কিছুদিন আগেই গেল বই দিবস। আর সেদিন দেখা গেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বই নিয়ে বেশ আলাপ হচ্ছে। যদিও প্রযুক্তির এ সময়ে বই পড়া কমে যাচ্ছে বলে সবাই মনে করছেন, তবু বই নিয়ে নানা রকম কাজ চোখে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বই নিয়ে নানা নিরীক্ষা হচ্ছে। পাশাপাশি হচ্ছে বুক কনটেন্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউব) বই নিয়ে নিয়মিতই দেখা যায় বুক ফটোগ্রাফি, বুক রিভিউসহ আরো নানা আয়োজন।
বই নিয়ে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করেন তারা এখন ‘বুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ নামে পরিচিত। এদের প্রায় সবাই তরুণ। কেউ কলেজ শিক্ষার্থী, কেউবা পড়াশোনা শেষ করে চাকরিবাকরিও করছেন। এর মধ্যেই বই নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। তেমনই পাঁচ কনটেন্ট ক্রিয়েটার সৈয়দা সানজিদা সাইকি, সানজিদা হাসনাত সূচনা, এসএম সোলায়মান, আকাশ ইসলাম কাব্য ও ফাতেমা ইসমাইল কেয়া। নিয়মিতই তারা বুক কনটেন্ট তৈরি করেন।
বই নিয়ে যারা খোঁজখবর রাখেন, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে ‘সূচনা অলওয়েস’ তাদের সবার পরিচিত। তবে শুরুতে এতোকিছু ভাবেননি সানজিদা হাসনাত সূচনা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট তৈরি শুরুর গল্প প্রসঙ্গে সূচনা বলেন, ‘৬ বছর আগে সম্ভবত। ডিজাইন স্টুডিওতে বসে হুট করে মাথায় এসেছিল। নিজের আইডিতে টিচাররা আছেন। একটা পেজ খুলে ফেলে তাতে পোস্ট দিলে কেউ হয়ত খেয়াল করবে না, আমি কি করছি আবার আমার এসব নিয়ে কাজ করাও হবে। প্রফেশনাল বলতে লোকের নজরে এসেছি আড়াই বছর হলো।’
সানজিদা হাসনাত সূচনা
সাইকির গল্পটা একটু আলাদা। তিনি শখ থেকে কাজটা শুরু করেছিলেন। এরপরই আসে ‘সাইকির বইকথন’। শুরুর গল্পটা নিয়ে সাইকি বলেন, ‘বই নিয়ে কথা বলা শুরু হয়েছিল একদম শখ থেকে। যখন দেখি পাঠকরা আমার মতামত জানতে আগ্রহী হচ্ছে, তখন থেকে নিয়মিতভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রফেশনালি রিভিউ করা শুরু করি। সালটা সম্ভবত ২০২১।’
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সবাই কমবেশি বই রিভিউ করেন। একটা সময় লিখে রিভিউ করা হতো। এখন অনেকেই ভিডিও রিভিউ দেন। এক্ষেত্রে বই বাছাই, লেখক বাছাইসহ আরো বেশকিছু বিষয় মাথায় রাখতে হয়। দ্য ব্রাউন স্টোরিটেলার নামে পরিচিত এস এম সোলায়মান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বই পছন্দ করার ব্যাপারটা আসলে বহুমাত্রিক। কখনও পরিচিত কারো সাজেশন থেকে, কখনো পছন্দের লেখকের নতুন বই, কখনও জনরা ধরে, কখনও প্রচ্ছদ পছন্দ হয়ে গেলে, কখনও বইয়ের বিষয়বস্তু পছন্দ হলে; নানান কিছু মাথায় রেখে বই পছন্দ করা হয়। আর রিভিউ করা কিছুটা সহজ হয়েছে কারণ আমি সবসময় সবকিছুকে ভেঙ্গেচুরে বিশ্লেষণ করতে পছন্দ করি। যখন বই পড়ি তখন সবসময় পেনসিল হাতে থাকে। বইয়ের যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো বিষয় নিয়ে আমার মতামত মার্জিনে লিখে রাখি, পরে একসাথে মিলিয়ে নেই।’
এসএম সোলায়মান
বইয়ের সঙ্গে নানাভাবে দীর্ঘদিন যুক্ত আকাশ ইসলাম কাব্য। করোনার সময় থেকেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বই নিয়ে কথাবার্তা বলে এসেছেন। রিভিউ করার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রিভিউ লেখা আমার কাছে একধরনের আর্ট অব পিস। নিয়ম না মেনে মনে যা আসে তা বলি। বইয়ের সঙ্গে আমার চূড়ান্ত বোঝাপড়া রিভিউয়ের মাধ্যমে করি। ব্যক্তিগত জীবনের ভালোমন্দ অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, স্বপ্ন, কল্পনা, অপমান সবকিছু বইয়ের গল্পের সাথে কানেক্ট করে রিভিউ করি। আর, একজন বুক রিভিউয়ার হিসেবে আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্ডাররেটেড ও দুষ্প্রাপ্য বইগুলো পড়ে বইপোকাদের জানানো।’
