পোশাক
রফতানিতে কোটামুক্ত
হওয়ার পর
২০০০-২০১০
দশকে দেশের
রফতানি খাতের
অস্তিত্ব নিয়ে
সংশয় দেখা
দেয়। তবে
সফলভাবে সেই
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা
করে এ
দশকেই আন্তর্জাতিক
বাণিজ্যে রফতানি
পাওয়ার হাউজে
পরিণত হয়েছে
বাংলাদেশ। বিশ্বায়নের
প্রেক্ষাপটে ওই
সময় সরকারি
নীতি সুবিধা
আদায়ে বেশ
বেগ পেতে
হয় পোশাক
খাতের নেতাদের।
রফতানি
খাতসংশ্লিষ্টদের সফলতার
কারণে ২০০০
সালের দিকে
এ শিল্প
খাতে সরাসরি
কর্মসংস্থান হয়
১৪ লাখের
বেশি লোকের,
যার মধ্যে
শতকরা প্রায়
৮০ জন
মহিলা। তৈরি
পোশাক শিল্পের
সম্প্রসারণের সঙ্গে
সঙ্গে বস্ত্র,
সুতা, আনুষঙ্গিক
উপকরণ, প্যাকেটজাতের
উপকরণ ইত্যাদি
শিল্পেরও সম্প্রসারণ
হতে থাকে।
পরিবহন, ব্যাংকিং,
শিপিং ও
ইন্স্যুরেন্স সেবার
চাহিদাও বৃদ্ধি
পেতে থাকে।
এর সবটাই
অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের
সৃষ্টি করে।
এ ধরনের
নতুন পরোক্ষ
কর্মসংস্থান মূলত
তৈরি পোশাক
শিল্প কর্তৃক
সৃষ্টি, যার
সুবিধাভোগী মোট
দুই লাখ
শ্রমজীবী।
বাংলাদেশ
থেকে তৈরি
পোশাকের প্রথম
চালানটি রফতানি
হয় ১৯৭৮
সালে। এর
পরই বিদেশী
ক্রেতাদের আগ্রহ
বেড়ে যায়
এবং এ
শিল্প দ্রুত
বেড়ে ওঠে।
১৯৮১-৮২
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে
গার্মেন্টস শিল্পের
তেমন কোনো
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
ছিল না।
অথচ মাত্র
১০ বছরের
ব্যবধানে বাংলাদেশের
পোশাক রফতানির
পরিমাণ ১৯৯২-৯৩
সালে ১৪৪
কোটি ৫০
লাখ মার্কিন
ডলারে উন্নীত
হয়। এরপর
থেকে বাংলাদেশকে
আর পেছনে
ফিরে তাকাতে
হয়নি। দিনকে
দিন পোশাক
রফতানির পরিমাণ
বেড়েই চলেছে।
যেখানে ২০১১-১২
অর্থবছরে সর্বমোট
পোশাক রফতানির
পরিমাণ ছিল
১ হাজার
৯০৮ কোটি
৯৭ লাখ
৩০ হাজার
ডলার। ১৯৮১-৮২
সালে মোট
রফতানি আয়ে
এ খাতের
অবদান ছিল
মাত্র ১
দশমিক ১
শতাংশ। ২০১০
সালের মার্চে
তৈরি পোশাক
শিল্পের অবদান
দাঁড়িয়েছে মোট
রফতানি আয়ের
৭৬ শতাংশ।
সময়ের
পরিক্রমায় তৈরি
পোশাক আরো
সম্প্রসারিত হয়ে
ওভেন ও
নিটিং উপখাতে
বিভক্ত হয়।
২০০২ সালে
পোশাক রফতানিতে
ওভেন ও
নিটিংয়ের অবদান
ছিল যথাক্রমে
৫২ দশমিক
শূন্য ৬
শতাংশ এবং
৮ দশমিক
৫৮ শতাংশ।
পরবর্তীকালে নিট
পোশাক উপখাত
ওভেন উপখাতের
তুলনায় দ্রুত
বৃদ্ধি পায়।
২০০৮-০৯
অর্থবছরে নিট
উপখাত ওভেন
উপখাতকে অতিক্রম
করে সমগ্র
রফতানিতে ৪১
দশমিক ৩৮
শতাংশ (৬৪২
কোটি ৯০
লাখ ডলার)
অবদান রাখে,
বিপরীতে ওভেন
পোশাক ৩৮
দশমিক শূন্য
২ শতাংশ
