শৈশবে বন্ধুর সংজ্ঞা জানার আগেই আমরা একজন বন্ধুকে পেয়ে যাই। লুকোচুরি খেলার সঙ্গী, বালিশ যুদ্ধের প্রতিপক্ষ, পুতুল খেলার সাথি, লুডু, ক্যারম, কাগজের নৌকা ভাসানোর স্মৃতি তৈরি হয় যার সঙ্গে সে আর কেউ নয়—বোন। আবার দিনের সবচেয়ে বড় ঝগড়াটাও হয় তার সঙ্গেই।
চকলেট সমান ভাগ হবে কি হবে না, টিভির রিমোট কার হাতে থাকবে, মায়ের পাশে কে ঘুমাবে—এসব নিয়ে ছোটবেলায় কত অভিমান, কত কান্না! আলমারি খুলে অনুমতি ছাড়াই জামা পরে ফেলা, প্রিয় কলমটা না বলে নিয়ে যাওয়া কিংবা পরীক্ষার আগের রাতে বই লুকিয়ে রেখে মজা করা—এসব নিয়েই চলত প্রতিদিনের খুনসুটি। অভিমান, কান্না, নালিশ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তখন মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর মানুষটি বোধহয় নিজের বোনই।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মানুষটিই আবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। বাড়ির বাইরে কেউ ভাই বা বোনকে নিয়ে একটি কটু কথাও বললে সবচেয়ে আগে রুখে দাঁড়ায় সে-ই। ঘরের ভেতরের ঝগড়া ঘরের মধ্যেই থাকে। বাইরে গেলে দুজন যেন একই দলের মানুষ।
বড় বোন অনেক সময় নিঃশব্দে দ্বিতীয় মায়ের ভূমিকায় চলে যান। মা বাসায় না থাকলে ছোট ভাইবোনকে খাওয়ানো, স্কুলব্যাগ গুছিয়ে দেয়া, পরীক্ষার আগে পড়া দেখে দেয়া, অসুস্থ হলে রাত জেগে পাশে বসে থাকা—এসব দায়িত্ব যেন অঘোষিতভাবেই তার কাঁধে এসে পড়ে। অথচ নিজের দুশ্চিন্তা কিংবা ক্লান্তির কথা খুব কমই জানান তিনি।
ছোট বোনের জগৎটা আবার আহ্লাদে ভরা। সে কখনো অনুমতি না নিয়েই আলমারি খুলে জামা পরে ফেলে, ভাইয়ের শার্ট কিংবা বোনের প্রিয় ওড়নাটা নিজের মনে করে ব্যবহার করে। প্রিয় বইয়ের ভাঁজ নষ্ট করে দেয়, হেডফোন নিয়ে কোথায় রেখেছে নিজেই ভুলে যায়। এসব নিয়ে মুখ ভার হয়, ঝগড়া হয়, কথা বন্ধ থাকে কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু সে ছোট বোনই বড় বোন বা ভাইয়ের যে কোনো সফলতায় শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়, অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠায় থাকে, মন খারাপ দেখলে চুপচাপ পাশে এসে বসে।
ভাইবোনের সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে ভালোবাসা খুব কমই মুখে বলা হয়। ‘ভালোবাসি’ শব্দটি হয়তো কখনো উচ্চারণ করা হয় না। কিন্তু রাতে দেরি করে বাসায় ফিরলে একের পর এক ফোন, পরীক্ষার আগে শুভকামনা, অসুস্থ হলে নিজের খাবারটুকু এগিয়ে দেয়া কিংবা হঠাৎ করে একটি বার্তা—‘খেয়েছিস?’—এসবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য মায়া।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের রূপও বদলে যায়। যে বোন একসময় একই ঘরে ঘুমাত, একদিন সে অন্য একটি বাড়ির মানুষ হয়ে যায়। কেউ চাকরির কারণে অন্য শহরে চলে যায়, কেউ দেশের বাইরে, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের সংসারে। প্রতিদিনের ঝগড়া বদলে যায় সপ্তাহে একবার ফোনে, কিংবা মাঝেমধ্যে ভিডিও কলে। পাঁচ মিনিটের সেই কথোপকথনের মধ্যেই ফিরে আসে শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি।
অনেকেই তখন বুঝতে পারেন, ছোটবেলায় যাকে সবচেয়ে বেশি বিরক্তিকর মনে হতো, সেই মানুষটিকেই সবচেয়ে বেশি মিস করেন। কারণ সময়ের সঙ্গে বন্ধু বদলায়, কর্মস্থল বদলায়, ঠিকানা বদলায়; কিন্তু শৈশবের স্মৃতিগুলো ভাগ করে নেয়ার মানুষটি একই থেকে যায়। অবশ্য সব ভাইবোনের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ থাকে না। ভুল বোঝাবুঝি হয়, অভিমান জমে, কখনো কখনো বছরের পর বছর কথাও বন্ধ থাকে। তবু সম্পর্কের ভেতরে কোথাও না কোথাও একটি দরজা খোলা থাকে। অনেক সময় একটি ফোনকল, একটি ছোট্ট বার্তা বহু বছরের নীরবতাও ভেঙে দিতে পারে।
আজ বোন দিবস। দিনটি উদযাপনের জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। যদি বোন পাশে থাকে, এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খান, পুরনো অ্যালবাম খুলে বসুন, শৈশবের কোনো গল্প নিয়ে হাসুন। আর যদি দূরে থাকে, একটি ফোন করুন। অনেক দিন কথা না হয়ে থাকলে আজই লিখুন—‘কেমন আছিস?’