়ে নিতে পারি।

কৃষিকাজ নারীর হাত দিয়ে পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হলেও আমরা দেখছি কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি নেই বা কৃষক হিসেবে নারীকে দেখা হয় না। যদি কৃষকের ছবি আঁকতে বলা হয় তবে অধিকাংশই একজন পুরুষের ছবি আঁকবে। কখনো নারীর ছবি আঁকা হয় না। সমাজে বিদ্যমান বঞ্চনা, বৈষম্য এর একটা বড় কারণ। কিন্তু নারীর কৃষিতে যে কাজ, বীজ সংরক্ষণ থেকে জাত বাছাই, মাড়াই, বীজ বোনা, ফসল ফলানো, প্রক্রিয়াজকরণ, খাদ্য পরিবেশনসহ সামগ্রিক যে খাদ্য ব্যবস্থা, সেখানে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীরাই কোনো না কোনোভাবে সামাল দিচ্ছেন। কিন্তু তার পরও গ্রামীণ নারী কৃষিতে অনেক বেশি অদৃশ্য বঞ্চিত। জমিতে নারীর মালিকানা প্রশ্নে বিতর্ক আছে, প্রাণসম্পদে তার মালিকানা নেই। কিন্তু যখন বীজের কথা বলা হয়, তখন অধিকাংশ সময়েই নিশ্চুপ থাকা হয়। বীজেও নারীর কোনো অধিকার বা স্বীকৃতি নেই। গ্রামীণ নারীরা ঐতিহাসিকভাবে ঘরেই বীজকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি ১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে আমি দেখেছি কীভাবে গ্রামীণ নারীরা বীজ সংরক্ষণ করেন। বীজ নিয়ে আমি যত যা শিখেছি তা গ্রামীণ নারীর কাছ থেকেই। শিশি, বোতল, রাও, ধামা, ঝুড়ি, কলস, ডুলির মতো বিভিন্ন পাত্রে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ফসলের বীজ রাখা হতো। কিন্তু এখন নারীর বীজভাণ্ড শূন্য হয়ে গেছে। এটি বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। এক্ষেত্রে আমাদের বীজনীতি, কৃষিনীতি আর আমাদের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এই বীজশূন্যতা সৃষ্টিতে সহযোগিতা করেছে।

আমরা কখনই কোনো কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাজেটে জোরদারভাবে চাইনি নারীর বীজভাণ্ড নারীর হেফাজতে থাকুন। ঘরে ঘরে নারীর গ্রামীণ বীজাগারগুলো আরো সমৃদ্ধ হোক। আমরা চাইনি নারী বীজ রক্ষা করুক। সেটা চাইলে কী হতো? নারীর হাতে শস্য ফসলের বীজের মজুত থাকলে একটা বংশ রক্ষা হয়, একটা গ্রাম রক্ষা হয়, একটা পরিবার রক্ষা হয় এবং কৃষিকাজ রক্ষা হয়। এখন এত দাম দিয়ে প্যাকেটের বীজ কিনতে হয় সেটি করতে হতো না, যদি বীজটা আমরা আমাদের ঘরে রাখতে পারতাম। উফশী, হাইব্রিড এসব বীজ নিয়ে বাংলাদেশে অনেক প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। গ্রামে গ্রামে দ্বন্দ্ব-বিবাদ-হয়রানির ঘটনা ঘটছে। গ্রামে গ্রামে ঘরের ভেতর নারীরা যখন নিজেরা বীজ সংরক্ষণ করতেন তখন তো কোথাও এমন কোনো বীজ প্রতারণার ঘটনা ঘটেনি।

কৃষিতে নারীর স্বীকৃতির কথা আমরা বলছি। নারীর কৃষিজ্ঞান খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এখন জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, বিশ্ব কৃষি সংস্থা, গবেষণা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবাই স্বীকার করছে, নারীর কৃষিজ্ঞানটা কত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা গর্বিত, আমাদের বিজ্ঞানী দার্শনিকরা প্রচুর খনার বচন রেখে গেছেন। যেটি কৃষি নিয়ে দিয়েছেন, জলবায়ু, আবহাওয়াবিজ্ঞান নিয়ে দিয়েছেন, জীবনযাত্রা নিয়ে দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বচন, ব্যাঙ ডাকে ঘন ঘন, শিঘ্র হবে বৃষ্টি যেন। তার মতে, ব্যাঙ বৃষ্টিপাতের নির্দেশক। যদি বৃষ্টিপাত হতে হয়, তাহলে ব্যাঙের ডাক জরুরি। কিন্তু এখন আমরা কী দেখছি? তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের পরে আমরা কী ধরনের কৃষি চালু রেখেছি? এখানে ব্যাঙ থাকার পরিবেশই নেই, কোনো পরিস্থিতিও নেই। এখন জমিতে যে পরিমাণে বিষ দেয়া হয়, তাতে পোকামাকড় মরে যায়। একটা ব্যাঙ পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে, অথচ এখানে ব্যাঙের কোনো খাবার নেই। আশির দশকে বাংলাদেশ থেকে ব্যাঙ ধরে ইউরোপে রফতানি করা হয়েছে। এটা কৃষকরা করেনি, বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ করেনি। এখানে রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ব্যাঙের পা রফতানি করবে। যখন বাংলাদেশে আর কোনো ব্যাঙ নেই, তখন ওই রফতানি বন্ধ হয়েছে। যদি ব্যাঙ থাকত, ব্যাঙ পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকত, তাহলে কৃষকের প্রতি মাসে এই রাসায়নিক বিষের পেছনে কোনো টাকা খরচ হতো না। আমাদের মাটি, পানি জনস্বাস্থ্য বিপদে পড়ত না।

