টক্সিক বিউটি: আপনার রূপচর্চার পণ্য কি বড় বিপদ ডেকে আনছে?

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত একজন নারী গড়ে ১২টি ভিন্ন ভিন্ন প্রসাধন বা পার্সোনাল কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করেন। ফেসওয়াশ, কন্ডিশনার, হেয়ার ডাই (চুলের রং), সুগন্ধি, বডি লোশন, নেইল পলিশ থেকে শুরু করে হরেক রকমের মেকআপ সামগ্রী রয়েছে এ তালিকায়। পণ্যগুলোর পেছনের লেবেলটিতে খেয়াল করলে দেখবেন, সেখানে লেখা থাকে রাসায়নিক উপাদানের এক দীর্ঘ ও জটিল তালিকা। আর তা দেখে আমরা অনেকেই ধরে নিই, বাজারে যেহেতু দেদারসে বিক্রি হচ্ছে, তাই নিশ্চয়ই এগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারের জন্য নিরাপদ ও পরীক্ষিত। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বেশ উদ্বেগজনক!

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘ডিভিশন অব উইমেনস হেলথ’-এর প্রধান ড. ক্যাথরিন এম. রেক্সরোড বলেন, প্রসাধন সামগ্রীগুলো বাজারে ছাড়ার আগে মূলত পরীক্ষা করা হয় যে ব্যবহারের পরপরই এটি ত্বকে অ্যালার্জি বা ইরিটেশনের মতো কোনো তাৎক্ষণিক সমস্যা তৈরি করছে কি না। কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বছরের পর বছর প্রবেশ করে কী বড় ক্ষতি করছে, তা সাধারণত পরীক্ষা করা হয় না।

গবেষণার ভয়াবহ তথ্য: চুলের রং ও স্ট্রেইটনারের ঝুঁকি

২০১৯ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ক্যানসার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলে দেয়। ‘সিস্টার স্টাডি’র আওতাধীন ৫০ হাজারেরও বেশি নারীর স্বাস্থ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়। সেখানে দেখা গেছে:

  • স্থায়ী চুলের রং: যে নারীরা বছরে অন্তত একবার স্থায়ী হেয়ার ডাই ব্যবহার করেছেন, তাদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি সাধারণ নারীদের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। কৃষ্ণাঙ্গ (আফ্রিকান-আমেরিকান) নারীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরো মারাত্মক—প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। গবেষকদের মতে, বর্তমানের হেয়ার ডাইগুলোতে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যার অনেকগুলোই শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে ক্যানসার সৃষ্টি করে।

  • চুল সোজা করার রাসায়নিক: যারা চুল সোজা করার রাসায়নিক পণ্য ব্যবহার করেন, তাদের স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি ১৮ শতাংশ বেশি। আর যারা প্রতি ৫ থেকে ৮ সপ্তাহ পর পর নিয়মিত চুল স্ট্রেইট করেন, তাদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে সব বর্ণের নারীদের জন্যই ঝুঁকি সমান।
  • ঘরে বসে রং করার ঝুঁকি: যারা পার্লারে না গিয়ে বাড়িতে নিজে নিজে সেমি-পার্মানেন্ট রং ব্যবহার করেন, তাদের ঝুঁকি কিছুটা বেশি দেখা গেছে। এর কারণ সম্ভবত তারা অসাবধানতাবশত ত্বকে বেশি রং লাগিয়ে ফেলেন অথবা বন্ধ ঘরে কাজ করার কারণে ক্ষতিকর রাসায়নিকের গ্যাস বেশি পরিমাণে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন।

রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচবেন কীভাবে?

গবেষকরা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:

  • কোনো পণ্য কেনার আগে তার উপাদানগুলো ভালো করে দেখুন। ‘এনভায়রনমেন্টাল ওয়ার্কিং গ্রুপ’র মতো আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থাগুলো সাধারণ কসমেটিকস পণ্যের রাসায়নিকের ওপর ভিত্তি করে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত রেটিং দেয় (১ মানে নিরাপদ, ১০ মানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ)। কোনো পণ্য কেনার আগে তাদের ডেটাবেজে রেটিং যাচাই করে নিতে পারেন।
  • অনেক কোম্পানি দাবি করে তাদের পণ্য ‘প্যারাবেন-ফ্রি’ বা ‘থ্যালেট-ফ্রি’। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, একটি সুপরিচিত ক্ষতিকর উপাদান বাদ দিয়ে তারা এমন আরেকটি নতুন রাসায়নিক যোগ করে যা সমান ক্ষতিকর। তাই কেবল চটকদার লেবেল দেখে বিভ্রান্ত হবেন না।
  • বাথরুম বা ড্রেসিং টেবিল হরেক রকমের লোশন, সুগন্ধি আর ক্রিমে ভরিয়ে না ফেলে কেবল যেগুলো অতি প্রয়োজনীয়, সেগুলোই ব্যবহার করুন। প্রসাধনীর সংখ্যা যত কমাবেন, রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও তত কমবে।
  • রাসায়নিক পণ্যের বিকল্প হিসেবে রান্নাঘরের প্রাকৃতিক উপাদান (যেমন- মধু, বেসন, অ্যালোভেরা) দিয়ে রূপচর্চা করতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, ‘ন্যাচারাল’ বা ‘অর্গানিক’ লেখা থাকলেই তা শতভাগ নিরাপদ নয়। ল্যাভেন্ডার বা টি-ট্রি এসেনশিয়াল অয়েল অনেক সময় কৃত্রিম সুগন্ধির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হলেও এগুলোও শরীরের হরমোনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি।

আরও