এ লড়াই আমাদের সবার লড়াই

অনেক স্বাস্থ্যকর্মী করোনার ভয়ে স্বাস্থ্যসেবা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা তো এ ধরনের যুদ্ধে আমাদের প্রশিক্ষিত সৈনিক। সৈনিক যখন যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে চলে যান, তখন উপায় কী? মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করুন। যারা যুদ্ধ করেছিলেন তারা প্রশিক্ষিত সৈনিক ছিলেন না। তবুও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের যা কিছু ছিল তা নিয়ে। রপ্ত করেছিলেন গেরিলা যুদ্ধের কৌশল একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। ওদের দেখা যেত, ধরা যেত, মারা যেত। এবারের যুদ্ধ এক অদৃশ্য ভাইরাসের বিপরীতে। রণক্ষেত্রের পটভূমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একে দে

অনেক স্বাস্থ্যকর্মী করোনার ভয়ে স্বাস্থ্যসেবা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা তো এ ধরনের  যুদ্ধে আমাদের প্রশিক্ষিত সৈনিক। সৈনিক যখন যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে চলে যান, তখন উপায় কী? 

মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করুন। যারা যুদ্ধ করেছিলেন তারা প্রশিক্ষিত সৈনিক ছিলেন না। তবুও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের যা কিছু ছিল তা নিয়ে। রপ্ত করেছিলেন গেরিলা যুদ্ধের কৌশল একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। ওদের দেখা যেত, ধরা যেত, মারা যেত।

এবারের যুদ্ধ এক অদৃশ্য ভাইরাসের বিপরীতে। রণক্ষেত্রের পটভূমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একে দেখা যায় না, ধরা যায় না। মারার অস্ত্র আবিষ্কারের অপেক্ষায়। লক্ষ্য একই। এ লড়াই জিততেই হবে এমন এক অবস্থায়, যখন বেশকিছু প্রশিক্ষিত সৈনিক লাপাত্তা। 

কীভাবে করব এমন লড়াই? একই প্রশ্ন ছিল একাত্তরে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।’ 

হ্যাঁ, এবারো তা-ই করতে হবে। দুর্গটি হবে ভিন্ন ধরনের। এমন দুর্গ, যেখানে করোনার প্রবেশ করার সুযোগ নেই। 

প্রতিরোধের কিছু অস্ত্র আমাদের নিজের হাতেই। যেমন সামাজিক দূরত্ব, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সবকিছু পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখা, বাইরে গেলে মাস্ক পরা, হাঁচি-কাশির নিয়ম মানা ইত্যাদি। এ অস্ত্রগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে সবার একসঙ্গে ব্যবহারের ওপর। যদি কেউ করে আর কেউ না করে তাহলে শত্রু সবার দুর্গ ভেদ করবে। সবাইকে একসঙ্গে করতে হবে নইলে পরাজয় নিশ্চিত। 

আপনি করলে আমি করব, আমি করলে আপনি করবেন—ফর্মুলাটা আত্মঘাতী হবে। বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা নিজেকেই বাঁধতে হবে। এমন মনোভাব সবার মধ্যে থাকলে প্রত্যেক ঘরের দুর্গ নিরাপদ থাকবে। প্রতিকার থেকে প্রতিরোধই এ যুদ্ধ জেতার মূল মন্ত্র। প্রতিরোধে সর্বজনীন অংশগ্রহণ না থাকলে সাফল্য অধরা রয়ে যাবে।

বাস্তবে কিন্তু তা ঘটছে না। কেউ করছে, কেউ করছে না। অবহেলা, অলসতা, অসচেতনতা এক ধরনের কারণ। এগুলো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আবার জীবিকার তাড়নায় এসব কৌশল প্রয়োগ করতে পারছেন না অনেকে। তাদের ব্যাপার সম্পূর্ণ আলাদা।

যাদের নিয়ম পালন সম্ভব, তারা যদি প্রতিরক্ষার কৌশল অবলম্বন না করেন তাহলে তাদের বুদ্ধিমত্তাকে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। শুধু বোকা বলাটা কম বলা হবে। দেশপ্রেমী কিনা তা নিশ্চিত নয়। কারণ এটা এমন এক যুদ্ধ, যেটাতে পক্ষে না থাকা মানে বিপক্ষে থাকা। করোনার বিরুদ্ধে দুর্গ না গড়া মানে করোনা ছড়াতে সহায়তা করা।  