রিভিউয়ের ক্ষেত্রে সাড়া পাওয়ার একটা বিষয় থাকে। কোন প্ল্যাটফর্মে সাড়া বেশি। এমন প্রশ্নের উত্তরে সাইকি জানান ভিডিও রিভিউয়ের ক্ষেত্রে ফেসবুকে দ্রুত সাড়া আসে। সোলায়মান ও কেয়াও এ কথাই জানালেন। ইনস্টাগ্রামের তুলনায় ইউটিউবে স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন আকাশ। তবে দীর্ঘ বিরতির কারণে সেখানে রিচ কমে গেছে। বিষয়টি নতুন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাথায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি। সূচনা বেশি সাড়া পান ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে।
বর্তমানে ভিডিও রিভিউ বেশ জনপ্রিয়। ভিডিও রিভিউ বা বই পর্যালোচনা কনটেন্ট বলা যেতে পারে। কেননা অনেকেই বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপ করার পাশাপাশি বইয়ের প্রডাকশন (পাতা, প্রচ্ছদ, বাঁধাই ইত্যাদি) নিয়ে বেশি কথা বলেন। এই ধরনের কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে ডিভাইস গুরুত্বপূর্ণ। তা, কে কোন ডিভাইস ব্যবহার করেন?
সৈয়দা সানজিদা সাইকি
সূচনা আগে ক্যামেরা ব্যবহার করতেন। এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকের জন্য ছোট ভিডিওগুলো তার স্মার্টফোনেই করেন। কেয়া ব্যবহার করেন তার স্যামসাং স্মার্টফোন ও বয়ার মাইক্রোফোন। সোলায়মান ব্যবহার করেন আইফোন। আকাশ ও সাইকির হাতিয়ার তাদের নিয়মিত ব্যবহারের স্মার্টফোন। সঙ্গে মাইক্রোফোন আর ট্রাইপড। এগুলে দিয়ে তারা ভালোই কাজ করছেন।
কিন্তু কেবলই কি শখ? কোনো মুনাফা কি আসে? এমন প্রশ্নের উত্তরে সূচনা বললেন, ‘সত্যি বলতে শুরুতে আমি ফটোগ্রাফি ইম্প্রুভ করার জন্য ইন্সটাগ্রামে বইয়ের ছবি তুলে রিভিউ করতাম। সবার কাছে ইন্টারনেট খুব যান্ত্রিক জায়গা হলেও আমার জন্য এটা ‘যা মন চায়’ করার জায়গা। আমি যখন খুব পচা ছবি তুলতাম তাতেও দেখতাম মানুষ এসে খুব ভালো কমেন্ট করে যেত। ভুল করলেও কেউ কটু কথা বলছে না এমন একটা পরিবেশ পেয়েছি বলেই শিখেছি। মুনাফা বলতে এই বই নিয়ে বলার কারণে আমি ইউএনডিপি বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়নমূলক কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ইন্টারন্যাশনাল পাবলিকেশন থেকে আমি রিভিউ কপি পাই। আমার মতো অতি সামান্য মানুষকে আমার প্রিয় লেখকেরা এডভান্স কপি পাঠান। এটা যে কি অবাক করা বিষয় আমার জন্য! যা ভালোবাসি তা করতে গিয়ে আরো অনেক আকাঙ্ক্ষার জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছি। এটাই তো মুনাফা।’
কেয়া বলেন, ‘শুরুর দিকে শখের বসে করলেও এখন টুকটাক নিজের বই কেনার মতো এবং অন্যদের উপহার দেয়ার মতো মুনাফা হয়।’
সাইকি জানান কখনো ব্র্যান্ড কোলাবোরেশনের সুযোগ হয়। তবে আকাশ বলেন কাজটা একেবারেই শখের বশে করেন। এটা তার বেঁচে থাকার জ্বালানি। সোলায়মানের মতো মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছেন এটাই মুনাফা।
