কেন্দ্রীভূত উন্নয়নের সুবিধা নিচে চুইয়ে পড়েনি

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে ৫০ বছরে দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে সন্তোষজনক একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। তবে এ উন্নয়নেরও কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে, যা স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে ৫০ বছরে দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে সন্তোষজনক একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। তবে উন্নয়নেরও কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আয় সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে, যা স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

আমাদের স্বাধীনতার মূল স্পিরিট ছিল রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্থনৈতিক মুক্তি। দুটোই আবার অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। দুটো ক্ষেত্রেই আমাদের করণীয় রয়েছে অনেক। উল্লিখিত দুটি বিষয়ের মধ্যে প্রথমটি নিয়ে সবাই ব্যস্ত উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টি অন্তরালে রয়ে গেছে। ভুললে চলবে না, উন্নয়নের প্রভাব সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে না পারলে জনমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে না। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রয়াস নিয়ন্ত্রণ ব্যাপকভাবে কেন্দ্রীভূত। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ণ, বাস্তবায়ন, আর্থিক ব্যয়সবই কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনেই হয়ে আসছে। একই সঙ্গে প্রশাসনও কেন্দ্রীভূত। ফলে দেশের উন্নয়নকার্য বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ গাজীপুরের মতো বড় বড় শহরভিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তারাও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কয়েকটি শহরকেই পছন্দ করেন। যদিও সবাই একই শহরের অধিবাসী নন। এর কারণ হলো অপেক্ষাকৃত উন্নত অবকাঠামো, শিক্ষা-স্বাস্থ্য বাসস্থানের সুব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বেশি। ঐতিহাসিকভাবেই এসব শহরে আপেক্ষিক সুবিধা বেশি ছিল। কাজেই এসব শহরকেই উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ-বসবাসের জন্য বারবার বেছে নিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারের নীতি কর্মকৌশল উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অনুকূলে গেছে। ফলে এসব শহর ঘিরে উন্নয়ন পুঞ্জীভূত হয়েছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, শুরু থেকেই আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বেশি জোর দিয়েছি। রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতিসহ অন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিগুলো সেভাবে সাজানো হয়েছে। কিন্তু সম্পদ বণ্টনে খুব একটা মনোযোগ দেয়া হয়নি। প্রবৃদ্ধিকে ব্যবচ্ছেদ করলে আমরা কৃষি, শিল্প, সেবা, বাণিজ্য, আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক প্রভৃতি খাত পাই। শুরুতে দেশীয় উৎপাদনে কৃষিই ছিল প্রধান খাত। এখনো শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষিতে নিয়োজিত। কিন্তু কৃষির উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি। মনোযোগ পেয়েছে কৃষি-বহির্ভূত খাত। বিশেষ করে বড় বড় শিল্প বাণিজ্য। নীতিনির্ধারকরা এসব খাতের উন্নয়নে নীতিসহায়তা জুগিয়েছেন। ব্যাংকাররাও শিল্পে অর্থায়ন করে খুব স্বস্তি অনুভব করেছে। কেন্দ্রীভূত উন্নয়নে নীতি অর্থায়ন দুটোই একই সঙ্গে ভূমিকা রেখেছে।

ধারণা করা হয়েছিল, বড় বড় শহরে শিল্প গড়ে উঠলে শিল্পায়ন জোরালো হবে, উন্নয়ন বেগবান হবে। ধীরে ধীরে এর সুফল দেশের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়বে। এটা ছিল নিছকই একটি ভ্রান্ত ধারণা। ওপর থেকে উন্নয়নের সুবিধা নিচে চুইয়ে পড়বে, এমন নীতি সফল হয়নি। চুইয়ে পড়ার জন্য দরকারি প্রতিষ্ঠান, ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটানো হয়নি। ফলে কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, বগুড়া, ভোলাসহ পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে শিল্প গড়ে ওঠেনি। গড়ে উঠেছে কয়েকটি জায়গায়। স্বভাবত অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও হয়েছে সেসব এলাকায় বেশি। সবাই বড় বড় শহরমুখী হয়েছে। ফলে সেখানে দ্রুত নগরায়ণ ঘটেছে। এক্ষেত্রে পুল ফ্যাক্টর ছিল সিটি লাইটের প্রতি আকর্ষণ। আর পুশ ফ্যাক্টর কাজ করেছে গ্রামে জমির খণ্ড-বিখণ্ডায়ন এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ। এভাবেই বড় শহর ঘিরে আমাদের প্রবৃদ্ধি উন্নয়ন হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশকিছু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছিল। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তার অধিকাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। এসবই আমাদের উন্নয়নের প্রাধিকার নীতির ফল। ফলে বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য বাড়ছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো দেখলে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। মধ্যম স্তরে বা প্রান্তিক অথবা মাঠ পর্যায়ে কিংবা পরিবার-ব্যক্তির জীবনমানে অর্থনীতির এসব সূচকের প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। দেখছি, দারিদ্র্য বেড়ে যাচ্ছে, পুষ্টির সমস্যা তৈরি হচ্ছে। শিশু-মাতৃস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আসল কথা হলো, সামষ্টিক অর্থনীতির সুফল যদি ব্যক্তি পর্যায়ে না পৌঁছে, তাহলে উন্নয়ন কোনো কাজে আসবে না। কারণ আসল বিষয় হলো মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, বিইআরসি, বিডা, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো, বেপজাসহ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নের ফ্যাসিলিটেটর। এসব প্রতিষ্ঠান সম্পদ আয় বণ্টনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। কারণে উন্নয়নের সুফল চুইয়ে নিচের স্তরে প্রবেশ করছে না। মাঝপথে আটকে যাচ্ছে, মধ্যস্বত্বভোগীরা এর সুফল ভোগ করছে বেশি। এক্ষেত্রে উন্নয়ন কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে।

