স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করার রেওয়াজ আছে; আমার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, এখনো রয়েছে, মাতৃসম। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আমাকে এমন স্নেহে এবং এতটা সময় ধরে শেখায়নি। সময়টাও কিন্তু বেশ দীর্ঘ। বিশ্ববিদ্যালয় একশ বছরে পা রাখছে, আমার সঙ্গে এর সম্পর্ক ৬৯ বছরের। এসেছিলাম সেই ১৯৫২-তে, তার পরে প্রথম চার বছর ছাত্র এবং অনেক বছর শিক্ষক হিসেবে কাটিয়েছি; এখনো রয়ে গেছি। সবটা সময়ই কিন্তু ছিল শেখার, সে শেখার এখনো শেষ হয়নি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করার রেওয়াজ আছে; আমার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, এখনো রয়েছে, মাতৃসম। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আমাকে এমন স্নেহে এবং এতটা সময় ধরে শেখায়নি। সময়টাও কিন্তু বেশ দীর্ঘ। বিশ্ববিদ্যালয় একশ বছরে পা রাখছে, আমার সঙ্গে এর সম্পর্ক ৬৯ বছরের। এসেছিলাম সেই ১৯৫২-তে, তার পরে প্রথম চার বছর ছাত্র এবং অনেক বছর শিক্ষক হিসেবে কাটিয়েছি; এখনো রয়ে গেছি। সবটা সময়ই কিন্তু ছিল শেখার, সে শেখার এখনো শেষ হয়নি।

শিখেছি ক্লাসরুমে, গ্রন্থাগারে, শিক্ষক ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে এবং সহপাঠীদের সান্নিধ্যে। প্রথম বছরেই আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলাম, নির্বাচিতও হয়েছিলাম; পরের তিন বছর প্রতিটি নির্বাচনে আমার অংশগ্রহণ ছিল। আবার শিক্ষক হিসেবে নয় বছর আমি ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ ছিলাম। সামাজিকতার শিক্ষাটা যে কত জরুরি উপকারী সেটা আমি বুঝেছি ছাত্র সংসদের সঙ্গে ওই সংযোগ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন কিন্তু অপূর্ণ থাকে ছাত্র সংসদ কাজ না করলে। সামাজিকতা শেখার আরেকটি জায়গা ছিল। সেটা হলো সাবসিডিয়ারি ক্লাস। অনার্স ক্লাসে আমরা ছিলাম মাত্র ১২ জন; পলিটিক্যাল সায়েন্সের সাবসিডিয়ারিতে কমপক্ষে ৬০ জন হবে। সেখানে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব। সে বন্ধুত্ব পরের দিনগুলোতেও অক্ষুণ্ন ছিল।

আমার জন্য মস্ত বড় আকর্ষণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গ্রন্থাগারটি। ছাত্রজীবনে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষ পর্যন্ত ছিল আমার দৌড়, তার ভেতরের জগত্টা ছিল অনধিগম্য অতীব আকর্ষণীয়। শিক্ষক হিসেবে গ্রন্থাগারে অবাধ বিচরণের সুযোগ আমাকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে এবং আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছি তার একটা কারণ ছিল ওই গ্রন্থাগার।

শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল দুটি বৈশিষ্ট্য। একটি তার আবাসিক চরিত্র, অন্যটি তিন বছরের অনার্স কোর্স। আবাসিক হলগুলোকে জীবন্ত রাখত ছাত্র সংসদের বার্ষিক নির্বাচন এবং বছরজুড়ে সংসদের সাংস্কৃতিক কাজকর্ম। দ্বিতীয় বর্ষে দুটো সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিয়ে আমরা ভারমুক্ত হতাম, পরের বছর পুরোপুরি এবং কেবলই অনার্সের বইপত্র পড়া। ওই তৃতীয় বর্ষে নতুন যা পড়েছি সেসব তো বটেই, আগের দুই বছরে যা পড়েছিলাম তাও পুনর্পাঠ ঘটত। অনার্সের পাঠ্যবিষয়টা একসঙ্গে পেতাম। সে ব্যবস্থাটা কিন্তু এখন আর নেই। কোর্স সেমিস্টার সিস্টেম এসে তিন বছরের সংবদ্ধ শিক্ষাক্রম পাঠ্যসূচিকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা তৃতীয় বর্ষে আসে প্রথম দুই বছরের বইপত্র কাগজখাতা দূরে সরিয়ে রেখে। অনভ্যাসে বিদ্যালয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের সময়ে টিউটোরিয়ালের ব্যবস্থা ছিল। চার-পাঁচজনের গ্রুপে একজন শিক্ষকের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে একবার মিলিত হতাম। সেখানে আমরা লিখতাম, বলতাম শুনতাম। তিনটাই ছিল খুব উপকারী। এখন তাও গেছে চলে।