(৫৯১ কোটি
৮৫ লাখ
১০ হাজার)
নিয়ে দ্বিতীয়
স্থানে নেমে
আসে। ২০০৮-০৯
অর্থবছরে নিট
ও ওভেন
একত্রে আমদানীকৃত
কাঁচামালের মূল্যসহ
সাড়ে ১২
বিলিয়ন ডলারে
উপনীত হয়
এবং সাড়ে
২২ লাখ
মহিলা শ্রমিকের
কর্মসংস্থান সৃষ্টি
করে।
আমি
১৯৯৪ সালে
গার্মেন্টস ব্যবসায়
যুক্ত হয়েছি
বাবার সঙ্গে।
তাই এরপর
থেকে টেক্সটাইল
ইন্ডাস্ট্রিতে যা
কিছুই ঘটছে
সব আমার
চোখে দেখা।
২০০০ সালের
আগে বেশির
ভাগ কারখানা
ছিল নিজস্ব
বাসায় ও
ভাড়া বাড়িতে।
এরপর মালিকরা
ঢাকাতে বিভিন্ন
ইন্ডাস্ট্রি গড়ে
তোলে। যার
ফলে বায়ারদের
কাজের পরিধিও
বেড়ে যায়।
২০০০
থেকে ২০১০
সালে যেমন
পরিবর্তনের হাওয়া
ছিল, তেমনি
কিছু ব্যর্থতাও
ছিল। অধিকাংশ
জিএম, পিএমরা
নিজস্ব ফ্যাক্টরি
করে ফেলে।
যেহেতু তারা
টেকনিক্যালি অনেক
ভালো ছিল,
তারা ফ্যাক্টরি
টেকনিক্যাল সমস্যাগুলো
ভালো বুঝলেও
ফ্যাক্টরির ম্যানেজমেন্ট
দক্ষতার ঘাটতি
ছিল। সেই
জায়গা থেকে
অনেক ফ্যাক্টরি
যথার্থ ম্যানেজমেন্ট
ও পরিচালনার
দক্ষতার ঘাটতিতে
পরে বন্ধ
হয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে
অনেক দক্ষ
মানুষ ব্যাংক
টু ব্যাংকের
মাধ্যমে ফ্যাক্টরিগুলো
নিয়ে নেয়
ও মালিকানার
পরিবর্তন ঘটে।
দক্ষভাবে পরিচালনা
করা শুরু
করে।
আরেকটি
সমস্যা ব্যাপক
হারে দেখা
দিয়েছিল, সেটি
হলো ব্যাকওয়ার্ড
লিংকেজের ঘাটতি।
তখনকার সময়
প্রায় শতভাগ
রফতানিমুখী শিল্প
সম্পূর্ণভাবেই আমদানীকৃত
কাঁচামালনির্ভর ছিল।
এ নির্ভরশীলতার
কারণে পরিস্থিতি
ছিল খুবই
নাজুক। প্রায়
বিলিয়ন ডলার
যেত কাঁচামাল
আনতে। পরবর্তী
সময়ে দেশের
মালিকরা ও
স্থানীয় উদ্যোক্তারা
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ
খাতে নজর
দেয় এবং
অনেকটা সাপোর্ট
দিতে শুরু
করে দেশের
তৈরি পোশাক
রফতানি খাতে।
দেশীয় সুতা,
কাপড়, অ্যাকসেসরিজ
সহায়তা পেতে
শুরু করে
তৈরি পোশাক
খাত। দ্রুত
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ
ফ্যাক্টরি গড়ে
ওঠার কারণে
এ শিল্প
আর আগের
মতো কাঁচামাল
আমদানির ওপর
নির্ভরশীল নয়।
২০১০ সালের
এপ্রিলের পরিসংখ্যান
অনুসারে ওভেন
পোশাকের ৫০
শতাংশ আর
নিট পোশাকের
মাত্র ১০
শতাংশ আমদানিনির্ভর
ছিল।
২০০০-২০১০
এ সময়ে
টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি
কিছু প্রতিকূলতা
থাকা সত্ত্বেও
সুন্দরভাবে উন্নতি
করে যাচ্ছিল।
রানা প্লাজা
দুর্ঘটনার আগ
পর্যন্ত টেক্সটাইল
ইন্ডাস্ট্রির পজিটিভ
গ্রোথ ছিল।
ওই ১০
বছরে টেক্সটাইল
ইন্ডাস্ট্রির ডেভেলপমেন্টের
