বাংলাদেশে শহর ও নগরগুলোতে এর জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ বাস করে। একটি দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শহরবাসীর লোকসংখ্যা বিশেষ গুরুত্বের দাবি করে। এ দেশে শহরবাসী মানুষের সংখ্যা বছরপ্রতি ৩.৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। শহরে বসবাসকারী লোকসংখ্যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় দ্বিগুণের চেয়ে বেশি। বিশ্বের উন্নত ধনী দেশগুলোতে ৯০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে। একটি দেশ উন্নত কিনা তা বোঝার জন্য দেশের শহরবাসীর সংখ্যা একটি উল্লেখযোগ্য সূচক। এদিক থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করা হলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ভালো করছে, এ কথা বলা যায়।
রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশে নগরায়ণের নাভিকেন্দ্র। ঢাকা ছাড়াও রয়েছে বিভাগীয় শহর, দুটো সমুদ্রবন্দর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শহর। একটি দেশে নগরায়ণের প্রক্রিয়া নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বাংলাদেশের অধিকাংশ শহর প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। তবে দুই-তিনটি শহর রয়েছে যেগুলো নদী-তীরবর্তী। এগুলো গড়ে ওঠার পেছনে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা রয়েছে। একসময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর ও সিরাজগঞ্জ নদীবন্দর হিসেবে খুবই সক্রিয় ছিল। গত ৫০ বছরের উন্নয়ন তত্পরতায় নৌপথ অবহেলিত হওয়ার ফলে এই নদীবন্দরগুলো জৌলুশ হারিয়েছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সূচনালগ্নে সড়ক-মহাসড়ক বলতে যা বোঝায় সে ধরনের অবকাঠামো ছিল খুব দুর্বল। কিন্তু গত ৫০ বছরে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সড়কপথ বিশেষভাবে অগ্রাধিকার পেয়েছে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে এলজিইডি গোটা বাংলাদেশে গ্রামীণ সড়কগুলো গড়ে তুলেছে অথবা উন্নত করেছে। ঢাকার সঙ্গে এখন সড়কপথে ১২-১৩ ঘণ্টায় দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছা সম্ভব। এর ফলে বাংলাদেশের গ্রামগুলো শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে গেছে। জাতীয় সড়কগুলো আরবান করিডর হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। আরবান করিডরের সুযোগ কাজে লাগিয়ে মহাসড়কগুলোর দুই পাশে বাজার, হোটেল ও বাসস্থান গড়ে উঠছে। এ প্রক্রিয়া যদি ২০৫০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে তাহলে সমগ্র বাংলাদেশ পরিণত হবে একটি নগররাষ্ট্রে।
সিঙ্গাপুর, হংকং প্রভৃতি নগররাষ্ট্র। এ নগররাষ্ট্রগুলো আয়তনের দিক থেকে ক্ষুদ্র। এই ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রগুলো সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং উন্নত ধ্যানধারণার ভিত্তিতে গড়ে তোলা হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশ যদি নগররাষ্ট্রে পরিণত হয়—এমনটি ভাবতে গেলে ভয় লাগে। কারণ ঢাকাসহ বিদ্যমান বড় বড় শহরে অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা, যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা, যানজট, বিভিন্ন সেবা পেতে হয়রানি এবং অপরিচ্ছন্নতা নগর ও শহরবাসীর নিত্যসঙ্গী। পরিবেশদূষণের ফলে এবং পরিষেবা পেতে নানাবিধ যন্ত্রণা এসব শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি যদি সমগ্র দেশে বিস্তৃত হয়, তাহলে সমগ্র দেশটাই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এখনো সময় আছে এমন বিপর্যয় পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে সমগ্র দেশকে সুশৃঙ্খল নগরায়ণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। যেসব কারণে বাংলাদেশে নগরায়ণ প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে, সেগুলোর নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাপারে এখন থেকে সাবধান হতে হবে এবং সুচিন্তিতভাবে অগ্রসর হতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের নগরায়ণ হবে বিকৃত নগরায়ণ। আজ থেকে শতবর্ষ আগে শহর ও গ্রামকে ভিন্ন সত্তা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে শহর ও গ্রামের ব্যবধান কমছে। তাই এখন শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্য প্রতিনিয়ত হ্রাস পাচ্ছে। সেজন্যই বাংলাদেশের কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ রুরাল আরবান ডিভাইডের কথা না বলে বলছেন রুরাল আরবান কনটিনিউয়াসের কথা। গ্রাম ও শহরের মধ্যে যোগাযোগের এ নিবিড়তা আমাদের গ্রামগুলোর রূপান্তরের চিত্রই হাজির করে। গ্রামগুলোর শহর হয়ে যাওয়া আসলে রাষ্ট্র ও সমাজের বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী।
আমাদের গ্রামগুলোতে অতিথি আপ্যায়নের কালচার বদলে গেছে। এখন গ্রামে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় কোমল পানীয়, চা ও বেকারিতে উৎপাদিত পণ্য দিয়ে। গ্রামে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা শহরে ছুটে আসে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসাসেবা পেতে। অনেক গ্রামে কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয় চালু হয়েছে। এগুলো উন্নত দেশের কিন্ডারগার্টেনের সঙ্গে কোনোভাবে তুলনীয় নয়। এ ধরনের স্কুল খুলে অনেকে বিত্তশালী হয়েছেন। নিজ বাড়ি থেকে আত্মীয় বাড়িতে যাওয়ার জন্য এখন আর পদযুগল একমাত্র সম্বল নয়। এ ধরনের যাতায়াতের জন্য যন্ত্রচালিত যানবাহন ব্যবহূত হচ্ছে। বাড়ি থেকে বের হয়ে অন্যত্র যাওয়ার জন্য গ্রামের ভদ্রলোকরা রিকশা ব্যবহার করেন। ফলে হাঁটার কষ্ট দূর হয়েছে বটে কিন্তু তা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রাইভেট টিউটর নিযুক্ত করা হয়। অঞ্চলভেদে কোনো কোনো জেলার গ্রামগুলো দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত। অধিকাংশ গ্রামেই মাছের চাষ হচ্ছে। কোনো কোনো অঞ্চলের নামে নতুন ধরনের ফলফলাদি উৎপাদিত হচ্ছে। উত্পন্ন হচ্ছে নতুন ধরনের শাকসবজি। কোথাও হচ্ছে ফুলের চাষ। এসব ফসল থেকে মুনাফা ভালো হয় বলে চাষীরা এসব ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
এটি হলো হাই ভ্যালু ক্রপের চাষ। এ প্রবণতা যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তাহলে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। কারণ ধান উৎপাদনকারী জমিগুলো হাই ভ্যালু ক্রপের জন্য ক্রমান্বয়ে বেশি হারে ব্যবহূত হচ্ছে। গ্রামে প্রবাসীরা যে রেমিট্যান্স পাঠান সেই রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়ে প্রথমেই একটি পাকা দালান তৈরির চিন্তা রেমিট্যান্সভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া রেমিট্যান্সের অর্থ নানাভাবে ব্যবহূত হয়। এসব ব্যবহারের মধ্যে ভোগের জন্য ব্যবহার প্রাধান্য পাচ্ছে। অনেকে এই অর্থ জমি কেনার জন্য ব্যবহার করেন। বস্তুত রেমিট্যান্সের অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয়। অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনুৎপাদনশীল ও উৎপাদনশীল কাজ নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। গ্রামের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিনের পর দিন অবনতির পথে যাচ্ছে। সংবাদপত্র সূত্রে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলে বহু সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এরা রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে সাধারণ গ্রামবাসীর জন্য চরম বিভীষিকা সৃষ্টি করছে। বয়সে এরা তরুণ। এরা সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং কর্মসংস্থান থেকেও বঞ্চিত। রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার বাসনা