ড্যান ব্রাউন ফিরেছেন। আর তার সঙ্গেই ফিরেছেন রবার্ট ল্যাংডন। প্রকাশ হয়েছে তার নতুন উপন্যাস দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস । প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার এই থ্রিলারের গল্পটি প্রাগ শহরের এক দিনের ভ্রমণ। ব্রাউনের বৈশিষ্ট্য অনুসারে এতে ভরে আছে গোপন সংকেত, প্রাচীন কাহিনি, সন্দেহজনক খলনায়ক, আর শ্বাসরুদ্ধকর সংলাপ। ব্রাউনের গদ্য যেমন তেমনই আছে— উত্তেজনায় ঠাসা। তবে এই পর্বের বিশেষত্ব হলো, এটি বইয়ের গুরুত্ব ও শক্তিকে ঘিরে এক আবেগপূর্ণ দাবি করে। যখন বইকে প্রায় ধ্রুপদী বস্তু হিসেবে ধরা হয় এবং ডিজিটাল যুগে তার প্রভাব কমে যাচ্ছে, তখন দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস ভালোবাসা নিয়ে বলে: বই এখনও গুরুত্বপূর্ণ—এবং সম্ভবত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।
সপ্তম অধ্যায় থেকেই পাঠক ড্যান ব্রাউনের ক্ল্যাসিক বাক্য পড়তে শুরু করবেন। সহজেই চেনা যায় ব্রাউনকে। বাক্যগুলো তথ্যভিত্তিক, আত্মবিশ্বাসী, আর অপ্রত্যাশিতভাবে স্থাপন করা—‘বিশ্বের বৃহত্তম প্রকাশনা সংস্থা, পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউজ, প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার বই প্রকাশ করে এবং বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করে।’ এই ধরনের বাক্য কাহিনিকে এগিয়ে না নিলেও ব্রাউনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে: তথ্যপূর্ণ, গুগলযোগ্য এবং এক ধরনের জ্ঞান বিতরণকারী। মজার বিষয় হলো, এই বইটিও প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস-এর অন্তর্গত ডাবলডে। কাকতালীয়? না, ব্রাউনের জগতে সবকিছুই যেন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
এই উপন্যাসে ল্যাংডন—হার্ভার্ডের প্রতীকের অধ্যাপক ও চিরকালীন সংশয়বাদী—প্রাগ শহরে রয়েছেন। সেখানে ষড়যন্ত্র, গোপন গলিপথ, আর রহস্যময় শত্রুতে ভরা শহর তাকে ঘিরে রেখেছে। তার সঙ্গী ক্যাথরিন সলোমন। দ্য লস্ট সিম্বলে আমরা ল্যাংডনের সঙ্গে ক্যাথরিনকে দেখেছিলাম। এবার হয়ে উঠেছেন তার প্রেমিকা এবং একজন বিজ্ঞানী, যার আসন্ন বই মানব চেতনা সম্পর্কে আমাদের মৌলিক বিশ্বাসগুলো বদলে দিতে পারে।
ক্যাথরিনের তত্ত্ব উপন্যাসটির মূল চালিকা শক্তি। নিউরোকেমিস্ট্রি, প্যারাসাইকোলজি, এবং মেটাফিজিক্সকে একত্র করে তিনি দাবি করেন, আমাদের মস্তিষ্ক আসলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা নয়, বরং একটি সার্বজনীন চেতনার প্রবেশদ্বার। তার এই তত্ত্ব স্পর্শ করে বহির্বাস্তব অভিজ্ঞতা, পূর্বজ্ঞান, একাধিক ব্যক্তিত্ব, এমনকি মৃত্যুর পর জীবনের ধারণাকেও। বাস্তব জীবনে এধরনের তত্ত্ব নিয়ে সংশয় থাকলেও, উপন্যাসে এটি এতটাই বিপ্লবাত্মক যে, এটি ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে দুর্নীতিপরায়ণ সরকার, প্রতিদ্বন্দ্বী বিজ্ঞানী এবং এক অপরাধপ্রধান।
এটা সেই পুরনো ব্রাউন রেসিপি: বিশ্ব-পরিবর্তনকারী গোপন তথ্য, যা খলনায়কের চোখ এড়িয়ে ঠিক সময়ে প্রকাশ পায়—বা তার একটু আগেই। দ্য ডা ভিঞ্চি কোড থেকে ইনফার্নো—ব্রাউনের সফলতার সূত্রটা এখানেই। আর দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস যদিও খুব নতুন কিছু করে না, তবুও এটি যেন এক পুরনো ভালোবাসায় ভরা প্রত্যাবর্তন।
এই কাহিনির সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক খলনায়কদের একজন হলো দ্য গোলেম। এই চরিত্রটি ইউরোপীয় লোককাহিনির সাথে উপন্যাসটিকে যুক্ত করে, আবার ব্রাউনীয় খলনায়কের পরিচিত ছাঁচেও ফেলে: বিকৃত, বেদনাবিধুর এবং হিংস্র। তার উপস্থিতি দেখায় কীভাবে কিংবদন্তি এবং আধুনিক প্রযুক্তি পাশাপাশি বেঁচে থাকতে পারে। ব্রাউনের আগের বইগুলোতে মেসন, পোপ বা দান্তে ছিলেন কেন্দ্রে, এখানে সেই জায়গা নিয়েছে নিউরোসায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