জন্য গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রাখে
দেশের ব্যাংকিং
সেক্টর। মালিক
ও উদ্যোক্তাদের
আর্থিক সহযোগিতা
দিয়ে এসেছে
ব্যাংকগুলো। ২০০০
সালের আগ
পর্যন্ত পোশাক
কারখানাগুলো ছিল
রাজধানী অভ্যন্তরে।
ছোট-বড়
আবাসিক ও
বাণিজ্যিক ভবনে
গড়ে ওঠে
অনেক পোশাক
কারখানা। পাশাপাশি
বিশ্বের নামিদামি
ফ্যাশন ব্র্যান্ড
টেক্সো, টার্বো,
ওয়ালমার্ট ওই
সময়ে আমাদের
দেশে আসে
এবং উদ্যোক্তাদের
অর্ডার দিয়ে
সহায়তা করেছে।
দেশের বড়
বায়িং হাউজগুলো
অর্ডার নিয়ে
এসে মালিকদের
সহায়তা করেছে।
বড় বড়
গ্রুপ অব
কোম্পানিগুলো যেমন
হা-মীম
গ্রুপ, নাসা
গ্রুপ, ইসলাম
গ্রুপ এনারা
প্রচুর বায়ার
সাপোর্ট পেত
সেই সময়ে
এবং ছোট
ফ্যাক্টরিগুলোতে সাব
কন্ট্রাক্ট দিয়ে
সহায়তা করত।
কিন্তু
ক্রয়াদেশ দিয়ে
ক্রেতারা সহযোগিতা
করেছেন বটে,
কিন্তু কর্মপরিবেশ
নিয়ে তাদের
কমপ্লায়েন্স মাপকাঠিগুলোও
বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
যার ফলে
তুলনামূলক বড়
কারখানা স্থাপন
শুরু করে।
সরে যেতে
শুরু করে
ঢাকা থেকে
পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে।
এ ধারাবাহিকতায়
সাভার, আশুলিয়া,
গাজীপুর এলাকায়
বিপুল পরিমাণ
কারখানা স্থাপন
হয় ২০০০
থেকে ২০১০
সাল সময়ে।
২০০০ সালের
শুরুতে বিজিএমইএর
সদস্য কারখানা
সংখ্যা ছিল
৩ হাজার
৪৮০। ২০০৯-১০
অর্থবছর শেষে
সদস্য সংখ্যা
৫ হাজার
১০০ ছাড়িয়ে
যায়। বিপুলসংখ্যক
কারখানা অবধারিতভাবেই
অনেক কর্মসংস্থানের
সুযোগ সৃষ্টি
করেছিল। এক্ষেত্রে
বিনিয়োগের জন্য
প্রয়োজনীয় অর্থের
জোগানে বড়
ভূমিকা রেখেছিল
দেশের ব্যাংকি
খাত।
নতুন
কারখানা স্থাপনের
মধ্যে উল্লেখযোগ্য
একটি অংশ
ছিল নতুন
উদ্যোক্তা, মার্কেটিং
পলিসি, ফরেন
ইনভেস্টমেন্ট, ফরেন
বায়ারের অফিস
বৃদ্ধি পাওয়ার
কারণে বুলেটের
গতিতে বাংলাদেশের
পোশাক শিল্প
এগিয়ে যায়।
এ ১০
বছর আর
এর সঙ্গে
আমাদের উদ্যোক্তারা
বিশ্ববাজারের বড়
বড় ব্যান্ডকে
ভালো মানের
পোশাক তৈরি
করে বাংলাদেশের
তৈরি পোশাকের
গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
তবে একবিংশ
শতাব্দীর প্রথম
দশকে দেশে
পোশাক খাতের
হাত ধরে
দেশে বিপুল
পরিমাণ বিদেশী
কর্মীর আনাগোনাও
বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিপুল
পরিমাণ বিদেশী
কর্মীর আনাগোনার
যৌক্তিক প্রেক্ষাপটও
ছিল। ২০০০
থেকে ২০১০
সাল সময়ে
দেশে বিপুল
পরিমাণ বিদেশী
বিনিয়োগ এসেছিল।
এর গুরুত্বপূর্ণ
অংশ ছিল
পরিকল্পিত বিনিয়োগ।
পরিকল্পিত বলার
কারণ কর্তৃপক্ষ
নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে
বিনিয়োগের কারণে।
আশির দশকে
যাত্রা করা
বাংলাদেশ রফতানি
প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল
কর্তৃপক্ষের (বেপজা)
আওতায় ইপিজেডগুলোতে
উল্লেখযোগ্য পরিমাণ
বিনিয়োগ আসে
২০০০ থেকে
২০১০ সময়ে।
২০০০ সালে
দেশের ইপিজেডে
মোট বিনিয়োগের
পরিমাণ ৪৭
কোটি ডলারও
পেরোয়নি। কিন্তু
২০১০ সাল
শেষে বিনিয়োগের
পরিমাণ ২০০
কোটি ডলার
ছাড়িয়ে যায়।
২০১৯
সালে প্রকাশিত
এডিবির প্রতিবেদন
অনুযায়ী মোট
দেশজ উৎপাদনের
(জিডিপি) আকারে
২০০০ সালে
বাংলাদেশের চেয়ে
এগিয়ে ছিল
সিঙ্গাপুর। ওই
বছর বাংলাদেশে
মাত্র ১৫
হাজার ১৮০
কোটি ডলারের
পণ্য উৎপাদন
ও সেবা
সৃষ্টি হয়েছিল।
তখন সিঙ্গাপুরে
সৃষ্টি হয়েছিল
১৬ হাজার
৭১৮ কোটি
ডলারের পণ্য
উৎপাদন ও
সেবা। এরপর
বাংলাদেশ দ্রুত
এগিয়ে যেতে
থাকে। পরের
১০ বছরেই
সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে
যায় বাংলাদেশ।
২০১০ সালে
বাংলাদেশের জিডিপির
আকার দাঁড়ায়
৩৬ হাজার
৪০৫ কোটি
ডলারে। ওই
বছরই সিঙ্গাপুরকে
প্রথমবারের মতো
ছাড়িয়ে যায়
বাংলাদেশ। এক
দশকের মধ্যে
এ অগ্রগতির
পেছনে ছিল
রফতানি শক্তিনির্ভর
বাংলাদেশের ব্যক্তি
খাতের।
বিকাশের
প্রতিফলন দেখা
যায় কর্মসংস্থান
সৃষ্টির মাধ্যমে
দারিদ্র্য বিমোচনেও।
২০০০ থেকে
২০১০-এ
আগের দশকের
তুলনায় দারিদ্র্যের
সংখ্যা কমেছে
বেশ উল্লেখযোগ্য
হারে। এ
১০ বছরে
বাংলাদেশে দারিদ্র্য
কমেছে দেড়
কোটি। আগের
দশকে এ
সংখ্যা ছিল
মাত্র ২৩
লাখ। ২০০০
সালে প্রায়
৪৯ শতাংশ
মানুষ দারিদ্র্যসীমার
নিচে বাস
করত। ২০০০
থেকে ২০০৫-এ
এই বার্ষিক
গড় হার
দারিদ্র্য বিমোচনে
ছিল ১
দশমিক শূন্য
৮ শতাংশ,
২০০৫ থেকে
২০১০ সাল
হলো ১
দশমিক শূন্য
৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ
ব্যাংকের পরিসংখ্যান
পর্যালোচনায় দেখা
গেছে, অক্টোবর
২০০১ থেকে
ডিসেম্বর ২০০৬
পর্যন্ত কোটিপতির
সংখ্যা বেড়েছিল
৮ হাজার
৮৮৭ জন।
অর্থাৎ এ
সময়ে কোটিপতির
সংখ্যা দাঁড়ায়
প্রায় ১৪
হাজারে। ২০০৭-০৮
সালে বেড়েছিল
৫ হাজার
১১৪ জন।
এ সময়ে
কোটিপতির সংখ্যা
দাঁড়ায় প্রায়
১৯ হাজারের
বেশি। ২০০৮
সালের ডিসেম্বর
শেষে দেশে
মোট কোটিপতির
সংখ্যা ছিল
৪৪ হাজার
৩৬৯ জন।
মো. সালাউদ্দিন: প্রতিষ্ঠাতা, বিইই
ফ্যামিলি
হেড
অব অপারেশন,
বুনন বাংলা
টেক্সটাইল ম্যাগাজিন
চেয়ারম্যান, আস্ক অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইলস সোর্সিং