নারীর কৃষিজ্ঞান কারণে জরুরি, নারীরা জানেন কোন ফসলের জাত কীভাবে বাছাই করতে হয়, কীভাবে বীজ রাখতে হয়। কোনো কোনো বিশেষ চর্চা বা একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, যেমন খরা, বন্যা, লবণাক্ততা, বৃষ্টি সেটা নারী জানেন যে কীভাবে সব আপদ-বিপদ সামলে কৃষিচর্চা করতে হয়। যখন চর এলাকা, নদী উপকূল, সমুদ্র উপকূল বা হাওরে বন্যা আসে, পাহাড়ি ঢল বা ঘূর্ণিঝড় আসে রকম কোনো একটা দুর্যোগের আগে একটা আগাম প্রস্তুতি আছে, যেটি পূর্বপ্রস্তুতি। আবার দুর্যোগ চলাকালীন এবং দুর্যোগের পরও কিছু প্রস্তুতি আছে। এসব বিশেষ পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ জ্ঞান আছে। প্রস্তুতি হিসেবে আগে থেকেই অনেক ধরনের শুকনো খাবার, বীজ, গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিভিন্নভাবে একটা জায়গায় মজুত করে রাখে তারা।

বাংলাদেশে বিভিন্ন দুর্যোগের সময়, যেমন ঘূর্ণিঝড়, আমরা অনেক চেষ্টা করেও সবাইকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে নিতে পারি না। উপকূলে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার ফলে অনেক প্রাণ বাঁচে বটে, কিন্তু সেখানে অনেক প্রান্তিক নারী যেতে পারে না। অনেক প্রবীণ, প্রতিবন্ধী মানুষের যেতে খুব সমস্যা হয়। কিন্তু কেন গ্রামের নারীরা সবসময় ঘরগেরস্তালি ফেলে যেতে পারে না? গ্রামের নারীদের সাধারণত দু-তিনটা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি থাকে। একজন গরিব নারী তার গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি রেখে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চান না, কারণ তিনি ওই গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিকে তার সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। তিনি তার কোনো সন্তানকে ছেড়ে যেতে পারেন না। সেগুলো মারা গেলে তার পরিবারের ক্ষতি হবে। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের মিডিয়ায় বন্যার একটি আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বন্যার সময় কোনো এক নারী ভেলায় বা নৌকায় চড়ে তার ঘরগেরস্তালির কিছু জিনিসপত্র, বাচ্চা-কাচ্চা বা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে কোথাও যাচ্ছেন। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, একজন গ্রামের নারীর কাছে সংসার বলতে কী বোঝায়। তার সংসার বলতে কেবল মানুষ বোঝায় না; বরং তার হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল বা তার বীজ বোঝায়, তার গাছপালা বোঝায়। আর এটিকেই আমরা প্রতিবেশ বলছি, মানে ইকোলজি। গাছপালা, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, জমি, মাটি, নদী, খাল-বিল-হাওরসবকিছু নিয়ে আমাদের সংসার এবং এদের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটিই প্রতিবেশ।

কৃষি-প্রতিবেশবিজ্ঞান বা আমরা যে অ্যাগ্রোইকোলজির কথা বলি সেটি নারীর এই জ্ঞানের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে। এটি জরুরি। বাংলাদেশ চাইছে একটা জেন্ডার বৈষম্যহীন সমাজ, নারী-পুরুষের একটা সমতার সমাজ। যদি না আমরা কৃষিতে, কৃষি ব্যবস্থায়, খাদ্যোৎপাদনে নারীর যে অধিকার, তার যে ভূমিকা সেটিকে স্বীকৃতি দিতে না পারলে, মর্যাদা দিতে না পারলে এবং এর পক্ষে না দাঁড়াতে পারলে সেই সমাজ যেমন গড়া সম্ভব নয়, তেমনি কৃষি প্রতিবেশও সম্ভব নয়।