কেন্দ্রীভূত উন্নয়নের পেছনে ব্যাংকগুলোরও একটা ভূমিকা রয়েছে। মানুষের যতই সৃজনশীলতা থাকুক, উদ্যমী পুঁজি না থাকলে কোনো শিল্পোদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় না। সেক্ষেত্রে ব্যাংকের অর্থ প্রাপ্তি একটা বড় ইস্যু। দুঃখজনকভাবে ব্যাংকগুলো সবসময়ই রিলেশনশিপ ব্যাংকিং করে। সম্পর্কের ভিত্তিতে বড় বড় গ্রাহককে ঋণ দেয়, আদায় হোক বা না হোক। বড় ঋণ দিলে সুবিধা বেশি, ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যয় কম হয়। গতানুগতিক ধারায় এটিই বাংলাদেশে নিয়মিত ভিত্তিতে হচ্ছে। ছোট মাঝারি উদ্যোগে (এসএমই) অর্থায়নের দিকে ব্যাংকগুলো যাচ্ছে না। এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো কভিড প্রণোদনা প্যাকেজ। এটা একটা সমন্বিত ভালো প্যাকেজ ছিল। কিন্তু বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সবাই প্রণোদনার ঋণ পেলেও ছোট মাঝারি উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত হারে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ ছাড় করেনি ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার তাগিদ দিলেও এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য।

ব্যাংকগুলোর কর্মকাণ্ডে নতুন কোনো সৃজনশীলতা কার্যকারিতা আসেনি। ফ্যাক্টরিং বা সিকিউরিটাইজশনেও খুব একটা অগ্রগতি নেই। ছোট ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বরাবরই অবহেলা প্রদর্শন করে এসেছে। ফলে ব্যাংকের ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠান আর কিছু অঞ্চলের মধ্যে। ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিক থেকে এটি একটি বড় দুর্বলতা। বড় শিল্পের একটা যদি দেউলিয়া হয়ে যায় তাহলে পুরো ব্যাংক বসে যাবে। ১০০ জনের মধ্যে একটি ছোট শিল্প বা উদ্যোক্তা লাখ টাকা করে ১০ জনও যদি খেলাপি হয়, তাহলে ৫০ লাখ টাকা খেলাপি হবে। কিন্তু একটা শিল্প যদি হাজার কোটি টাকা নিয়ে খেলাপি হয়, তবে তা অনেক ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের ঋণের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে ছোট শিল্প খেলাপি কম হয়। ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যথাসময়ে ঋণ ফেরত দেয়। তবু ব্যাংকগুলো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়নে বেশি আগ্রহী। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্পদ দায় ব্যবস্থাপনার মূলনীতির দিক থেকে এটি ব্যাংকারদের ব্যর্থতা।

বিকেন্দ্রীয় উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজার। বাজার অর্থনীতি বলতে সবকিছু যে অবাধে চলবে তা নয়। এক্ষেত্রে গ্রাহক স্বার্থ সুরক্ষায় তদারকি নজরদারি প্রয়োজন। আমাদের বাজার নজরদারি তদারকি খুব দুর্বল। বিশ্বের কোনো দেশেই বাজার এমন নিয়ন্ত্রণহীন নয়। ওইসব দেশে কোনো পণ্যের দাম বাড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট কমিশনের অনুমতি নিতে হয়। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তারাই দাম নির্ধারণ করে দেয়। দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ প্রমাণ করতে না পারলে কোম্পানিকে জরিমানাও করা হয়। এমনকি কোম্পানি অধিগ্রহণ বা একীভূতকরণের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারাই সেটি নির্ধারণ করে দেয়। আমাদের ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা অধিদপ্তর থাকলেও বাজারে তাদের প্রভাব নেই বললে চলে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থাকলেও জ্বালানি বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা খুবই গৌণ। গণশুনানিতে গিয়ে তারা যথাযথ যুক্তি দেয়, কিন্তু কোনো কাজ হয় না। এখানে সরকার ব্যর্থ কিংবা সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। বাজার তদারক করতে হবে। প্রয়োজনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণও করতে হবে। না হলে উন্নয়নের সুফল জনগণ পাবে না।

