অ্যাস্থেটিক বারডেন

নারীর সৌন্দর্য কেন এত ব্যয়বহুল

সময় বদলালেও সৌন্দর্যের মানদণ্ড হারিয়ে যায় না; বরং ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। একসময় যেখানে ফর্সা ত্বককে আদর্শ ধরা হতো, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দাগহীন ত্বক, বয়সের ছাপহীন মুখ, সুগঠিত শরীর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখুঁত উপস্থিতি। এসব মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সৌন্দর্যচর্চার ব্যয়ও ক্রমেই বাড়ছে

সৌন্দর্যচর্চা অনেকের কাছেই আত্মপরিচর্যার অংশ। কেউ কেউ বলেন, নিজের ভালো লাগার জন্যই রূপচর্চা করেন। কিন্তু সেই ভালো লাগার বড় একটি অংশই আসে অন্যের চোখে গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার অনুভূতি থেকে। যদি সমাজ মানুষের দক্ষতা, মেধা ও ব্যক্তিত্বকে বাহ্যিক সৌন্দর্যের মতোই গুরুত্ব দিত, তাহলে হয়তো আনন্দের উৎসও ভিন্ন হতো।

সামাজিকভাবে নির্ধারিত সৌন্দর্যের মানদণ্ড পূরণ করতে নারীদের যে সময়, শ্রম, পরিকল্পনা ও অর্থ ব্যয় করতে হয়— সেটিই অ্যাস্থেটিক বারডেন

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নারীদের সৌন্দর্যচর্চা কেবল ব্যক্তিগত রুচি বা পছন্দের বিষয় নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সামাজিক প্রত্যাশা, কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ। এই অদৃশ্য চাপকেই তারা বলছেন ‘অ্যাস্থেটিক বারডেন’ বা সৌন্দর্যজনিত বোঝা।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন বিউটি রিটেইলার স্কিনস্টোরের এক জরিপে দেখা যায়, একজন মার্কিন নারী জীবদ্দশায় শুধু চেহারার সৌন্দর্যচর্চার পেছনেই গড়ে প্রায় তিন লাখ ডলার ব্যয় করেন। এর বাইরে রয়েছে প্রসাধনী, ত্বক ও চুলের পরিচর্যা, বিউটি স্যালুন ও স্পা-তে যাওয়া এবং প্রতিদিন নিজেকে উপস্থাপনের জন্য আয়নার সামনে কাটানো অসংখ্য ঘণ্টা—যার কোনো অর্থমূল্য সাধারণত হিসাব করা হয় না।

ফরাসি লেখক জুলিন পারেনিন ‘বিয়িং বিউটিফুল অ্যান্ড ডুইং দ্য ডিসেস’ গ্রন্থে লিখেছেন, সামাজিকভাবে নির্ধারিত সৌন্দর্যের মানদণ্ড পূরণ করতে নারীদের যে সময়, শ্রম, পরিকল্পনা ও অর্থ ব্যয় করতে হয়— সেটিই অ্যাস্থেটিক বারডেন। এটি শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়; বরং মানসিক, আবেগিক এবং সামাজিক চাপও তৈরি করে।

সমাজবিজ্ঞানী কিয়ারা পিয়াজ্জেসির মতে, আজও একজন নারীর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও মূল্য অনেকাংশেই তার বাহ্যিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ফলে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের ওপর সুন্দর দেখানোর সামাজিক চাপ তৈরি হয়, যা কৈশোর, কর্মজীবন, মাতৃত্ব, মেনোপজ এবং বার্ধক্যের প্রতিটি ধাপে নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা সৌন্দর্যচর্চায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করেন। সমাজবিজ্ঞানী কিয়ারা পিয়াজ্জেসির মতে, আজও একজন নারীর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও মূল্য অনেকাংশেই তার বাহ্যিক উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ফলে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের ওপর সুন্দর দেখানোর সামাজিক চাপ তৈরি হয়, যা কৈশোর, কর্মজীবন, মাতৃত্ব, মেনোপজ এবং বার্ধক্যের প্রতিটি ধাপে নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে।

সময় বদলালেও সৌন্দর্যের মানদণ্ড হারিয়ে যায় না; বরং ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। একসময় যেখানে ফর্সা ত্বককে আদর্শ ধরা হতো, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দাগহীন ত্বক, বয়সের ছাপহীন মুখ, সুগঠিত শরীর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখুঁত উপস্থিতি। এসব মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সৌন্দর্যচর্চার ব্যয়ও ক্রমেই বাড়ছে।

এর সঙ্গে রয়েছে বহুল আলোচিত ‘পিংক ট্যাক্স’। একই মানের হলেও নারীদের জন্য তৈরি অনেক প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের দাম পুরুষদের অনুরূপ পণ্যের তুলনায় বেশি। অথচ বিশ্বের অনেক দেশেই নারীদের গড় আয় এখনো পুরুষদের চেয়ে কম। ফলে সৌন্দর্যের সামাজিক মানদণ্ড ধরে রাখার ব্যয় অনেক নারীর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌন্দর্য কেবল প্রসাধনী বা বাহ্যিক সাজের বিষয় নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেই বাস্তবতা অনুধাবন করার মধ্যেই রয়েছে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার স্বাধীনতা

সৌন্দর্যের এ প্রত্যাশা ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়; কর্মক্ষেত্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো মেকআপ ছাড়া কোনো নারীকে কম পেশাদার বা অগোছালো হিসেবে মূল্যায়নের প্রবণতা রয়েছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, একজন নারীর বাহ্যিক উপস্থিতি তার আয় ও পেশাগত অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

কানাডার ম্যাকইউয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জর্ডান ফস্টারের ভাষায়, আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক সুবিধাও এনে দিতে পারে। বিপরীতে কম আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচিত হলে বন্ধুত্ব, স্বীকৃতি কিংবা পেশাগত সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই সামাজিক অস্বস্তিই মানুষকে এমন সব পণ্য কিনতে উদ্বুদ্ধ করে, যেগুলো সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়। বাস্তবে কোনো প্রসাধনী আত্মবিশ্বাস তৈরি করে না; বরং আত্মবিশ্বাসের প্রতিশ্রুতিই বিক্রি করে।

সাম্প্রতিক সময়ে বডি-পজিটিভিটি আন্দোলন এবং মেকআপ ছাড়াই জনসমক্ষে আসা কিছু তারকার কারণে সৌন্দর্য নিয়ে প্রচলিত ধারণায় কিছুটা পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তনের গতি এখনো ধীর। কারণ সৌন্দর্যশিল্পের ব্যবসায়িক কৌশলই হলো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করা এবং মানুষকে বিশ্বাস করানো যে নিজেকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে নতুন কোনো প্রসাধনী, চিকিৎসা বা বিউটি সেবার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে সৌন্দর্যের বাজারে নতুন প্রবণতার শেষ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌন্দর্য কেবল প্রসাধনী বা বাহ্যিক সাজের বিষয় নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেই বাস্তবতা অনুধাবন করার মধ্যেই রয়েছে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার স্বাধীনতা। কারণ সৌন্দর্যের বাজারে আদর্শের সংজ্ঞা প্রতিনিয়ত বদলায়, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সময়, শ্রম ও অর্থের যে মূল্য নারীরা পরিশোধ করেন, সেটিই ‘অ্যাস্থেটিক বারডেন।

ফরাসি সাময়িকী এল অবলম্বনে

আরও