‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা সমীক্ষা

মৃত্যুঝুঁকি কমায় দিনে ৩-৫ কাপ কফি, কমে ডায়াবেটিসের শঙ্কাও

মৃত্যু ও বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমায় নিয়মিত কফিপান। হৃদরোগ থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস পর্যন্ত বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পানীয়টির বিভিন্ন উপকারিতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এসব গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে করা এক পর্যালোচনামূলক সমীক্ষার ফলাফল সম্প্রতি নিবন্ধ আকারে ‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ‘কফিজ ইমপ্যাক্ট অন হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং’ শীর্ষক নিবন্ধটিতে মৃত্যুঝুঁকি এবং ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগের শঙ্কা প্রশমনে কফির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এমনকি কফিতে ক্রিম বা চিনিসহ বিভিন্ন উপাদানের কোনটি যুক্ত করলে কী পরিমাণে প্রভাব ফেলে তা নিয়েও পর্যালোচনা উঠে এসেছে রিভিউ প্রতিবেদনটিতে। এতে দেখা যায়, দিনে তিন-পাঁচ কাপ কফি পান করলে তা মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস ও অসংক্রামক বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা দূর করায় বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে। খবর মেডিকেল নিউজ টুডে।

কফিতে ক্যালরির মাত্রা পাঁচের কম হলে সেটিকে এমনিতেই স্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচনা করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)। আর বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে কোনো স্থানে কফি পানের প্রবণতার সঙ্গে মৃত্যুহার কম হওয়ার বিষয়টির সম্পর্ক রয়েছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে অন্তত দুই কাপ কফি পান করলে মৃত্যুঝুঁকি কমে যায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।

২০১৯ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছিল, মৃত্যুঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে দিনে সাড়ে তিন কাপ কফি সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ক্যাফেইনযুক্ত ও ডিক্যাফ (অন্তত ৯৭ শতাংশ ক্যাফেইনমুক্ত)— উভয় ধরনের কফিই মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে।

নিউট্রিয়েন্টসে প্রকাশিত সমীক্ষা প্রতিবেদনটির আওতাধীন বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ কাপ কফি পানে হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। কফিপানে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে না, বরং তা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মতো কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করতে পারে। এছাড়া চলাফেরায় সক্রিয়তা ও সতর্কতা বাড়ানোর মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও আঘাতের ঝুঁকিও কমাতে পারে কফি। দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগ ও টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও সহায়ক এ পানীয়। এমনকি ডিক্যাফ থেকেও এসব উপকারিতা পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি নিয়মিত কফিপানে মানসিক ব্যাধি ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার ঝুঁকি কমতে পারে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। নিয়মিত ক্যাফেইন সেবন পারকিনসন ডিজিজ প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া যকৃত ও কিডনির সুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে কফি। তবে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত মাত্রায় গবেষণা হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটি ও মরগান স্টেট ইউনিভার্সিটির দুই বিশেষজ্ঞ পরিচালিত এ সমীক্ষা প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় উঠে আসে, কফি রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। ক্যাফেইনযুক্ত কফি দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যায়ামের আগে কফি খেলে দেহে চর্বি-পোড়ানোর হার বেড়ে যায়। প্যারাজ্যানথিন ও থিওফাইলিনের মতো ক্যাফেইনের উপজাতগুলো ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে। এছাড়া প্রদাহ কমানো ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে কফি।

রিভিউ প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, দিনে তিন থেকে চার কাপ কফি পানে সবচেয়ে বেশি উপকারিতা পাওয়া যায়। এছাড়া কফি ব্যায়ামের ক্ষমতা, মানসিক সতর্কতা ও দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতেও সহায়ক পানীয়টি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রপচারের পর অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফেরানোর ক্ষেত্রেও পানীয়টি ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া কফি বিষণ্নতা ও মানসিক চাপের ঝুঁকিও কমাতে পারে।

এতে পানীয়টির কার্যকারিতায় কফির সঙ্গে ক্রিম বা চিনি যুক্ত করার প্রভাব নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। দেখা গেছে, চিনি যোগ করলে কফির কিছু উপকারিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি তা বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, কফি বা ডিক্যাফে চিনি মেশালে ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। তবে ক্রিম বা কফি- হোয়াইটেনার যোগ করলে তেমন প্রভাব দেখা যায়নি।

তবে অতিরিক্ত কফি পানের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। এতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তবে সঠিক সময় পান করলে এ সমস্যা এড়ানো যায়। কফি সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়ালেও তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর নয়। বরং মাঝারি মাত্রার কফি রক্তচাপ কমানোর ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। গর্ভাবস্থায় কফি পান নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তবে দিনে ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন সাধারণত ক্ষতিকর নয়। এছাড়া অতিরিক্ত কফি বা ক্যাফেইন সেবনে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাকের মতো সমস্যা হতে পারে, বিশেষ করে যাদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা আগে থেকেই বিদ্যমান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্ক অধিকাংশ মানুষের জন্য মাঝারি মাত্রায় কফি পান নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অংশ হতে পারে। তবে চিনি ও ক্রিমের ব্যবহার কমিয়ে ব্ল্যাক কফি করাই সবচেয়ে উত্তম।

আরও