সকালে ঘুম থেকে উঠেই অফিস। এর পর দিনের লম্বা সময় কেটে যায় ডেস্কে। ফেরার পথে ক্লান্ত শরীরে যানবাহনে যাতায়াত। আর দিনশেষে সোফায় গা এলিয়ে দেয়া—এভাবেই কেটে যায় অনেকের পুরো দিন। রাতের খাবার খেতে বসে হয়তো মনে পড়ে, ‘আজ আর ব্যায়াম করা হয়নি’!
ব্যস্ত শিডিউলের কারণে নিয়মিত শরীরচর্চার সময় বের করা আসলেই কঠিন। কিন্তু সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে ঘাম ঝরানোই কি একমাত্র পথ? উত্তর হলো, না।
বরং দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ছোট ছোট নড়াচড়াও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের নড়াচড়াকে বলে থাকেন, ‘ইনসিডেন্টাল অ্যাক্টিভিটি’ বা দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে স্বাভাবিক শারীরিক সক্রিয়তা। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের নড়াচড়া ক্যালরি খরচ বাড়াতে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে পারে।
বসে থাকার ফাঁকে পা নাড়ান
এক জায়গায় শান্ত হয়ে বসো, পা নাচাচ্ছো কেন?—ছোটবেলায় কথাটি শোনেননি, এমন মানুষ খুবই কম! অনেকের কাছে অভ্যাসটি অমনোযোগ বা বিরক্তির লক্ষণ। তবে দীর্ঘ সময় বসে থাকার মধ্যে পা নাড়ানো বা শরীরের ভঙ্গি পরিবর্তন করার মতো ছোট ছোট নড়াচড়াও উপকারী হতে পারে।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক আনান্থা নারায়ণনের মতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকলে পায়ের পেশিগুলো তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে পেশির নিয়মিত সংকোচন কমে যায়। এতে পায়ের রক্তপ্রবাহ হ্রাস পেতে পারে এবং পেশিতে গ্লুকোজ গ্রহণের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একেবারে স্থির হয়ে বসে থাকার তুলনায় পা নাড়ালে পেশির সক্রিয়তা বাড়ে এবং বেশি ক্যালরি খরচ হতে পারে। আগের কিছু গবেষণায়ও উঠে এসেছে, এ ধরনের নড়াচড়া রক্তনালির কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
এমনকি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অভ্যাসগতভাবে পা ঝাঁকানো বা নাড়ানোর ফলে স্থির হয়ে বসে থাকার তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি শক্তি খরচ হতে পারে। এছাড়া বসে থাকার সময় পা নাড়ানোর পাশাপাশি মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে নড়াচড়া করলেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
ঘরের কাজেও শরীর থাকে সচল
শরীরচর্চার জন্য সব সময় আলাদা সময় বরাদ্দ করতে হবে, এমন নয়। রান্না, ঘর পরিষ্কার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার, বাগান করা কিংবা শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলার মধ্য দিয়েও শরীর সচল রাখা যায়।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ছোট ছোট শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মোট চার মিনিট সক্রিয় থাকলেও দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে হৃদরোগের যে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়, তা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণাটিতে যুক্তরাজ্যের ২২ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীরা এমন একটি যন্ত্র ধারণ করেছিলেন, যার সাহায্যে দিনের বিভিন্ন সময়ে তাদের শারীরিক নড়াচড়া পরিমাপ করা হয়েছিল। তারা নিয়মিত পরিকল্পিত ব্যায়াম করতেন না। গবেষক দল আট বছর ধরে তাদের পর্যবেক্ষণ করে।
ফলাফলে দেখা যায়, দিনের বেশির ভাগ সময়, এমনকি ১১ ঘণ্টার বেশি বসে থাকলেও দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে বেশি নড়াচড়া করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমতে পারে। পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায়ও এ ধরনের কাজের সঙ্গে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক নিকোলাস কোয়েমেল। তিনি বলেন, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা, ভারী বাজারের ব্যাগ বহন করা কিংবা শিশুদের সঙ্গে খেলার মতো কাজ দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা বাড়াতে পারে।
এ জন্য প্রতিদিনের অভ্যাসে ছোট কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। কোথাও যাওয়ার সময় স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দ্রুত হাঁটুন। কেনাকাটা করতে গেলে গাড়ি একটু দূরে পার্ক করুন, যাতে কিছুটা বেশি হাঁটতে হয়। দোকানে ট্রলির বদলে ঝুড়ি ব্যবহার করার কথাও ভাবতে পারেন। এতে বাজার করার সময় কিছুটা ভার বহন করার সুযোগ তৈরি হবে, যা পেশির কাজ বাড়াতে পারে।
দৈনন্দিন কাজেই যোগ করুন বাড়তি নড়াচড়া
একসঙ্গে বড় কোনো ব্যায়ামের লক্ষ্য ঠিক করলে অনেকের কাছেই তা কঠিন মনে হতে পারে। এর বদলে প্রতিদিনের পরিচিত কাজের সঙ্গে ছোট ছোট নড়াচড়া যুক্ত করা সহজ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের লাফবরো ইউনিভার্সিটির বিহেভিয়রাল মেডিসিন বিষয়ক অধ্যাপক আমান্ডা ডেলি এ পদ্ধতির নাম দিয়েছিন ‘পিগিব্যাকিং’। অর্থাৎ, আগে থেকেই করা কোনো কাজের সঙ্গে নতুন একটি অভ্যাস জুড়ে দেয়া।
যেমন, দাঁত ব্রাশ করার সময় গোড়ালি উঁচু করে দাঁড়ানোর অনুশীলন করতে পারেন। ডেস্কে বসে কাজ করার সময় সুযোগ বুঝে পা ওঠানো-নামানো যেতে পারে। ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটতে পারেন। অথবা অনলাইনে অর্ডার করা পণ্য বাড়িতে না এনে কাছাকাছি কোন জায়গার ঠিকানা দিতে পারেন যেন তা আনতে সেখানে হেঁটে যেতে হয়। এভাবে দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই হাঁটার সুযোগ তৈরি করা যায়।
কর্মক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেক্ষেত্রে অফিস ডেস্কে একটানা বসে না থেকে সুযোগ পেলেই উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করুন। সহকর্মীর সঙ্গে ছোট কোনো বিষয়ে কথা বলতে ফোন বা মেসেজের ওপর নির্ভর না করে উঠে গিয়ে তার ডেস্কের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলুন। সম্ভব হলে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। দুপুরের খাবারের বিরতিতে কিছুটা হাঁটা যেতে পারে। প্রিন্টার থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ অথবা বোতলে পানির দরকার হলে নিজে হেঁটে গিয়ে নিয়ে আসুন। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার মধ্যে বিরতি নিয়ে কাঁধ ঘোরানো, পা ওঠানো-নামানো বা বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করাও শরীরকে সচল রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ছোট অভ্যাসই হয়ে উঠতে পারে জীবনযাপনের অংশ
দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তার বড় সুবিধা হলো, এর জন্য সব সময় আলাদা সময় বের করতে হয় না। আমান্ডা ডেলির মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার একটি সময়সাশ্রয়ী উপায়।
নিকোলাস কোয়েমেলের মতে, দৈনন্দিন জীবনে কোনো অভ্যাস স্বাভাবিকভাবে জায়গা করে নিলে সেটি একসময় জীবনযাপনেরই অংশ হয়ে যায়।