বাজার দক্ষ করে তোলায় সরকারি খাতেরও বড় ভূমিকা আছে। সরকারি খাত দক্ষ হলে ব্যক্তি খাতও দক্ষ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে দুর্নীতি সুশাসনের ঘাটতির ফলে সরকারি খাত কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না। সরকারি সেবা খাতগুলো দক্ষ নয়। সুযোগ নিয়ে বেসরকারি খাত উচ্চমুনাফা করছে আবার সেবারও মানও নিম্ন। স্বল্প খরচে সরকারি খাতে ভালো সেবা পেলে জনগণ বেসরকারি খাতের দিকে যাবে না। কাজেই সরকারি খাতকে দক্ষ করে তোলাও আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

তৃণমূল পর্যায়ে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিংবা বিসিকের মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ পরিসরের উন্নয়ন ওপরের দিকে আসার কথা। কিন্তু সেটি আসছে না। এর কারণ গ্রামের সঙ্গে শহরের সংযোগ ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। বড়দের সঙ্গে ছোটদের লিংকেজটা তৈরি হয়।

আমাদের অনানুষ্ঠানিক খাতই সবচেয়ে বড়। শ্রমশক্তির বড় অংশ খাতে নিয়োজিত। কিন্তু এর সঙ্গে বড় শিল্পের সংযোগ গড়ে ওঠেনি। এমনকি ভারতের মতো দেশে ৪২ শতাংশ জিডিপি আসে অনানুষ্ঠানিক খাত এসএমই থেকে। যদিও আমাদের দেশে জিডিপিতে এসএমই বা অনানুষ্ঠানিক খাতের অবদান ২৫ শতাংশ বলা হয়। প্রকৃত অর্থে এটি ১৫-২০ শতাংশের বেশি হবে না। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং সব দেশে একই অবস্থা। এসব দেশের জিডিপির বড় অংশ আসে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প থেকে, যাদের গড়ে ওঠা গ্রামে। সেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের অনেক কাজই ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান করে থাকে। বড় শিল্পের সঙ্গে ছোট শিল্পের লিংকেজ গড়ে উঠেছে। এটি ব্যয় সাশ্রয়ী, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী।

আবার লিংকেজের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যগুলো অভ্যন্তরীণ বাজার বা রফতানি বাজারে যাবে। আমাদের দেশে তা হয়নি। আমাদের রফতানি খাত এক খাতনির্ভর। রফতানি বৈচিত্র্য নেই। গুটিকয়েক পণ্যের মধ্যেই রফতানি আয় সীমাবদ্ধ। চীন বিচিত্র পণ্য রফতানি করে। পশ্চিমা দেশে চীনের তৈরি অনেক পণ্য রফতানি হয়। সেগুলো তৈরি হয় চীনের গ্রামাঞ্চলে। ওইসব পণ্য চলে যায় ওয়ালমার্ট কসকোর মতো সুপারশপে। চীনে গ্রামের সঙ্গে শহরের লিংকেজটা আছে। সরকারের ট্রেড অর্গানাইজেশন বা এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশন কার্যকর সংযোগ তৈরি করে দিয়েছে। কমিউনিস্ট দেশ হলেও ন্যূনতম মার্কেট প্রিন্সিপাল সেখানে আছে। আমাদের দেশে সেটি নেই। আমাদের কটেজ ইন্ডাস্ট্রিগুলো বেশির ভাগই সাবকন্ট্রাক্টভিত্তিক। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিকরা গিয়ে গ্রামীণ নারীদের সাবকন্ট্রাক্ট দেয়, সেলাই করতে বলে; সেলাই করার টাকা ছাড়া ওই নারীর কোনো লাভ নেই। ফিলিপাইনেও সংযোগ শিল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে লিংকেজ এখনো তৈরি হয়নি। লিংকেজ না থাকায় গ্রামাঞ্চলে তৈরি হওয়া পণ্য রফতানি হতে পারছে না। এটা আমাদের দেশের আরেকটি বড় দুর্বলতা। এভাবে উন্নয়ন হলে নিচের সঙ্গে ওপরের কোনো সংযোগ তৈরি হবে না। উন্নয়নের সুফলের সুষম বণ্টন হবে না। প্রথমত, মনোযোগটা ওপরের দিকে। দ্বিতীয়ত, নিচের দিতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে টেনে তোলার কার্যকর উদ্যোগ নেই। আমরা গ্রামীণ শিল্প বা নারীদের এগিয়ে নিতে প্রণোদনার কথা বলছি। কিন্তু এত জটিল প্রক্রিয়ায় তারা সুবিধাগুলো পাবে না। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সচেতনতা তৈরি করা। মানুষকে অবাধ তথ্য দিতে হবে। এখানে বেশ দুর্বলতা রয়েছে, যা দূর করা প্রয়োজন।