আমরা যখন কৃষি-প্রতিবেশ নিয়ে কথা বলি, তখন সেটি কেবল চাষাবাদের সঙ্গে যারা জড়িত, তথা কৃষক সমাজের বিষয় নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর যে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ রয়েছে তাদের সবার প্রচেষ্টার একটা ব্যবস্থা, যেটি সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলের খাদ্য ব্যবস্থাকে ঠিক রাখে। এই খাদ্য ব্যবস্থায় কেবল মানুষ নয় বরং তার আশপাশের গাছপালা, জীবজন্তু, প্রাণিজগৎ, মাটি, পানি, সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে সবার বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত জোগান দেয়। আদি সমাজে যেমন ছিল কৃষক শস্য-ফসল উৎপাদন করতেন, কুমারেরা মাটির জিনিস, তাঁতিরা তাঁতের জিনিস কিংবা জেলেরা মাছ ধরতেন। তাদের মধ্যে একটা বিনিময় প্রথা ছিল, গামছা দিয়ে ধান নিতে পারতেন, গোয়ালা দই দিয়ে কামারের কাছে থেকে দা নিতে পারতেন। এই বিনিময় প্রথাটি পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, নিজেদের ভেতরে আন্তঃনির্ভরশীল যে সম্পর্ক মানুষে-মানুষে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি অনেক বেশি বাড়ায়।

এমন একটি কৃষি ব্যবস্থা জরুরি, যে ব্যবস্থায় ধান রাখার জন্য মাটির মটকা দরকার, প্লাস্টিকের জিনিস নয়। বীজ রাখার জন্য দরকার বাঁশের তৈরি ডোল। তাহলে এই ডোল যারা তৈরি করেন সেই মণিঋষি বা রবিদাস জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, আর তার পেশাও টিকে থাকছে, যেটি প্রকৃতিক সম্পদনির্ভর একটি পেশা। যারা মাটির জিনিস তৈরি করছেন, আমরা সেগুলো ব্যবহার করতে পারছি। এভাবে সম্পদের ব্যবহার বিনিময়ের মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থা অনেক বেশি চাঙ্গা থাকছে। পাশাপাশি বাজারনির্ভর পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য এবং প্লাস্টিকের দূষণ থেকে দূরে থাকতে পারছি। বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রথম দেশ যে পলিথিন নিষিদ্ধ করেছে কিন্তু তার পরও আমরা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিশাল পরিমাণ পলিথিন প্লাস্টিক ব্যবহার করছি। এই পলিথিন এবং প্লাস্টিক কোনোভাবেই মাটির সঙ্গে মেশে না, কারণ এটি পচে না। তাহলে আমরা বিপজ্জনক জিনিসগুলো ব্যবহার বাদ দিয়ে আমাদের মাটি, বাঁশ কিংবা বাঁশের জিনিস ব্যবহার করতে পারি।

আমরা চারদিকে বর্জ্য দেখছি। প্রাকৃতিক কৃষি ব্যবস্থায় বর্জ্য বলে কিছু নেই। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো জরুরি। আমাদের খাবারের বাড়তি অংশ আমরা স্তূপ করে কোথাও রেখে দিতে পারি বা সেটি দিয়ে আমরা জৈব সার, গোবর সার কিংবা কেঁচো সার, জীবাণু সার বা তরল সার তৈরি করতে পারি। আমরা সেখান থেকে বালাই দমনের পদ্ধতিগুলোও খুঁজে নিতে পারি। এই যে ফসলের নানান রোগব্যাধি রয়েছে। আমাদের বুঝতে হবে, কোন কোন পোকামাকড় আমাদের জন্য বিপজ্জনক, কোনগুলো ক্ষতি করছে, কোনগুলো আমাদের উপকার করছে। আমরা মাকড়সা মেরে ফেলতে পারি না। আমরা প্রজাপতি, ফড়িং, মৌমাছি মেরে ফেলতে পারি না। কিন্তু আজকে জমিতে ব্যাপকভাবে বিষ বা কীটনাশক দেয়ার ফলে আমরা মৌমাছি হারিয়ে ফেলছি। আমরা যত বেশি মৌমাছি, ফড়িং বা প্রজাপতি হারাব, আমরা আমাদের শস্য ফসল আর পাব না। এই পোকামাকড়, মৌমাছিরা পরাগায়ণের মাধ্যমে গাছে গাছে মিলনের ব্যবস্থা করে দেয় এবং তারপরই গাছে গাছে ফুল এবং ফল হয়, যেগুলো আমরা শস্য হিসেবে পাই।

 

পাভেল পার্থ: গবেষক, প্রতিবেশ প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ

আরও