এদের বেপরোয়া করে তুলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের প্রথা চালু হওয়ার পর গ্রামীণ সমাজে মেরুকরণ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের ওপর অনেকেই গবেষণা করেছেন। সবচেয়ে পুরনো গবেষণাটি করেছেন রেবারেন্ড লাল বিহারী দে, আর কে মুখার্জি। এখন এ গবেষণাগুলোর সঙ্গে বর্তমান অবস্থার তুলনা করলে আমরা বুঝতে পারব কীভাবে আমাদের গ্রামীণ সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়েছে। আমাদের শান্ত-স্নিগ্ধ গ্রামগুলো এখন ভীতি ও ত্রাসে কম্পমান। সমাজে যখন ক্রান্তিকাল আসে তখন এ ধরনের অরাজকতা দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে ক্রান্তিকাল কতটা দীর্ঘ এবং ক্রান্তিকালীন অরাজকতা কতকাল ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা উৎপাদন করে দেশকে উৎপাদনহীনতা ও বন্ধ্যাত্বের দিকে নিয়ে যাবে। গ্রামীণ নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। একটা সময় ছিল যখন কিছু ব্যক্তি সমাজসেবা ও মানুষের মঙ্গলের জন্য সমাজপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্থানীয় সরকারেও তারা ছিলেন। এখনো শোনা যায় অমুক গ্রামের অমুক ব্যক্তি ৫০ বছর ধরে ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেছেন। আজকাল নির্বাচন নির্বাসনে যাওয়ার ফলে অনেকে এ যুগের গ্রামীণ নেপোলিয়ান হয়ে উঠেছে। নেপোলিয়ন দাবি করেছিলেন, I found the crown on the street and I picked it up on the point of my sword. গ্রামীণ সমাজের নেতৃত্ব এখন স্থানীয় এবং সরকার প্রদত্ত সম্পদ জোগাড়ে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু সম্পদের সদ্ব্যবহারে তারা সমমাত্রায় দুর্জন। গ্রামীণ নেতৃত্বের এই চেহারা না বদলালে গ্রামগুলোতে ভালো মানুষ সৃষ্টি হওয়া দুরূহ হয়ে পড়বে। গ্রামে কৃষিকাজে এখন যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। যন্ত্রের ব্যবহার শ্রমবাজারের অসংগতি রোধ করার জন্য একধরনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেছে। যন্ত্র থাকলে যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের সমস্যাও থাকবে। এসব কাজের জন্য বিভিন্ন এলাকায় কারিগরের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ শ্রমবাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ফসল লাগানো এবং ফসল কাটার মৌসুমে কামলার অভাব দেখা দেয়া। এ কারণে চাষবাসে যন্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। একসময় বাংলাদেশের গ্রামে কৃষকরা পাকা ধান আঁটি বেঁধে বাঁশের মধ্যে ঝুলিয়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসতেন। শিল্পীরা এ দৃশ্য এঁকেছেন। এখন এ কাজটি অনেক কৃষকই করেন না। ক্ষেতের পাশেই চার চাকার ভ্যানগাড়ি রাখা হয় এবং তাতে ধানের আঁটিগুলো বোঝাই করার পর কৃষকের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতিবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল তার সময়কার কৃষকদের মেহনত সম্পর্কে বলতে গিয়ে একটি বাগধারা ব্যবহার করেছিলেন। কৃষকদের কঠোর শ্রমকে তিনি সুপার হিউম্যান ইন্ডাস্ট্রি অব লেবার বলে উল্লেখ করেছিলেন। ছোটবেলায় আমি নিজেও এ দেশের কৃষককে অমানুষিক পরিশ্রম করতে দেখেছি। এখন কৃষকদের শ্রমজনিত কষ্ট নানা রকম যত্রপাতি প্রবর্তিত হওয়ার ফলে বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষে বিবিসি ইংল্যান্ডের সমাজজীবনে কৃষিসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডে কী পরিবর্তন এসেছে তা নিয়ে একটি আলেখ্য অনুষ্ঠান করেছিল। ১০০ বছর বয়সের কাছাকাছি এক ব্যক্তির সাক্ষাত্কার নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি তার জীবনে কৃষিতে কী পরিবর্তন দেখেছেন। বুড়ো লোকটি বললেন, তরুণ বয়সে দেখেছি খামার থেকে সোনালি রঙের পাকা গমের ফসল ধীরে ধীরে কাস্তে ব্যবহার করে কাটতে। কিন্তু এখন বিকাল বেলা দেখলাম আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ সোনার মতো চকচক করছে। পরদিন দেখি বিশাল এ খামারের সব ফসল তোলা হয়ে গেছে। আমি খুব দুঃখ পেলাম। গোটা খামারটি ভয়ানকভাবে ন্যাড়া দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশে এমন দিগন্তবিস্তৃত একজন জমির মালিক পাওয়া যাবে না। এ দেশের জমিগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লটে বিভক্ত। এখানে একযোগে কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার করে ফসল কেটে আনা সম্ভব না। বাংলাদেশের কৃষিতে বেশকিছু পুঁজিবাদের উপাদান প্রবেশ করেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজার সম্পর্কের অনুপ্রবেশ। কৃষির রূপান্তর বলতে আসলে বোঝার চেষ্টা করা হয় কৃষি ব্যবস্থা কি আধা সামন্ততান্ত্রিক কিংবা ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বিশাল খামারে, অর্থাৎ ভাবা যাক কয়েক হাজার হেক্টরের খামারে পরিবর্তন হবে কিনা। আমি আমার ব্যক্তিগত গবেষণা থেকে বুঝতে পেরেছি এ দেশে একজন কৃষকের জমির আকারে পরিবর্তন আসে খুবই ক্ষুদ্র একটি ব্যাসের মধ্যে। কৃষকরা কৃষি আয়ের উদ্বৃত্ত দিয়ে জমি কিনতে পারেন না। পারলেও এমন দৃষ্টান্ত বিরল বলা চলে। জমি কেনা হয় কৃষিবহির্ভূত আয় দিয়ে, কিন্তু সে আয় এত ক্ষুদ্র যে তা দিয়ে একবারে তিন বিঘা জমিও কেনা কঠিন। অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু তার এক প্রবন্ধের ভূমিকায় লিখেছেন যে তিনি পশ্চিমবঙ্গের এক কৃষককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, একটি প্লট তিনি বিক্রয় করবেন কিনা। জবাবে কৃষকটি বলেছিলেন, না, আমি বিক্রি করব না। কৌশিক বসু বললেন, আমি চার গুণ দাম দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু কৃষক বলল, চার গুণ দাম পেলেও আমি জমির এই টুকরোটি বিক্রি করব না। কারণ জিজ্ঞাসা করায় কৃষক বলল, আপনার চার গুণ টাকায়ও এমন একটি প্লট আমি কিনতে পারব না। এ গল্পের শিক্ষা হলো, অন্য যেকোনো সম্পদ ও পণ্যের তুলনায় জমির বাজার খুবই নিষ্ক্রিয় ও আড়ষ্ট। কৃষিতে পুঁজিবাদ সৃষ্টির দুটি পথ আছে—একটি হলো এক্সপ্রোপ্রিয়েশন অর্থাৎ জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং অন্যটি হলো ডিফারেনসিয়েশন। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে ভূস্বামীরা কৃষকদের বল প্রয়োগ করে উচ্ছেদ করে পুরো জমিকে চারদিক থেকে বেড়া দিয়ে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছিল ফসলের পরিবর্তে ভেড়ার চাষ করতে। কারণ তখন ভেড়ার পশমের দাম ইউরোপের বাজারে খুবই চড়া হয়ে গিয়েছিল। ডিফারেনসিয়েশনের প্রক্রিয়া মূলত উৎপাদন দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়ার প্রভাব অনুভব করা যায় না। বাংলাদেশের কৃষক চরম কষ্ট সহ্য করে তার ক্ষুদ্র জমির টুকরোটিকে ধরে রাখে। এই জমির আকার দশমিক শূন্য ৫ একর হতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশে ইকোনমি অব স্কেল থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য বড় খামারের সৃষ্টি হবে এমন সম্ভবনা সুদূরপরাহত। অন্যদিকে জবরদস্তি করে কৃষকদের উচ্ছেদ করাও সম্ভব নয়। কৃষির রূপান্তরের আরেকটি পন্থা হলো সমাজতান্ত্রিক যৌথ খামার গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার। কিন্তু প্রশ্ন হলো যাদের এ পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেয়ার কথা দেশে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। সুতরাং সবদিক বিবেচনায় বাংলাদেশে বিশাল পুঁজিবাদী কৃষি খামার সৃষ্টি হওয়ায় সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এখন শেষ ভরসা হলো ভূমি বণ্টনের যে ব্যবস্থা আছে সেটি বজায় রেখে প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্মল হোল্ডিংগুলোকে পুঁজিবাদী চরিত্রে পরিবর্তন করা।
ড. মাহবুব উল্লাহ্: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক