‘করোনা’ দুর্যোগে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

বিশ্বায়নের ঘূর্ণাবর্তে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে এক মহাদুর্যোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে চিহ্নিত সংক্রমণের চারটি স্তরের মধ্যে আমরা এখন তৃতীয় স্তর বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন স্তরে আছি, যদিও তা সরকারিভাবে ঘোষিত নয়।

বিশ্বায়নের ঘূর্ণাবর্তে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে এক মহাদুর্যোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে চিহ্নিত সংক্রমণের চারটি স্তরের মধ্যে আমরা এখন তৃতীয় স্তর বা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন স্তরে আছি, যদিও তা সরকারিভাবে ঘোষিত নয়। চলতি এপ্রিল মাসই হলো সবচেয়ে বিপদের সময়। সময়ে আমরা যদি সার্বিকভাবে সতর্ক না হই, তাহলে আমাদের ভাগ্যে সংক্রমণের চতুর্থ পর্যায় বা মহামারী হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু ধেয়ে আসবে। সেই জায়গা থেকে লকডাউন কার্যকর করা এবং নিজ নিজ ঘরে বন্দি থাকা আবশ্যক হয়ে গেছে। চতুর্থ পর্যায়কে ঠেকানো হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কেননা চীন, ইরান, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, আমেরিকার মতো দেশ চতুর্থ পর্যায়কে মোকাবেলা করতে পারেনি বলেই এসব দেশ ব্যাপক মহামারীর কবলে পড়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান দক্ষতার সঙ্গে চতুর্থ স্তরকে থামিয়ে দিতে পেরেছে। কিন্তু আমরা এখনো নিজের দেশের ব্যাপারে স্বস্তিতে নেই। কেননা জানুয়ারির শেষ থেকে পর্যন্ত প্রায় লাখ ৬৫ হাজার প্রবাসী (শেষ দুই সপ্তাহেই পৌনে দুই লাখ) এদেশে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু পূর্ব প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে এবং বিষয়টিকে প্রথমদিকে হালকাভাবে নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে প্রবাসীদের রাখা হয়নি। অল্প কিছু বাদে সবাইকে পাঠানো হয় হোম কোয়ারেন্টিনে, যা আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। বর্তমানে অল্প কিছুসংখ্যক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকলেও বিপদটা বেশি দুটো কারণে, এক. প্রায় সবাই নিজ নিজ বাড়িতে আছে, যার অধিকাংশ খামখেয়ালিভাবে চলাফেরায় রত; দুই. প্রবাসীরা নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার পর সাধারণ সরকারি ছুটি ঘোষণা, এর ফলে শহরগুলোর মানুষ গ্রামে ভিড় করতে থাকে। পরিস্থিতিতে কমিউনিটি সংক্রমণ এমনকি মহামারী আকার ধারণ করার আশঙ্কা তীব্রতর হয়। এরপর একটাই উপায় বাকি থাকে, সেটা হলো লকডাউন করা আর সামাজিক দূরত্ব (সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং) সামাজিক সুরক্ষা (সোস্যাল সেফটি) নিশ্চিত করা। দুটো বিষয় কার্যত কঠিন হয়ে পড়ে।

তাইওয়ান দক্ষিণ কোরিয়ার পথ অনুসরণ করে এরই মধ্যে জার্মানি সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে। এর মূল কারণ ট্রেস, টেস্ট ট্রিট (শনাক্ত, পরীক্ষা চিকিৎসা) এই তিনটি কৌশল রপ্ত বাস্তবায়ন। জার্মানি অন্য যে কোনো ইউরোপীয় দেশের তুলনায় বেশি পরিমাণ নভেল করোনাভাইরাস পরীক্ষা চালাচ্ছে; দেশটি সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষের করোনা পরীক্ষা করছে; এর ফলে জার্মানিতে ৬৪ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলেও মৃতের হার শূন্য দশমিক শতাংশে ধরে রাখতে পেরেছে (যুগান্তর, ৩০ মার্চ ২০২০) অথচ আমরা এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ না করে ইতালি, স্পেন, আমেরিকার পথেই হাঁটছি। নিউইয়র্কে যখন কভিড-১৯- মৃত্যুর হার বেড়ে চলছে, তখনো ট্রাম্প শহরকে লকডাউন করেননি, তার খেসারত এবার আমেরিকাকেই দিতে হবে।

আমরাও যদি রাষ্ট্রীয় সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাকে কম গুরুত্ব দিই, আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে পারে ভয়াবহ বিপদ। আমরা কি ট্রেস, টেস্ট ট্রিট তিনটি মডেল অনুসরণ করেছি? আমরা যখন লাখো লাখো প্রবাসীকে কোয়ারেন্টিন পদ্ধতিতে রাখতে পারিনি, তখনই ট্রেস পদ্ধতি দুর্বল করে ফেলেছি। আমরা সরকারি বেসরকারি কোনোভাবেই যথাসময়ে যথেষ্ট কিটের ব্যবস্থা করতে পারিনি, কারণে আক্রান্ত শনাক্তকরণ চলছে এক আঁধার ধোঁয়াশার মধ্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তাদের হাতে ৭২ হাজার টেস্ট কিটস রয়েছে এবং এরই মধ্যে তারা ৯২ হাজার টেস্ট কিটস সংগ্রহ করেছে, যা দেশের জনগণের করোনা শনাক্তকরণের জন্য খুবই নগণ্য। জার্মানির জনসংখ্যা আট কোটি, সেখানে এক সপ্তাহে তিন থেকে পাঁচ লাখ করোনা টেস্ট চলছে, অথচ তার দ্বিগুণের বেশি লোকসংখ্যা বাংলাদেশে এত নগণ্য কিটস দিয়ে কীভাবে রোগী শনাক্তকরণ হবে? এক্ষেত্রে আমরা যে বিলম্ব করছি, তার পরিণতিতে কভিড-১৯ মহামারী হয়ে গেলে আমরা দিশেহারা হয়ে যাব।

বর্তমানে যে আংশিক লকডাউন চলছে, সেক্ষেত্রে লকডাউনও দুর্বল হয়ে পড়ছে তিনটি কারণে. খামখেয়ালিপনা . নিয়তিবাদী অন্ধ ভাবনা . আয়-রোজগার নিয়ে দুশ্চিন্তা। মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত তাদের জমানো টাকা বা নির্ধারিত বেতন দিয়ে সংসার চালাতে পারলেও খেটে খাওয়া মানুষ, ভিক্ষুক, পরিযায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তিনবেলা খাবার জোটানোর দুশ্চিন্তায় অস্থির। তাদের করোনা নিয়ে যতটা ভয়, তার চেয়ে বেশি ভয় ক্ষুধা নিবারণ নিয়ে। অন্যদিকে তারাই যদি আয়-রোজগারে নেমে পড়ে, তাহলে সবার ভয় করোনা সংক্রমণ নিয়ে। জটিলতার অবসান দুরূহ বলেই সরকার নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য আর্থিক সাহায্যের দিকে মনোযোগ দেয়। প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসন, এলাকার মেম্বার-চেয়ারম্যানদের হাত ধরে অভাবী মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানোর পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে সেই সাহায্য পৌঁছে না, নামমাত্র অল্প কিছু লোকের কাছে ছাড়া। আর এটা চলছে চেপে বসা দুর্নীতির অভ্যাসগত চরিত্রের কারণে। আর কিছুদিন এভাবে চললে, অভাবী মানুষ হুড়হুড় করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলে আর বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে লুট করলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

এসব দিক বিবেচনা করে সরকারকে আরো অধিক দায়িত্বশীল হতে হবে এবং জনগণকে আসতে হবে সহযোগিতার ভূমিকায়। উন্নয়ন খাতের ব্যয় আপাতত বন্ধ করে টেস্ট ট্রিট ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্ধন দরকার। উচ্চমানের টেস্ট কিটসের সংগ্রহ বাড়িয়ে, প্রতি থানায় থানায় ল্যাব টেস্টের ব্যবস্থা করে, কয়েকটা করোনা হাসপাতাল বানিয়ে সব ডাক্তার নার্সের জন্য পিপিই সামগ্রীর ব্যবস্থা করে সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্ত করতে হবে। এর পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য এমনকি শ্রমিকদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা বাড়াতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রণোদনা অভাবী নিম্নআয়ের মানুষদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। বিনা মূল্যে ত্রাণ ১০ টাকা দরেও যে চাল বণ্টন করা হচ্ছে, সে উদ্যোগও বুমেরাং হতে পারে যদি তা বণ্টনের দায়িত্ব দেয়া হয় মেম্বার, চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসনকে। ৬৮ বস্তা সরকারি চাল সরাতে গিয়ে যখন লুটেরাদের একজন ধরা পড়ে, তখনই মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না; কেননা অনেকেই ধরা পড়ে না, সত্য সবাই জানে। সরকারি সাহায্য যদি সেনা নৌ-বাহিনীর মাধ্যমে বণ্টন করা হয়, তাতে সরকারি বরাদ্দের যথার্থ মূল্যায়ন হবে, আশা আমাদের সবার। 

আসুন, দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা সরকারি, বেসরকারি জনতার উদ্যোগকে প্রাণবন্ত করতে সাহায্য করি। সাময়িক সামাজিক দূরত্ব, সামাজিক সুরক্ষা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আমরা যেন করোনা দুর্যোগকে মোকাবেলা করতে পারি আমাদের প্রত্যাশা।

 

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব মালায়া

 

 

আরও