কেন্দ্রীভূত উন্নয়নের আরেকটি বড় কারণ আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যালয় ঢাকায়। ফলে কাজ করতে সবাইকে ঢাকায় আসতে হয়। মাঝে কিছু প্রতিষ্ঠান ঢাকা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সফল হয়নি। দৃষ্টিভঙ্গি সুষম বিকেন্দ্রীয় উন্নয়নের পরিপন্থী। প্রতিষ্ঠানগুলোর হেডকোয়ার্টার স্থানান্তর করলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে। দুঃখজনকভাবে সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। যুক্তরাষ্ট্রে একেকটা অফিস একেক অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। নিউইয়র্কে স্টক মার্কেট, শিকাগোতে গ্রেইন মার্কেট, ক্যালিফোর্নিয়া-লস অ্যাঞ্জেলেসে সিলিকন ভ্যালি, আটলান্টায় আইটি, টেক্সাসে বিগ ক্যাটেল ইন্ডাস্ট্রি প্রভৃতি। ইউরোপেও তাই। কারণে তাদের উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকেন্দ্রীকরণ যেমন দরকার, তেমনি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণও।

সংবিধান অনুসারে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, বিভাগীয় পর্যায়ের পরিষদএগুলো যথাযথভাবে কার্যকর নয়। অনেক আগেই প্রস্তাব করেছি, একটা লোকাল গভর্নমেন্ট ফাইন্যান্স কমিশন করতে হবে। তারা ঠিক করবে স্থানীয় সরকারের বাজেট কী হবে, জাতীয় বাজেটে নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ তাদের দিতে হবে, তারাই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ বাস্তবায়ন করবে। প্রক্রিয়া ভারতে আছে। বাংলাদেশে এমন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে আগামীতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও বড় বড় বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক নয়। হয়তো শহরভিত্তিক, কিন্তু অতিমাত্রায় রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। যেমন ভারতে চেন্নাই, মুম্বাই, কলকাতা রাজধানী নয়, কিন্তু বেশির ভাগই ব্যবসায়িক কেন্দ্র। একইভাবে ইসলাবাদ রাজধানী হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের তীর্থকেন্দ্র করাচিসহ দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে আছে। সবচেয়ে ক্ল্যাসিক উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে নিউইয়র্ক কোনোদিনই প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল না। ক্যালিফোর্নিয়া, সানফ্রান্সিসকো, আটলান্টা এসব অঙ্গরাজ্য হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের হাব। কানাডায়ও একই অবস্থা। রাজধানী অটোয়ার বাইরে ভ্যানকুভার, টরন্টো প্রভৃতি শহর ব্যবসা-বাণিজ্যের হাব। আমাদের দেশে ঠিক উল্টো। এখানে প্রশাসনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র এক হয়ে গেছে। ফলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক ব্যবসায়ী খুব কাছেই চলে এসেছে। এজন্য নীতি সাম্যের ক্ষেত্রে বিরাট বিচ্যুতি ঘটেছে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে কিংবা ব্যবসার সুযোগ-সুবিধাগুলো অন্য জায়গায় সহজেই পাওয়া গেলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এক জায়গায় ব্যবসা-বাণিজ্য প্রশাসনের কেন্দ্রীভবন হতো না।

পরিশেষে বলব, গণতন্ত্র, সুশাসন উন্নয়ন এগুলোকে আলাদাভাবে দেখলে চলবে না। উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসন লাগবে। সর্বোপরি প্রয়োজন হবে গণতন্ত্র। তিনটাকে এক করতে হবে। তিনটিই অবিচ্ছেদ্য। একটি ছাড়া অন্যটি হলে উন্নয়ন অসমতা তৈরি করবে। গণতন্ত্র, সুশাসন উন্নয়নতিনটার মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। তবেই আমাদের দেশে সত্যিকার উন্নয়ন হবে। তখন কেন্দ্রীভূত উন্নয়ন না হয়ে বিকেন্দ্রীয়করণ হবে। তখনই বাংলাদেশ একটা কল্যাণকামী রাষ্ট্র হবে, যা আমরা নরডিক দেশ নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশে দেখি। সেখানে পৌঁছতে সময় লাগবে। কিন্তু প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

 

. সালেহউদ্দিন আহমেদ: সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

আরও