প্রত্যাশামতোই, ব্রাউনের থ্রিলারগুলো টেড টক-এর মতোই চলে, আর দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস-ও ব্যতিক্রম নয়। ল্যাংডন আবার ছুটছেন—বা তাড়া খাচ্ছেন—মিউজিয়াম, গির্জা আর সরকারি দপ্তরের ভেতর দিয়ে। তার ইতিহাস-জানা মস্তিষ্ককে কাজে লাগাচ্ছেন। গদ্যও ছুটছে একই গতিতে: উত্তেজনায় ভরা, ইটালিক ফন্টে, আর দ্রুত। মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ছে হঠাৎ করে তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন: “জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ বিশ্বে সবচেয়ে ব্যস্ত মোটর ব্রিজ।”
অনেকে বলতেই পারেন, এসব তথ্য কাহিনিকে খুব একটা এগিয়ে নিয়ে যায় না। কিন্তু এটাই তো ব্রাউনের স্টাইল। তিনি চাচ্ছেন আপনি শিখুন, এমনকি আপনি দৌড়াচ্ছেন বলেও।
তবে উপন্যাসের সবচেয়ে মজার দিক হচ্ছে, এর বই-কেন্দ্রিক আবেগ। ক্যাথরিনের পান্ডুলিপি কেবল প্লটের উপকরণ নয়; এটি একটি প্রতীক—একটি বই কতটা শক্তিশালী হতে পারে তার প্রতিচ্ছবি। দ্য ভিঞ্চি কোড-এর কথা মনে পড়ে যায়—একটি বই যা একসময় গোটা পৃথিবীর আলোচনার কেন্দ্র ছিল। দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস সেই স্মৃতিকে জাগায়—এবং হয়তো কিছুটা তার হারিয়ে যাওয়া গৌরবের জন্য কাতরতা প্রকাশ করে।
আসলে, উপন্যাসটির এক ধরনের বিষণ্ন আবহ আছে। এটি বিশ্বাস করাতে চায়, বই এখনও বদলে দিতে পারে পৃথিবী। বিপ্লব ঘটাতে পারে, এমনকি লেখকের জীবন বিপন্ন করতে পারে। যখন আমরা সোশ্যাল মিডিয়া আর পডকাস্টে ডুবে আছি, ব্রাউন একটি দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছেন বইয়ের পক্ষে। তিনি যেন বলছেন, ‘মুদ্রিত শব্দ এখনও গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে উপন্যাসের দুর্বলতাও আছে। ক্যাথরিনের তত্ত্ব যতই বৈপ্লবিক হোক, তা অনেক সময়েই অস্পষ্ট—যেন নরম ও সরল বিজ্ঞানের মোড়কে বড় কিছু বানানো চেষ্টা। শেষদিকে এসে যখন চরিত্রগুলো অতিরিক্ত উত্তেজনায় প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে থাকে, তখন সেটি আজকের বাস্তব দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তার সাথে বেমানান ঠেকে।
তবুও, ব্রাউনের আন্তরিকতাকে অস্বীকার করা কঠিন। দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস হয়তো দীর্ঘ, অতিরিক্ত নাটকীয়, আর একটু বেশি প্রচারসর্বস্ব—তবুও এটি একটি বিশ্বাস বহন করে, যে বই শুধুই বিনোদন নয়; সেগুলো সত্যের বাহক।
সম্ভবত সেটাই মূল কথা। যখন আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি দ্রুত, সংক্ষিপ্ত এবং ইন্টারনেট-প্রভাবিত হয়ে পড়ছে, দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যগত কাহিনি বলার এক স্মারক হিসেবে—বড়, ব্যস্ত, এবং বইয়ের গুরুত্বে বিশ্বাসী। আপনি বিজ্ঞান বিশ্বাস করুন বা না করুন, প্লটকে বাস্তব মনে হোক বা না হোক—আপনি এই বার্তা এড়াতে পারবেন না: বইয়ের শক্তি আজও অক্ষুন্ন।
শেষ পর্যন্ত, এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় রহস্য যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকাশের মাধ্যম—বই নিজেই। যারা ব্রাউনের আগের বইগুলো পছন্দ করেছেন, তাদের জন্য এ বইয়ে যথেষ্ট কনটেন্ট আছে— সংকেত, চেজ সিকোয়েন্স, ছায়াময় চরিত্র, আর ইতিহাসভিত্তিক তথ্যসমৃদ্ধ বিস্ময়। তবে যারা এমন এক সময়ের জন্য নস্টালজিক হন, যখন একটা বই ছিল একটানা আলোচনার কেন্দ্র—দ্য সিক্রেট অব দ্য সিক্রেটস তাদের জন্য এক অনুভূতিপূর্ণ, উত্তেজনাপূর্ণ, এবং মুদ্রিত শব্দের প্রতি অবিশ্বাস্যভাবে আবেগঘন শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে ওঠে।
[দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এ ও স্কটের রিভিউ অবলম্বনে]