যারা জীবিকার তাগিদে পারছেন না, তাদের জীবিকার জোগান দেয়া আমাদের মানবিক দায়িত্ব। তাই সরকার ও সমাজের সবাইকে জীবিকা হারানো দুস্থ পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। যতদিন এ যুদ্ধ চলে ততদিন পাশে থাকতে হবে। মনে রাখবেন ক্ষুধার রাজ্যে করোনাকে কেউ ডরাবে না। ওরা জীবিকাশূন্য থাকলে বাকি সবার দুর্গ ভেঙে পড়বে। 

তা সত্ত্বেও করোনা আঘাত হানবে। ওই আঘাত সারিয়ে তোলার সৈনিক যথেষ্ট সংখ্যায় না থাকলে করণীয় কী? 

বঙ্গবন্ধু থাকলে হয়তো বলতেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে তা দিয়ে মোকাবেলা করো।’ 

আমাদের কী আছে? ঘরে ঘরে ভেন্টিলেটর আনা সম্ভব নয়। তবে নেবুলাইজার সম্ভব। কিন্তু কয়জনের সামর্থ্য আছে? করোনা রোগীদের হাসপাতালে যে রকম সেবা দেয়া যায়, সেটা কি বাসায় দেয়া সম্ভব? যারা সেবাটি দেবেন, তাদের হাসপাতালে যে রকম সুরক্ষা দেয়া যায়, সেটা কি বাসায় সম্ভব?

বঙ্গবন্ধু নিশ্চয়ই বলতেন, ‘সেগুলা যদি সম্ভব করবার না-ও পারি, যা করতে পারা যায় তা-ই করো।’ 

তা-ই করতে হবে। টেলিমেডিসিন কাজে লাগাতে হবে। উপসর্গ দেখা দিলেই রোগীকে যত্ন দিয়ে সঙ্গবিহীন রাখতে হবে। ঘরে ঘরে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যাপ্ত পিপিই জোগাড় করতে হবে, যাতে করোনা রোগীর ঘরের অন্যরা করোনামুক্ত থাকতে পারেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে রোগীদের যত্ন নিরাপদ দূরত্ব রেখে কীভাবে করা যায়, তা সবাইকে শেখাতে হবে। কুসংস্কার পরিহার করতে হবে। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে মাঠে থাকা সৈনিকদের দ্বারস্থ হতে হবে। লুকানো যাবে না, কারণ লুকানোর ফল যে লুকাচ্ছে সেসহ সবার জন্য ভয়ংকর। একজন মার্কিন কূটনীতিক ঠিকই বলেছেন যে করোনা সবার জন্য শেষ না হওয়া অবধি কারো জন্য শেষ হবে না।

মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে হবে। প্রশিক্ষিত সৈনিকদের অভাবে মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হবে। এতে দিশেহারা হলে হবে না। নিজকে নিরাপদ রাখা, প্রতিবেশীদের নিরাপদ রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কিছু ডাক্তার, নার্স না থাকলে কী হবে। আমাদের সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং বেশির ভাগ ডাক্তার, নার্স তো পালিয়ে যাননি। তারা করোনার প্রেক্ষাপটে নিজ নিজ দায়িত্ব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঠিকই পালন করে যাচ্ছেন। পালিয়ে যাওয়া সৈনিকদের ভীতু বা করোনা সহযোগী বলাটা বোধকরি মোটামুটি যথার্থ। এদের যুদ্ধজয়ের পর আমজনতার সামনে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এখন ফিরে এসে যুদ্ধে যোগ দিতে চাইলে উদার চিত্তে আপন করে নিতে হবে। দোষ ধরার সময় এখন নয়। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তাদের জাতীয় সম্মান দিতে হবে। বিজ্ঞানকে মাথায় রেখে মোকাবেলার কৌশল সাজাতে ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

মৃত্যুকে ভয় পাওয়া যাবে না। এ যুদ্ধে আমরা সবাই যোদ্ধা। এ লড়াই আমাদের সবার লড়াই। 

বঙ্গবন্ধু নিঃসন্দেহে বলতেন, ‘জীবন যখন দিয়েছি, জীবন আরো দেব, তবুও এ দেশের মানুষকে করোনা মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম জীবাণুরোধের সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম অদৃশ্য পরাশক্তিকে দাবানোর সংগ্রাম।’ জয় বাংলা, জয় বিশ্ব।

আরও