আনন্দ করতে গেলেই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে

কোথাও একজন মানুষ কাঁদছেন, আর আপনি সিনেমা দেখছেন। কেউ সন্তান হারিয়েছেন, আর আপনি বন্ধুর সঙ্গে হাসছেন। কেউ হাসপাতালে, আর আপনি প্রিয় মানুষটির সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসে আছেন। তাতে কিন্তু আপনি খারাপ মানুষ হয়ে যান না

সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে জানা জরুরি। কিন্তু একটি অপরাধের খবর জানা আর তার গ্রাফিক ভিডিও বারবার দেখা এক জিনিস নয়। একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেটা জানা প্রয়োজন। কিন্তু মরদেহের ছবি বারবার দেখা কি প্রয়োজন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া প্রতিটি দাবি, অনুমান কিংবা মন্তব্য পড়া কি সত্যিই প্রয়োজন? নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করার অধিকার আমাদের আছে

সকালে ঘুম ভাঙার পর আমরা প্রথমে দেখি মোবাইল স্ক্রিন। অনেক সময় দুঃসংবাদ দিয়েই শুরু হয় সকালটা। শিশু নিখোঁজ, কোথাও খুন, কোথাও ধর্ষণ, কোথাও রাস্তায় পড়ে আছে নিথর শরীর, কোথাও একটি পরিবারের কান্না সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের মুঠোফোনে। আমাদের জীবনে হয়ত সব ঠিকই আছে। কিন্তু এসব দেখার পর মনে হয়, চারপাশটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর। প্রতিদিন এত ভয়ংকর খবর দেখতে দেখতে আমাদের মনের কী হয়? এই যে ভয়, হতাশা আমাদের ঘাড়ে জেঁকে বসছে এখান থেকে নিজেকে বাঁচানোর উপায় কী? জানব আজকের এক্সপ্লেইনারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, অতিরিক্ত সময় টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ অনুসরণ করলে স্ট্রেস বাড়তে পারে। সংবাদ দেখা যদি আপনার ওপর চাপ বাড়ায়, তাহলে সেটির সময় সীমিত করা উচিত। তাই প্রথম কাজ চোখ বন্ধ করে ফেলা না। খবরের সঙ্গে নিজের দূরত্বটা ঠিক করা।

সবকিছু জানা আপনার দায়িত্ব নয়

সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে জানা জরুরি। কিন্তু একটি অপরাধের খবর জানা আর তার গ্রাফিক ভিডিও বারবার দেখা এক জিনিস নয়। একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেটা জানা প্রয়োজন। কিন্তু মরদেহের ছবি বারবার দেখা কি প্রয়োজন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া প্রতিটি দাবি, অনুমান কিংবা মন্তব্য পড়া কি সত্যিই প্রয়োজন? নিজেকে এই প্রশ্নগুলো করার অধিকার আমাদের আছে। আপনি সবকিছুর সাক্ষী হতে বাধ্য নন। বিশেষ করে ঘুমের আগে ভয়ংকর ভিডিও দেখা, বারবার একই ঘটনার ফুটেজ খোঁজা থেকে নিজেকে দূরে রাখা মানসিক দুর্বলতা নয়। কখনো কখনো সেটিই আত্মরক্ষা। সতর্কতা দরকার। কিন্তু সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকা সতর্কতা নয়।

ডব্লিউএইচও-র মতে, কঠিন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ, বিরক্তি, মনোযোগের সমস্যা, মাথাব্যথা কিংবা ঘুমের সমস্যা স্ট্রেসের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে এগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা সম্পর্ককে ব্যাহত করলে পেশাদার সহায়তা নেয়া উচিত।

সুন্দর সময়ের মূল্য অনেক

কখনো কখনো সবচেয়ে দরকারি কাজটি খুব সাধারণ। ফোনটা নামিয়ে রাখুন। পরিবারের সঙ্গে বসুন। অনেকদিন একসঙ্গে সিনেমা দেখা হয়নি? আজ একটি সিনেমা দেখুন। রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের সঙ্গে গল্প করুন। বাবার সঙ্গে চা খান। বন্ধুকে ফোন করুন। প্রিয় মানুষটির সঙ্গে হাঁটতে বের হন। কোথাও ছোট্ট ঘুরে আসুন। নদীর ধারে বসে থাকুন। কিংবা কোনো এক সন্ধ্যায় শুধু পাশাপাশি বসে থাকুন। কারণ মানুষ শুধু তথ্য দিয়ে বাঁচে না। মানুষ সম্পর্ক দিয়ে বাঁচে।

ডব্লিউএইচও নিয়মিত রুটিন, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগকে স্ট্রেস সামলানোর সহায়ক অভ্যাস হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাই প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কোনো ‘অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা’ নয়। কখনো সেটিই মনে করিয়ে দেয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাইরেও একটি পৃথিবী আছে।

নিজেকে বাঁচান, কিন্তু অনুভূতিটা মেরে ফেলে না

এখানে একটা ভারসাম্য দরকার। নিজের মানসিক শান্তি রক্ষা করতে গিয়ে আমরা যেন অন্যের কষ্টের প্রতি অসাড় না হয়ে যাই। কোনো অসহায় মানুষের সাহায্য দরকার হলে সাহায্য করুন। কোনো শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করুন। স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হন। কারণ এসব নেতিবাচক খবরের মধ্যেও নিজেকে সান্তনা দেয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় আরেকটি স্ক্রল নয়। বরং একটি ছোট কাজ।

আনন্দ করতে গেলেই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে?

কোথাও একজন মানুষ কাঁদছেন, আর আপনি সিনেমা দেখছেন। কেউ সন্তান হারিয়েছেন, আর আপনি বন্ধুর সঙ্গে হাসছেন। কেউ হাসপাতালে, আর আপনি প্রিয় মানুষটির সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসে আছেন। তাতে কিন্তু আপনি খারাপ মানুষ হয়ে যান না। অন্যের দুঃখের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য নিজের আনন্দকে হত্যা করা জরুরি নয়। আপনি সিনেমা দেখতে পারেন। আড্ডা দিতে পারেন। ভ্রমণে যেতে পারেন। গান শুনতে পারেন। সাজতে পারেন। ঘুমাতে পারেন। হাসতে পারেন। কারণ আপনার হাসি অন্য কারো কান্নার কারণ নয়। বরং নিজের স্বাভাবিক জীবনটাকে ধরে রাখার মধ্যেও এক ধরনের প্রতিরোধ আছে। পৃথিবী নিরাপদ হওয়ার অপেক্ষায় জীবন থেমে থাকে না। আমরা হয়তো সব অপরাধ থামাতে পারব না। প্রতিটি অন্যায়ের বিচারও একা নিশ্চিত করতে পারব না। এটা আমাদের মেনে নিতে হবে। সবকিছুর জন্য নিজেকে দায়ী করা জরুরি নয়। আর পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকারকে প্রতিদিন নিজের ভেতরে বহন করাও আমাদের দায়িত্ব নয়। চারপাশে যতই মৃত্যু থাকুক, যতই দুঃখ থাকুক, জীবন এবং সময় আমাদের জন্য থেমে থাকবে না। আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই।

আরও