জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমরা অনেক ভাবি, অনেক তথ্য পর্যালোচনা করি। তারপরও শেষ পর্যন্ত অনেক সিদ্ধান্তই ভুল হয়ে যায়। বিপুল তথ্য, অসংখ্য বিকল্প আর নিজের আবেগের ভিড়ে মানুষ অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেয়ার সবচেয়ে সহজ পথটিই হারিয়ে ফেলে। আবার দলবদ্ধ সিদ্ধান্তে মতের অমিল, অতিরিক্ত তর্ক কিংবা নিজের অবস্থানে অনড় থাকার প্রবণতাও তৈরি করে অচলাবস্থা।
অদ্ভুত শোনালেও, এসব পরিস্থিতি সামলানোর কিছু কার্যকর সূত্র পাওয়া যেতে পারে পোকামাকড়ের আচরণে। পিঁপড়ার পথ খোঁজা, মৌমাছির দলগত সিদ্ধান্ত, পঙ্গপালের সাময়িক নিরপেক্ষতা এবং ফলমাছির ঝুঁকি বিচার— সব মিলিয়ে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও রয়েছে বেশ কিছু চমকপ্রদ শিক্ষা।
পিঁপড়ার কাছে দলগত অনুসন্ধানের শিক্ষা
একসঙ্গে অনেক বিকল্প সামনে এলে মানুষ প্রায়ই সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘চয়েজ ওভারলোড’।
পিঁপড়ারাও খাবার সংগ্রহের জায়গা বাছাইয়ের সময় একই সমস্যার মুখোমুখি হয়। তবে তাদের সমাধান পদ্ধতি বেশ কার্যকর। সম্ভাব্য খাবারের জায়গা খুঁজতে কয়েকটি পিঁপড়া বিভিন্ন দিকে বেরিয়ে পড়ে। চলার পথে তারা মাটিতে ফেরোমোনের ক্ষীণ রাসায়নিক চিহ্ন রেখে যায়। যে পিঁপড়া তুলনামূলক দ্রুত ও কার্যকর পথ খুঁজে খাবার নিয়ে ফিরে আসে, তার পথের ওপর দিয়ে দ্রুত আরো পিঁপড়া চলাচল করে। ফলে সেখানে বেশি ফেরোমোন জমে এবং পথটি শক্তিশালী হয়। অন্য পথগুলোর চিহ্ন সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে যায়।
এভাবে কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই পুরো কলোনি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর পথটি বেছে নেয়।
এ কৌশল থেকেই তৈরি হয়েছে ‘অ্যান্ট কলোনি অপটিমাইজেশন’ অ্যালগরিদম। সব সিদ্ধান্ত একজনকে নিতে হবে না।
মানুষের জন্য শিক্ষাটি সহজ— ভালো সিদ্ধান্ত সবসময় একজনের মাথা থেকেই আসতে হবে, এমন নয়। ছোট ছোট তথ্য, অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তকে একত্র করেও কার্যকর সমাধান তৈরি হতে পারে।
নতুন বাসা কোথায় হবে, সেটি মৌমাছিদের জন্য জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে তারা কোনো একক নেতার নির্দেশ অনুসরণ করে না। এর জন্য কয়েকটি স্কাউট মৌমাছি বিভিন্ন সম্ভাব্য জায়গা পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ে। ফিরে এসে তারা অন্য মৌমাছিদের কাছে নিজেদের পছন্দের কথা জানায় বিশেষ এক ধরনের ‘ওয়াগল ড্যান্স’ বা দুলুনি নাচের মাধ্যমে
মৌমাছির কাছ থেকে গণতন্ত্রের পাঠ
নতুন বাসা কোথায় হবে, সেটি মৌমাছিদের জন্য জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে তারা কোনো একক নেতার নির্দেশ অনুসরণ করে না। এর জন্য কয়েকটি স্কাউট মৌমাছি বিভিন্ন সম্ভাব্য জায়গা পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ে। ফিরে এসে তারা অন্য মৌমাছিদের কাছে নিজেদের পছন্দের কথা জানায় বিশেষ এক ধরনের ‘ওয়াগল ড্যান্স’ বা দুলুনি নাচের মাধ্যমে। শরীর ছন্দময়ভাবে দুলিয়ে তারা সম্ভাব্য বাসা তৈরির জায়গাটি কতটা নিরাপদ, কতটা কাছে, কত বড় এবং অবস্থানগতভাবে কতটা সুবিধাজনক— এসব তথ্য জানায়। জায়গাটি যত ভালো মনে হয়, নাচও হয় তত দীর্ঘ ও জোরালো।
শুধু জায়গার মান নয়, এই নাচের মাধ্যমে সম্ভাব্য বাসাটির দূরত্ব ও দিকনির্দেশনাও জানানো হয়। এরপর অন্য একদল মৌমাছিকে পাঠানো হয় সেই তথ্য যাচাই করতে। তারা ফিরে এসে একইভাবে নাচের মাধ্যমে নিজেদের মত জানায়— আগের পছন্দকে সমর্থন করে কিংবা নতুন কোনো জায়গার প্রস্তাব দেয়।
এভাবে সময়ের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট জায়গার পক্ষে সমর্থন বাড়তে থাকে। কয়েক ডজন মৌমাছি যখন একই জায়গার পক্ষে ইতিবাচক সংকেত দিতে থাকে, তখন একটি ‘কোরাম’ তৈরি হয়। এরপর পুরো দল সেই জায়গাটিকেই নতুন বাসা হিসেবে বেছে নেয়।
অর্থাৎ মৌমাছিদের সিদ্ধান্ত কোনো একক নেতার নির্দেশে হয় না; বরং তথ্য সংগ্রহ, স্বাধীন যাচাই, মতামত প্রকাশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।মানুষের গণতন্ত্রের সঙ্গে এর মিল এখানেই— সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য শুধু মত প্রকাশ নয়, বিকল্প যাচাই এবং পর্যাপ্ত সমর্থন তৈরি হওয়াও জরুরি।
ফলমাছি বা ড্রোসোফিলার সিদ্ধান্ত নেয়ার আচরণ নিয়েও গবেষণা হয়েছে। দুটি কাছাকাছি গন্ধের মধ্যে বেছে নিতে হলে তারা বেশি সময় নেয়। আবার খাবারের স্বাদ ও পুষ্টিগুণের মতো একাধিক বৈশিষ্ট্যও তারা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে
ঘাসফড়িং শেখায়— কখনো নিরপেক্ষ থাকাও জরুরি
কোনো দল দুটি মতের মধ্যে বিভক্ত হয়ে গেলে মানুষ সাধারণত নিজের অবস্থান আঁকড়ে ধরে। বিতর্ক যত বাড়ে, অবস্থান তত শক্ত হয়।
ঘাসফড়িংয়ের আচরণ নিয়ে গবেষণায় এর একটি অদ্ভুত সমাধান দেখা গেছে। দলবদ্ধভাবে চলার সময় তারা কখনো কখনো সাময়িকভাবে থেমে যায়। এ ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানই দলটিকে এক সিদ্ধান্ত থেকে অন্য সিদ্ধান্তে যেতে সাহায্য করে।
মানুষের ওপর একই ধরনের পরীক্ষায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের যদি দুটি বিকল্পের পাশাপাশি কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে দলটি শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ সবসময় পক্ষ নিতেই হবে—এমন নয়। কখনো একটু থেমে থাকা, নতুন করে পর্যালোচনা ও নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করাও ভালো সিদ্ধান্তের অংশ।
মাছির কাছ থেকে নিজের অনুভূতিকে বুঝতে শেখা
ফলমাছি বা ড্রোসোফিলার সিদ্ধান্ত নেয়ার আচরণ নিয়েও গবেষণা হয়েছে। দুটি কাছাকাছি গন্ধের মধ্যে বেছে নিতে হলে তারা বেশি সময় নেয়। আবার খাবারের স্বাদ ও পুষ্টিগুণের মতো একাধিক বৈশিষ্ট্যও তারা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে।
তাদের সিদ্ধান্ত ক্ষুধা বা চাপের মতো অভ্যন্তরীণ অবস্থার ওপরও বদলাতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুধা, ক্লান্তি, উদ্বেগ বা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে নেয়া সিদ্ধান্ত সব সময় একই রকম হয় না। তাই বড় সিদ্ধান্তের আগে শুধু বাইরের তথ্য নয়, নিজের মানসিক অবস্থাও বিবেচনায় রাখা দরকার।
প্রকৃতির এ ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ভালো সিদ্ধান্ত মানে শুধু দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়। বরং কখন অনুসন্ধান করতে হবে, কখন অন্যের মত শুনতে হবে, কখন থামতে হবে এবং কখন নিজের অবস্থাটিও বিবেচনায় নিতে হবে— সেটিই আসল।