বাংলাদেশের ইতিহাসজুড়ে আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আর সংগ্রামের ঘনঘটা। বাংলাদেশর জন্ম বা স্বাধিকার আন্দোলনের আতুঁরঘর হিসেবে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন স্বীকৃত। সেইসঙ্গে স্বীকৃত ভাষা আন্দোলনকারীরা। তবে সব ভাষাযোদ্ধার ওপর ইতিহাস সমান আলো ফেলতে পারেনি। তেমনি অনুজ্জল আলোয় থাকা এক প্রভাবশালী ভাষা আন্দোলনকারী মমতাজ বেগম ওরফে কল্যাণী রায়।
অল্পকিছু লেখালেখি হলেও মমতাজ বেগমকে বাঙালীর সামনে প্রথম বড় পরিসরে উপস্থাপন করেছেন হাসনাত আবদুল হাই। ফেসবুকে এক পোস্ট থেকে প্রথম এ ভাষা আন্দোলনকারীর নাম জেনেছিলেন তিনি। তারপর একজন ভাষা সৈনিককে না জানার অপরাধবোধ আর তাকে প্রকাশের তাগিদ থেকে বিস্তর গবেষণা করে লিখেছেন কল্যাণী/মমতাজ। ডকু-ফিকশনধর্মী উপন্যাসিকাটি প্রথম প্রকাশ পায় ২০২৩ সালে, সমকাল ঈদ সংখ্যায়। তারপর ২০২৪ সালের বইমেলায় প্রথমা প্রকাশ থেকে বই আকারে প্রকাশ পায় মমতাজ বেগমের জীবনালেখ্য।
ঔপন্যাসিক হাসনাত আবদুল হাই, মমতাজ বেগমকে যতটা ভাষা সৈনিক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন ততটাই আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সাহসী, ত্যাগী ও জেদী নারীরুপে অঙ্কন করেছেন।
সাহসী এ নারীর নেতৃত্বেই ১৯৫২ সালে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে মিছিল বের হয়েছিল। তখন তিনি নারায়ণগঞ্জ মর্গান স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ২১শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারা ভেঙে সমাবেশ করেন তিনি। সরকারি বিধি অনুযায়ী তাকে আটক করে পুলিশ। সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগে দেড় বছর জেলে বন্দি জীবন কাটান মমতাজ বেগম। মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে আসার সুযোগ ছিল তার। কিন্তু সেক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে লিখতে হতো, তিনি যা করেছেন ভুল করেছেন, ভবিষ্যতে এমন ভুল আর করবেন না। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে যোগ দেয়াটা আর সব বাঙালির মতো মমতাজ বেগমের জন্যও ভুল নয়। এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ তিনি আমৃত্যু করবেন। তাই সেই মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে ছাড়া পেতে রাজি হননি।
ভাষার জন্য বাঙালি অনেক ত্যাগই স্বীকার করেছেন। কেউ দিয়েছেন জীবন। তবে মমতাজ বেগমের ত্যাগ একদমই আর সবার মতো নয়। তার জীবনটাও এক প্রকার যুদ্ধই। ভালোবাসার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন, হয়েছিলেন ধর্মান্তরিত। কলকাতা হাইকোর্টের জজ রায় বাহাদুর মহিম চন্দ্রের মেয়ে কল্যাণী রায়, ফরিদপুরের বাসিন্দা ফুড ইন্সপেক্টর মান্নাফ খানকে বিয়ে করে গ্রহণ করেন মমতাজ বেগম নাম। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের জেরে কলকাতা ছেড়ে স্বামীর হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন মমতাজ বেগম। ভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে যোগ দিয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনে। খেটেছেন জেল। তবে জেল থেকে বেরিয়ে আর সংসারে ফেরা হয়নি তার।
এমন আত্মত্যাগী যে নারী; মৃত্যুর পর পরিবারের প্রায় অগোচরেই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় তাকে। ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায় হয়ে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যান মমতাজ বেগম। জাতি হিসেবে আমাদের এই আত্মগ্লানি থেকে মুক্তি দিতেই হাসনাত আবদুল হাই অত্যন্ত সুনিপুণ দক্ষতায় মমতাজ বেগমের জীবনের নানা দিককে আমাদের সামনে এনে হাজির করেছেন। ইতিহাসকে আশ্রয় করে কল্পনার জালে বুনেছেন কল্যাণী রায়কে। মহিয়সী এ নারীর পাশাপাশি এ উপন্যাসে সপ্রাণ হয়ে উঠেছে ইতিহাসের কিছু বাস্তব চরিত্রও। যেমন জেলখানায় কল্যাণীর সঙ্গে দেখা হয় তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের। দুই অসমসাহসী নারী পরস্পরকে দারুণ অনুপ্রাণিত করেছেন।