দুনিয়ার সবচেয়ে নির্মম ও ধ্বংসাত্মক জেনেটিক নিউরোলজিক্যাল বা বংশগত মস্তিষ্কসংক্রান্ত রোগগুলোর মধ্যে একটি হান্টিংটন। সম্প্রতি প্রথমবারের মতো জটিল এ রোগের সফল চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে। এ খবর নতুন করে আশা জাগিয়েছে আক্রান্ত এবং তাদের পরিবারদের মধ্যে। খবর বিবিসি।
হান্টিংটন রোগে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস হয়ে যায় এবং এ রোগের লক্ষণগুলোর ডিমেনশিয়া, পারকিনসন এবং স্নায়ুসংক্রান্ত রোগ মোটর নিউরন ডিজিসের সঙ্গে মিল রয়েছে। সাধারণত রোগের প্রথম লক্ষণ দেখা দেয় ৩০ বা ৪০ বছর বয়সে এবং রোগটি প্রায় ২০ বছরের মধ্যে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের হান্টিংটনের ডিজিজ সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর সারাহ তাবরিজি জানিয়েছেন, নতুন চিকিৎসায় রোগের বিস্তৃতি ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘সাধারণত এক বছরে রোগটি যে পরিমাণ ছড়ানোর সম্ভাবনা ছিল, এখন তা বিস্তৃত হতে চার বছর সময় নেবে। এতে রোগীরা দীর্ঘসময় ভালোভাবে জীবনযাপনের সময় পাবেন।’
এ চিকিৎসা মূলত একটি জিন থেরাপি, যা মস্তিষ্কে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা দীর্ঘ সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। থেরাপিটির লক্ষ্য, মস্তিষ্কের ক্ষতিকর হান্টিংটিন প্রোটিনের মাত্রা স্থায়ীভাবে কমানো। এ প্রোটিনের অতিরিক্ত উপস্থিতি মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে।
চিকিৎসায় একটি নিরাপদ ভাইরাস ব্যবহৃত হয়, যাতে বিশেষভাবে ডিজাইন করা ডিএনএ থাকে। ভাইরাসটি সার্জনরা রিয়েল-টাইম এমআরআই স্ক্যানিংয়ের সাহায্যে মাইক্রোক্যাথেটারের মাধ্যমে মস্তিষ্কের দুটি অঞ্চলে, কডেট নিউক্লিয়াস এবং পুটামেনে প্রবেশ করায়। ভাইরাসটি কোষের ভেতরে গেলে ডিএনএ সক্রিয় হয় এবং কোষকে ক্ষতিকর প্রোটিন তৈরি থেকে বিরত রাখে। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষ রক্ষা পায় এবং রোগের বিস্তৃতি ধীর হয়।
সংস্থাটির ইউনিকোর কোম্পানি পরিচালিত ২৯ জন রোগীর ওপর চালানো পরীক্ষার প্রথম ফলাফল খুবই আশাব্যঞ্জক। অস্ত্রোপচারের তিন বছরের মধ্যে রোগীদের মানসিক, শারিরীক, চলাফেরা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের ক্ষেত্রে ধীরগতিতে উন্নতি হচ্ছে। স্পাইনাল ফ্লুইডে নিউরোফিলামেন্টের মাত্রা কম থাকার তথ্যও রোগের কোষ রক্ষার প্রমাণ দিচ্ছে।
ইউসিএলএইচের কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট প্রফেসর এড ওয়াইল্ড ফলাফলকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, এটি ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। চিকিৎসা নিরাপদ মনে হলেও কিছু রোগীর মধ্যে ভাইরাসজনিত অস্থায়ী প্রদাহ, মাথা ব্যথা এবং বিভ্রান্তি দেখা গেছে, যা স্টেরয়েড দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৩০ বছর বয়সী জ্যাক মে-ডেভিসের বাবা ও দাদি হান্টিংটন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি এ আবিষ্কারকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখন আমি একটি দীর্ঘ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কল্পনা করতে পারি।’
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ হান্টিংটন রোগে আক্রান্ত এবং আরো হাজার হাজার মানুষ এ জিন বহন করছে। ইউনিকোর কোম্পানি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে এ চিকিৎসার অনুমোদনের জন্য আবেদন করবে এবং বছরের শেষে চিকিৎসা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও আগামী বছর আলোচনা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
চিকিৎসাটি জটিল অস্ত্রোপচার এবং আধুনিক জিন থেরাপির কারণে ব্যয়বহুল হলেও এটি একটি নতুন যুগের সূচনা। প্রফেসর তাবরিজি বলেন, ‘এটি এমন রোগীদের জন্যও সম্ভাবনার দরজা খুলবে, যারা এ জিন বহন করছে, কিন্তু এখনো লক্ষণ দেখেননি।’
তিনি সাহসী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘রোগী ও রোগীর পরিবারদের জন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’