কিন্তু বইয়ের বাজারে তো পেইড রিভিউ, প্রকাশনীর হয়ে কাজ করার কথা শোনা যায়। লেখক, প্রকাশকরা কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের হায়ার করেন। এ নিয়ে সোলায়মান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তেমন আর্থিক লেনদেন হয়নি। আসলে আমি শুরু করেছি বেশিদিন হয়নি, আবার বই নিয়ে সমালোচনা করাও আমার মূল পেশা না, সে হিসেবে টাকা নেয়া হয়ে ওঠে না। তবে হ্যাঁ, বইপাড়ায় অনেক সিনিয়র মানুষদের সাথে কথা বলে যা বুঝলাম, সম্মানী রাখা উচিত।’
আকাশ বলেন, ‘কারো সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করতে আমি আগ্রহী না। তবে লেখকরা আমাকে বই উপহার পাঠায়। আমার যদি পড়ে অনেক ভালো লাগে তবেই রিভিউ করি। ভালো না লাগলে গুডরিডসে গঠনমূলক সমালোচনা শেয়ার করি।’
আকাশ ইসলাম কাব্য
পেইড রিভিউয়ের ক্ষেত্রে লেখক, প্রকাশক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে পেশাদার আচরণ জরুরী। সাইকি বলেন, ‘কখনো কখনো প্রমোশনাল কাজ বা পেইড কনটেন্টের অফার আসে। তবে রিভিউয়ের ক্ষেত্রে আমি স্বচ্ছতা বজায় রাখি। যদি স্পন্সরড হয়, সেটা উল্লেখ করি। মতামত সবসময় স্বাধীন রাখার চেষ্টা করি। বেশিরভাগ লেখক ও প্রকাশক পেশাদার আচরণ করেন, যদিও ব্যতিক্রমও আছে। তাদের এডিয়ে চলার চেষ্টা করি।’
কেয়া বললেন, ‘এক্ষেত্রে রিভিউ করার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ আমার থাকবে। তারা কোনো কিছু যোগ করতে পারবেন না, কাট করতেও না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করব। এখন পর্যন্ত ৩/৪ জন পেয়েছি যারা কাজ হওয়ার পরও অপেশাদারের মতো সম্মানী নিয়ে টালবাহানা করেছেন, সমালোচনা হজম করতে না পেরে নিজের পাঠক বাহিনী নিয়ে ঝামেলা করতে চেয়েছেন, কেউ কেউ মেসেজই সিন করেনি কাজ করার পর।’
এ সবকিছু নিয়েই তারা কাজ করছেন। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজের মাধ্যমে নিজের স্কিল তৈরিও হচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছেন সবাই। ভবিষ্যতে বই নিয়ে পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাদের কাছে। সূচনা বলেন, ‘আরো অনেক অনেক অনেক বই পড়তে চাই, ভিডিও মেকিংয়ে নিজের একটা আলাদা স্টাইল খুঁজে বের করার ইচ্ছে আছে। বই পড়ার মাধ্যমে এমন সব বিষয়কে সামনে তুলে ধরতে চাই যেগুলোকে নিয়ে সবার আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন।’
ফাতেমা ইসমাইল কেয়া
কেয়া চান আরো সৃজনশীল হতে। তিনি বলেন, ‘বুক রিভিউয়ের বাইরে বই নিয়ে ভিন্ন ধরণের কন্টেন্ট বানানোর ইচ্ছে আছে এবং নিজ অর্থায়নে লাইব্রেরি করার ইচ্ছে আছে, যেখানে দেশী বিদেশী ভালো ভালো বইগুলো পাওয়া যাবে।’
কাছাকাছি ধরনেরই পরিকল্পনা সাইকির। তিনি বলেন, ‘বইকে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করাই মূল লক্ষ্য। ব্যক্তিগত একটা লাইব্রেরি বানানোর ইচ্ছা। আর সুপ্ত একটা ইচ্ছা হলো নিজের একটা বুক ক্যাফে খোলা।’
বর্তমানে জবের পাশাপাশি অনলাইনে একটা বিজনেস দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন আকাশ। তিনি বলেন, ‘যদি ভালোকিছু হয় তবে বিজনেসের প্রফিট থেকে ভবিষ্যতে একটা বুকক্যাফে দেয়ার পরিকল্পনা আছে। বুকক্যাফের একপাশে ছোট একটা স্টুডিও থাকবে যেখানে বইয়ের ভিডিও শুট করব। আশা রাখি ২৬ সালের মধ্যে আমার ছোট একটা টিম হয়ে যাবে।’
সোলায়মান জানান তার পেজ চলমান থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমি বই নিয়ে আলোচনা করে যাবো। যেহেতু শখের বশেই শুরু করেছি, তাই ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও বিশ্লেষণ চলমান থাকবে। হয়তো মাত্রা কমে আসবে, হয়তো সমালোচনার সংখ্যা কমে আসবে, তবে চলমান থাকবে।’