ভাংচুরটা কিন্তু শিক্ষাগত বিবেচনায় ঘটেনি, ঘটেছে রাজনৈতিক কারণে। রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল দুই বছর পেরিয়ে সাবসিডিয়ারি এবং তিন বছরের শেষে অনার্সের পরীক্ষার বদলে ছয় মাস পর পর পরীক্ষা নেয়া হবে, ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় অস্থির থাকবে, ঘাড় তোলার সময় পাবে না; তারা রাজনীতি ছাড়বে। ওই একই কারণে ছাত্র সংসদের নির্বাচনও একসময় বন্ধ হয়ে গেল। ফলটা শুভ হয়নি। শিক্ষার জন্য নয়, সমাজের জন্যও নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বারবার ঘটেছে। বড় আকারে ঘটে ১৯৫২ সালে, অবিশ্বাস্য রকমের ভয়াবহ মাত্রায় ঘটেছে ১৯৭১-এ। দুটি ঘটনারই আমি প্রত্যক্ষদর্শী। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি পুরনো কলা ভবনের আমতলার জমায়েতে আমিও ছিলাম; কাঁদানে গ্যাসের মোকাবেলায় সেটিই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। আবার একাত্তরে পঁচিশে মার্চের রাতেও আমি উপস্থিত, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা হিসেবে। রাষ্ট্র অস্ত্র হাতে আক্রমণ করল, রক্তপাত ঘটাল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলো। পরাজয় দুবারই। এবং বিশ্ববিদ্যালয় যে শক্তির প্রতিভূ তার কাছেই।

বায়ান্নর শেষদিকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন নতুন স্বাধীনতার এবং পাকিস্তানবাদিতার আবহাওয়াটা যে একেবারে কেটে গেছে তা নয়। রাষ্ট্রকে ভাঙার কথাও ওঠেনি। দাবিটা ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। ঘটনার কয়েক বছর পরে আমাদের শিক্ষক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন একটি প্রবন্ধে ভাষা আন্দোলনকে ল্যাঙ্গুয়েজ রায়ট বলেছিলেন। এই মনোভাব তার একার নয়, অন্য কারো কারো মধ্যেও ছিল। আবার যে জায়গায় পুলিশের গুলিতে বরকত শহীদ হলেন তার কাছেই, ১০ বছর আগে নাজির আহমদ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র প্রাণ হারিয়েছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্রদের ছুরিকাঘাতে। সেই স্মৃতি যে একেবারে মুছে গিয়েছিল তাও নয়; কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ দ্রুত এগোচ্ছিল। মুনীর চৌধুরী আমাদের বিভাগের শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু ক্লাসরুমে তাকে আমরা পেলাম না, কারণ তখন তিনি জেলে। অপরাধ ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পর্ক। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ পরীক্ষা দিয়ে খুব ভালো ফল করলেন এবং যখন বের হয়ে এলেন তখন আর ইংরেজি বিভাগে রইলেনই না, বাংলা বিভাগে চলে গেলেন। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে বাঙালি জাতীয়তাবাদই মূলধারায় পরিণত হবে। আমাদের শিক্ষক খান সারওয়ার মুর্শিদ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইংল্যান্ডে যাওয়ার; তার সঙ্গে . সাজ্জাদ হোসায়েনের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল; ইংল্যান্ডে তারা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট করেছেন। দুজনেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী ছিলেন, এক সময়ে যেটা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা গেল তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন; কারণ . হোসায়েন পাকিস্তানপন্থীই রয়ে গেলেন, . মুর্শিদ এগিয়ে গেলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে। শেষ পর্যন্ত দুজনের ভেতর কথাবার্তাই বন্ধ হয়ে গেল। একই ঘটনা ঘটেছিল . হোসায়েনের সঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সম্পর্কের বেলায়ও। অধ্যাপক রাজ্জাক যখন শিক্ষক . হোসায়েন তখন ছাত্র। এক সময়ে দুজনেই ছিলেন পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী, তাদের সম্পর্কটাও ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ; কিন্তু ১৯৬৫-এর যুদ্ধের পর সে সম্পর্কটা আর রইল না, ওই জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই।

