৩০ সেকেন্ডই যথেষ্ট

মানসিক চাপ কমাতে পারে যে ছোট ছোট অভ্যাস

গবেষণায় দেখা গেছে, খুব অল্প সময়ের কিছু সহজ অনুশীলনও মেজাজ ও মানসিক ভালো থাকার ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। এর মধ্যে কিছু অনুশীলন করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এমন ছোট ছোট অনুশীলনকেই ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বলা হয়। ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বইয়ের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, ভালো থাকার জন্য কখনো কখনো ৩০ সেকেন্ডের একটি ছোট অনুশীলনই যথেষ্ট হতে পারে

মন খারাপ, মানসিক চাপ কিংবা অস্থিরতা—এসব কাটাতে নিজের জন্য একটু সময় বের করার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু ব্যস্ত দিনের মধ্যে ধ্যান, যোগব্যায়াম বা অন্য কোনো সেলফ-কেয়ার অভ্যাসের জন্য আলাদা করে সময় বের করা অনেক সময় সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই বলে মন ভালো রাখার সুযোগ নেই, এমনটাও নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, খুব অল্প সময়ের কিছু সহজ অনুশীলনও মেজাজ ও মানসিক ভালো থাকার ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। এর মধ্যে কিছু অনুশীলন করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এমন ছোট ছোট অনুশীলনকেই ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বলা হয়। ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বইয়ের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, ভালো থাকার জন্য কখনো কখনো ৩০ সেকেন্ডের একটি ছোট অনুশীলনই যথেষ্ট হতে পারে।

খুব অল্প সময়ের এসব অনুশীলন কীভাবে করা যায়, তা দেখে নেয়া যাক।

লাফটার ইয়োগা বা হাসির যোগব্যয়াম

হাসির জন্য সবসময় মজার কোনো ঘটনা বা কৌতুকের প্রয়োজন হয় না। ‘লাফটার ইয়োগা’ বা হাসির যোগব্যায়ামে কোনো কৌতুক ছাড়াই ইচ্ছা করে হাসি শুরু করা হয়।

নেদারল্যান্ডসের ডেলফট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক নাটালি ভ্যান ডের ওয়ালের সঙ্গে কথা বলার সময় বিবিসির এক প্রতিবেদক একটি ছোট লাফটার ইয়োগা সেশনে অংশ নেন। শুরুতে শ্বাসের ব্যায়াম করা হয়। এরপর ভ্যান ডের ওয়ালের নির্দেশনায় কৃত্রিমভাবে হাসতে শুরু করেন তিনি।

শুরুতে বিষয়টি কিছুটা অস্বস্তিকর লাগলেও বেশি সময় তা থাকেনি। কিছুক্ষণ পর সেই কৃত্রিম হাসিই সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয়। অনুশীলন শেষে মন অনেকটা প্রফুল্ল ও ভালো লাগার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এমনকি কথাবার্তাও আরো সহজ হয়ে আসার অভিজ্ঞতার কথা তনি উল্লেখ করেছেন।

ভ্যান ডের ওয়াল জানান, লাফটার ইয়োগার পর অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করাও অনেক সময় সহজ মনে হয়।

এই হাসির প্রভাব নিয়ে গবেষণায়ও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ভ্যান ডের ওয়ালের করা একটি বড় মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, কৌতুক বা মজার বিষয় থেকে আসা হাসির তুলনায় কৌতুকবিহীন হাসি বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে প্রায় দ্বিগুণ কার্যকর।

যেভাবে করবেন এ ইয়োগা

প্রথমে তিনবার গভীর শ্বাস নিন। পেটের ওপর হাত রাখুন। এরপর ইচ্ছা করে হাসতে শুরু করুন। শুরু করতে অসুবিধা হলে বলতে পারেন, ‘হি হি হি, হা হা হা’। ধীরে ধীরে হাসির শব্দ বাড়ান। একসময় সেটি সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হতে পারে।

শেষে আবার গভীর শ্বাস নিন এবং নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া যে বিষয়গুলোর জন্য আপনি কৃতজ্ঞ, সেগুলো ভাবুন। সঙ্গী থাকলে আরো ভালো। দুজন দুজনের হাসি অনুকরণ করে দেখতে পারেন।

মাইক্রো যোগব্যায়াম

একা অথবা আয়নার সামনে হাসতে ভালো না লাগলে চেষ্টা করতে পারেন ‘মাইক্রো ইয়োগা’। যারা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকেন, তাদের জন্য এ অনুশীলন বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে। একই ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় বসে থাকার ফলে শরীরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সহজ কিছু স্ট্রেচিং তা থেকে বের হতে সাহায্য করতে পারে।

হালকা স্ট্রেচিং করলে ঘাড়ের টান কিছুটা কমে এবং বসার ভঙ্গির দিকেও মনোযোগ যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৫ মিনিট পর মাত্র ১৫-৩০ সেকেন্ড স্ট্রেচিং করলে কাজে মনোযোগ প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।

অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রেচিংয়ের সঙ্গে গভীর শ্বাস ও মনোযোগ ধরে রাখার অনুশীলন যুক্ত হলে মানসিক চাপ কমাতে তা আরো কার্যকর হতে পারে।

মনোযোগ দিয়ে স্ট্রেচিং করার বিরতিগুলো বার্নআউট এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে ভুল কমাতেও সহায়তা করতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে নতুন কোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। কারণে সব ধরনের স্ট্রেচিংয়েরই কিছু ঝুঁকি থাকতে পারে।

যেভাবে করবেন:

পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুল পরস্পর জড়িয়ে নিন। শ্বাস নেয়ার সময় দুই হাত নিচের দিকে বাড়ান এবং বুক ধীরে ওপরে তুলুন। শ্বাস ছাড়ার সময় স্ট্রেচিংটি একটু শিথিল করুন। এভাবে দুই থেকে তিনবার ধীরে শ্বাস নিন।

ধীর শ্বাস

চাপ বা উদ্বেগের সময় কয়েকবার ধীর, গভীর শ্বাসও মনকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেয়া শরীরের ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া কমাতে পারে। কারণ এতে শরীরের প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়, যা শরীরের ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় শ্বাসের ব্যায়ামের সঙ্গে চাপ, বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তিনবার ধীরে গভীর শ্বাস নেয়ার পর মস্তিষ্কে আলফা ওয়েভ বাড়ে। এসব ওয়েভ শান্ত ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

অনুশীলনের পদ্ধতি

আরামদায়ক অবস্থায় বসুন এবং চোখ বন্ধ করুন। প্রায় ১০ সেকেন্ড ধরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নিন। শ্বাস ছাড়ার সময়টি শ্বাস নেয়ার চেয়ে একটু দীর্ঘ রাখুন। ফুসফুসে বাতাস ঢোকা ও বের হওয়ার অনুভূতির দিকে মনোযোগ দিন। দিনে যতবার প্রয়োজন, ততবার এটি করতে পারেন।

নিজেকে আলতো করে ছুঁয়ে শান্ত হোন

স্পর্শের উপকারিতা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। অন্য মানুষের স্পর্শের বিকল্প না হলেও নিজের শরীরকে নিজেই আলতোভাবে স্পর্শ করার একটি সহজ অনুশীলন থেকেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।

যেভাবে করবেন—

এক বা দুই হাত আলতো করে বুকের ওপর বা বাহুর ওপর রাখুন। একটি শ্বাস নিন। হাতের উষ্ণতা ও হালকা চাপের অনুভূতির দিকে মনোযোগ দিন। একইসঙ্গে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু কথা মনে মনে ভাবুন।

প্রতিদিনের জীবনেই হতে পারে ছোট বিরতি

এসব অনুশীলনের সবগুলো একসঙ্গে করার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে কোনটি মানিয়ে যায়, সেটিই খুঁজে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। কোনটি আপনার সঙ্গে মানানসই হয়, তা বুঝে নিন। সবার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বা মাত্রা এক নাও হতে পারে। যে অনুশীলন করতে ভালো লাগে, সেটিই বেছে নেয়া যেতে পারে।

এমনকি প্রতিদিনের সাধারণ কাজের মধ্যেও মনোযোগী হওয়ার ছোট ছোট বিরতি তৈরি করা সম্ভব। হাঁটার সময় নিজের দিকে মনোযোগ দেয়া কিংবা নিজের বাসায় দৈনন্দিন কোন কাজ করার সময় কয়েকবার গভীর শ্বাস নেয়ার মতো অভ্যাসও করা যায়।

আরও