আইয়ুব খানের শাসনামলে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে পোক্ত করার চেষ্টা নিরন্তর চলছিল। কাজে রাষ্ট্রক্ষমতা যত তত্পর হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তি ততই বেড়েছে। আইয়ুব খান আরেক কাণ্ড করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি সরকারি দপ্তরে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তার সামরিক শাসনের শুরুতেই ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি হামুদুর রহমানকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করে বসিয়ে দিয়েছিলেন। এই উপাচার্য হুকুম জারি করেছিলেন ক্লাস থাকুক না-থাকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১০টা-৫টা অফিস করতে হবে। সে সময়ে কলা অনুষদের ডিন ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হালিম, তিনি উপাচার্যকে গিয়ে বললেন, ১০টা-৫টার জোয়ালে আটক থাকলে শিক্ষকরা নিজেদের পড়াশোনা গবেষণা করবেন কখন? উপাচার্য তাকে বলেছিলেন, পড়াশোনা করছেন বলেই তো আপনাদের চাকরি দেয়া হয়েছে, আবার কী? উপাচার্যের ওই হুকুম প্রচুর হাস্যরসের সৃষ্টি করেছিল এবং অবশ্যই তার হুকুম বহাল থাকেনি; কিন্তু এর রাষ্ট্রের সামরিক শাসকরা যা করেছিল সেটা ছিল আরো মারাত্মক। তারা এমন একটি আইন জারি করল, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বলতে কোনো কিছু আর অবশিষ্ট রইল না। এটা শুধু যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জারি করা হয়েছিল তা নয়, পাকিস্তানের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই একই রকম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। স্বভাবতই প্রতিবাদ হয়েছে এবং সেটা সারা পাকিস্তানেই। তাই দেখা গেছে ছাত্ররা যখন আইয়ুব শাহির পতন চেয়ে আন্দোলন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তখন আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার ব্যাপারে স্বাধীনতার জন্য। সেই স্বাধীনতা পাওয়া গেল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন একটা অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে। আমরা ভাবলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা যাবে। উপাচার্য, ডিন, সিন্ডিকেট, সিনেটসর্বত্রই নির্বাচনের বিধি তৈরি হলো।

কিন্তু দেশে যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমনি, গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়নি। আমরা আশা করছিলাম গণতন্ত্রের চর্চার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় হবে

অগ্রপথিক, সেটা ঘটল না। অভিযোগ আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বড় বেশি দলাদলি করেন। কথাটা অর্থসত্য মাত্র। নির্বাচনী ব্যবস্থা আছে, একা একা নির্বাচন করা যায় না, তাই নির্বাচনী জোট তৈরি হয়েছে; ভিত্তিটা ছিল মতাদর্শগত ভিন্নতা। সেটা কোনো খারাপ ব্যাপার নয়। শিক্ষকতা কখনই তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ছাত্রদের মধ্যে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হননি। নির্বাচন ব্যবস্থার ফলে দুটি ভালো জিনিস

পাওয়া গিয়েছিল, একটি হলো শিক্ষকদের ভেতর পরিচিতি গড়ে তোলা। দ্বিতীয়টি, এই বোধ তৈরি হচ্ছিল যে শিক্ষকদের ভেতর জ্ঞান বয়সের পার্থক্য অবশ্যই সত্য কিন্তু এটাও সত্য যে শিক্ষক হিসেবে তারা একই সমতলে রয়েছেন। এক কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অধ্যাদেশ আমাদের সামন্তবাদী সংস্কৃতির বলয় থেকে বের হয়ে গণতন্ত্রের প্রশস্ত ক্ষেত্রে আসার সুযোগ করে দিয়েছিল। গণতন্ত্রের সুফল যে পুরোপুরি পাওয়া যায়নি তার দায় গণতন্ত্রের নয়, দায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের। ঘটনাটা আমরা ঘটতে দেখলাম, কিন্তু থামাতে পারলাম না। এক সময়ে দেখা গেল সাদা নীল উভয় গোষ্ঠীর কিছু শিক্ষক বড় দুই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। রাজনৈতিক নেতাদেরও আগ্রহ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতরে সমর্থক জোগাড় করার। এভাবেই বাইরের দলীয় রাজনীতিটা চলে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতরে। ক্ষুণ্ন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দেয়া কনসেশন হিসেবে; শাসক বদল হয়েছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন হয়নি।

রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ আরেকভাবে ঘটছিল। সেটা হলো মেধাবান তরুণদের সরকারি চাকরিতে টেনে নিয়ে যাওয়া। সরকারি চাকরিতে ক্ষমতা, উন্নতি অর্থ, তিনটিরই প্রাপ্তির যে সুযোগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় তা ছিল না। যে তরুণরা শিক্ষক হলে তাদের নিজেদের জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য ভালো হতো তারা অনেকেই সরকারি চাকরিতেই চলে গেছেন। এটা ব্রিটিশ আমলে ঘটেছে, পাকিস্তান আমলে তো কমেইনি, বরং বেড়েছে। দেখা যেত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় যারা ভালো ফল করেছেন তারা সরাসরি সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার লক্ষ্যে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন প্রস্তুতির সময়টা কাটানোর জন্য। আমি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেয়েছিলাম সেটা অত দ্রুত সম্ভব হতো না, যদি না আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সিভিল সার্ভিসে চলে যেতেন। সেকালে পদ খালি না হলে নতুন নিয়োগের কোনো সুযোগ ছিল না; আর পদসৃষ্টি ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আমার পিতা সরকারি চাকরি করতেন, তিনিও চেয়েছিলেন আমি সিভিল সার্ভিসমুখো হই এবং না-হওয়াতে যে মনঃক্ষুণ্ন হননি এমন নয়। রাষ্ট্র টানত, বিশ্ববিদ্যালয়ও ঠেলে দিত, কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে সুযোগ-সুবিধাগুলো ছিল অত্যন্ত সীমিত।

বায়ান্নতে যখন প্রবেশ করি তখন আমাদের বিভাগে শিক্ষক ছিলেন অল্প কয়েকজন। অমলেন্দু বসু গিয়েছিলেন অক্সফোর্ডে, ডক্টরেট শেষ করে তিনি আর ঢাকায় ফিরে আসেননি, দেশভাগের কারণে। প্রফেসর জি স্টক এসেছিলেন অক্সফোর্ড থেকে, সাতচল্লিশের আগস্টের অল্পকিছু আগে। শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত খ্যাতিমান ছিলেন, পণ্ডিত হিসেবেও এবং উপনিবেশবাদবিরোধী ছিলেন দৃষ্টিভঙ্গিতে, যে জন্য তার ঢাকায় আসা। সাতচল্লিশের পর থেকেই ছাত্র বিক্ষোভে বিশ্ববিদ্যালয় তপ্ত হয়ে উঠছিল, প্রফেসর স্টক টের পাচ্ছিলেন যে তাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে; তার চিঠিপত্র গোয়েন্দারা নাড়াচাড়া করছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ভাবলেন সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেয়া ভালো। সেটাই তিনি করেছেন, চলে গেছেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আগেই। আমরা তাকে পাইনি। তবে আমাদের অনার্সের মৌখিক পরীক্ষা নিতে তিনি এসেছিলেন। প্রফেসর স্টক কিন্তু আবারো এলেন এবং এবারো স্বেচ্ছায়; একাত্তরের পরে। . মুর্শিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, ব্যবস্থাটা তিনিই করেছিলেন। একান্নতে প্রফেসর স্টক চলে গিয়েছিলেন যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ দেখে, বাহাত্তরে এসে তারই বিজয় দেখতে পেলেন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রীয় সামাজিক পরিস্থিতি যে তাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল এমনটা মনে হয়নি। এক বছর থাকার পর তিনি চলে গেলেন। যাওয়ার আগে অবশ্য একটি বই লিখে গেছেন, মেময়ার্স অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি নাইনটিন ফরটি সেভেন-ফিফটিওয়ান নামে। চমত্কার বই। উপন্যাসের মতো। স্টকের পরে আরেকজন ইংরেজ এসেছিলেন, প্রফেসর বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। নাম জে এস টার্নার। তার সময়ে আমরা ছাত্র। তিনি ছিলেন অনেকটা দার্শনিকের মতো। প্রিয় কবি ছিলেন মিল্টন ওয়ার্ডসওয়ার্থ; তিনি ওই দুই কবির কবিতা পড়াতেন এবং আমরা টের পেতাম খুব আনন্দ পাচ্ছেন পড়িয়ে এবং সচেষ্ট রয়েছেন নিজের আনন্দকে আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে। ১৯৭২- তিনিও একবার এসেছিলেন তার প্রিয় ঢাকা পূর্ববঙ্গকে দেখতে। তখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তার সঙ্গে দেখা কলকাতার এক সেমিনারে, যেখানে আমি বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ গণতন্ত্রের ওপর একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম; তিনি শুনলেন এবং শুনে বললেন, তা ভালোই লিখেছ হে, কিন্তু বেশ পলিটিক্যাল মন্তব্যটা মনে আছে। সাহিত্যে পাঠদানের আরেকটি ধরন ছিল, সেটি ব্যাখ্যা করা, শব্দের অর্থ স্পষ্ট করা, উপমাগুলোর তাত্পর্য তুলে ধরা। এই রীতিতে পড়াতেন বি সি রায়। পড়তেন; এবং পড়াতে ভালোবাসতেন। ছিলেন অকৃতদার। ছাত্রজীবনে তো বটেই, যখন শিক্ষক হয়েছি তখনো টের পেয়েছি তেভরে ভেতরে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ। ধুতি পরে আসতেন; কিন্তু সে পরিধেয়তে থাকতে পারলেন না, ১৯৬৪-এর দাঙ্গার পরে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁর শুভার্থীরা তাকে পোশাক বদলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন; বদলানো পোশাকে কয়েকদিন এসেছেনও; কিন্তু কাজটা তার কাছে কতটা অপমানজনক মনে হয়েছে জানি না, আমরা কিন্তু অপরাধী মনে করেছি নিজেদের। আমি তো চোখ তুলে তার দিকে তাকাতেই পারিনি; লজ্জায় অপরাধবোধে। এরপর অবশ্য তিনি বেশিদিন আমাদের সঙ্গে থাকেননি, অবসর গ্রহণ করে কলকাতায় চলে গেছেন। শিক্ষা ছুটি নিয়ে কেমব্রিজ গিয়েছিলেন সৈয়দ আলী আশরাফ, তিনি ফিরে এসেছিলেন আমরা যখন প্রথম বর্ষের ছাত্র তখনই। সাহিত্যপাঠে তখন নতুন একটি রীতির প্রবর্তন ঘটছিল; সেটা ছিল টেক্সটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ; বৈজ্ঞানিকভাবে নয়, নান্দনিকভাবেই। পদ্ধতিতে সাহিত্যপাঠ সাহিত্যের মর্মোদ্ধার আরো গভীর হতো। সৈয়দ আলী আশরাফ ওই রীতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বেশিদিন রইলেন না, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার উপস্থিতিটা ছিল খুবই উজ্জ্বল। আমরা জানতাম তিনি এমএন রায়ের রাজনৈতিক মতাদর্শে আস্থাবান ছিলেন; যে আস্থার প্রতিফলন ঘটেছিল মুকিত নামে একটি সাহিত্যপত্রিকার মধ্যে। পত্রিকাটি তিনি যে সম্পাদনা করতেন তা নয়। তবে তিনি ছিলেন পেছনের অনুপ্রেরণা। মুকিত কেবল যে নামের ওই বানানের জন্য বিশিষ্ট ছিল তা নয়, সেখানে যে আলোচনাগুলো বের হতো সেগুলোও ছিল মনোযোগ দিয়ে পড়ার মতো। কিন্তু পত্রিকাটি টেকেনি। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা তার স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতা ছিলেন

মনেপ্রাণে শিক্ষক; তারা দেশ ছেড়ে যাবেন এমনটা কখনো ভাবেননি; যাকে বলে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা অনেকটা সেভাবেই রয়ে গেলেন, এবং আমাদের এই শিক্ষক, যার উপস্থিতিতে আমরা অনুপ্রাণিত বোধ করতাম। তিনি চলে গেলেন একাত্তরে, পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণে।

তা একাত্তর আমাদের জন্য কেমন অভিজ্ঞতা ছিল তা বর্ণনা করা কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আক্রমণের প্রথম কেন্দ্রগুলোর একটি। ওই আক্রমণে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী কোনো বাছবিচার করা হয়নি। পরে ১৪ ডিসেম্বর ঘটেছে নির্বাচিত হত্যাকাণ্ড পঁচিশে মার্চ আমরা বেঁচে গেছি আমাদের আবাসিক এলাকাটিতে হানাদাররা ঢোকেনি বলে, পরে আমি বাঁচলাম পলাতক থাকার দরুন। আল-বদর যাদের খুঁজেছিল আমিও তাদের একজন ছিলাম। সামরিক প্রশাসক হিসেবে বিদায় নেয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছয়জন শিক্ষককে সতর্ক করে দিয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে আমিও একজন। ওই প্রথম শেষবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়টা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনিরাপদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছাত্রকালের বিভাগীয় পাঠ্যসূচি সম্পর্কে একটু বলি। পাঠ্যসূচি ছিল খুবই সংকীর্ণ, বলা যায় দরিদ্র। ধরা যাক, আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের তিনজন প্রধান ঔপন্যাসিককনরাড, ফরস্টার লরেন্সের কথা, তারা কেউই কিন্তু আমাদের সময়কার পাঠ্যসূচিতে স্থান পাননি। কারণ হতে পারে দুটোএকটি ভিক্টোরীয় নীতিবোধের অবশেষের উপস্থিতি, অন্যটি হয়তো মফস্বলের শিক্ষার্থীদের প্রতি কর্তৃপক্ষের করুণা। তা শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন কর্মক্ষেত্রেও ঘটেছে। প্রথমদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের তেমন একটা পাত্তা দেয়া হতো না, বিশেষভাবে চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে; পরে অবশ্য সেটা কেটে গেছে। তবে আমার মনে পড়ে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে একজন অধ্যাপিকার পড়ানোর কথা। তিনি আমাদের পড়িয়েছেন দ্য রেইপ অব লক নামের দীর্ঘ কবিতাটি। এমনভাবে পড়ালেন যেন আমরা স্কুলের ছাত্রছাত্রী।

আমরা টের পাচ্ছিলাম যে আমেরিকার চোখ পড়েছে পূর্ব বাংলার ওপর। তাদের ভয় ছিল কমিউনিজমের। শুরুতে পাঠ্যসূচিতে কোনো আমেরিকান লেখকের উপস্থিতি ছিল না; কিছুদিন পরে দেখা গেল আমেরিকান সাহিত্য বলে একটি বিকল্প পত্র এসে গেছে। বইপত্র সব আমেরিকার দূতাবাস থেকে আসছে। বৃত্তিও দেয়া হচ্ছে আমেরিকায় যাওয়ার। আরো পরে দেখেছি বরিস পাস্তারনেকের . জিভাগো উপন্যাসটির কপি বিনা মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে শিক্ষকদের মধ্যে, কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমের বেনামিতে।

আগে বৃত্তি পাওয়া যেত ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে, উচ্চশিক্ষার জন্য আমি যে বিদেশে গিয়েছিলাম সেটা ব্রিটিশ বৃত্তিতেই; পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে যুক্ত হলো আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ। ততদিনে রাষ্ট্রীয়ভাবে আমেরিকা পাকিস্তানের ঘাড়ে বেশ ভালোভাবেই সওয়ার হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাদের চোখ তো পড়বেই। মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে যাওয়া হলো আমেরিকায়, ভাষাতত্ত্ব পড়ার জন্য। তিন মাসের লিডারশিপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে শিক্ষকদের কেউ কেউ গেলেন শিক্ষাভ্রমণে। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনও গিয়েছিলেন এবং আমেরিকা থেকে কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায়। ১৯৫৮ সালে রকফেলার ফাউন্ডেশন আমাদের ইংরেজি বিভাগকে বেশ বড় অংকের একটা অনুদান দিয়েছিল সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের ওপর আটটি সেমিনার করার জন্য। ওদিকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ইংরেজদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা পরিবর্তন দেখা গেল, তারা সাহিত্যপাঠের জন্য বৃত্তি না দিয়ে ভাষার পঠন-পাঠন লেখার জন্য বৃত্তি দেয়ায় আগ্রহী হয়ে উঠল। ধারণাটা হয়তো এই ছিল যে সাহিত্য হলো গিয়ে ওপরকাঠামোর ব্যাপার, ভাষা শেখাতে পারলে সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করা যাবে এবং বাণিজ্যিকভাবেও ওই শিক্ষাদান লাভজনক হবে।

আমরা যখন ছাত্র তখন রেডিওর প্রচারকেন্দ্রটি ছিল কলাভবনের খুব কাছে, নাজিমুদ্দিন রোডে। ওই ভবন আমাদের খুব টানত; সেখানে শিক্ষকরা যেতেন, আমরা ছাত্ররা যাদের অল্পস্বল্প লেখার অভ্যাস তারাও যাতায়াত করতাম। সেটা ছিল একটি বিশেষ সুযোগ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য, সে ঋণ যত বেড়েছে বহন করে ততই আমি সাবালক হয়েছি।

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও